বিনোদন

‘টাইটানিক’র নকল ‘বেদের মেয়ে জোসনা’— তারপর ‘হাওয়া’ ও ‘রইদ’

শেয়ার করুন:

একটা সময় ছিল, সিনেমা মুক্তি পেলে মানুষ গল্প নিয়ে কথা বলত। এখন সিনেমা মুক্তি পেলে প্রথম প্রশ্ন— “নকল কি না?”

‘হাওয়া’ মুক্তির সময় টিকিট যেন সত্যিই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। পত্রিকাগুলো শিরোনাম করেছিল— টিকিট নেই, শো হাউসফুল। পোস্টার, আবহ, গান, চরিত্র— সবকিছু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সমালোচনাও হয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। সুস্থ চলচ্চিত্রচর্চার জন্য সমালোচনা দরকার।

কিন্তু আমাদের আলোচনার ভেতরে একটা অদ্ভুত প্রবণতা ঢুকে গেছে— মিল মানেই নকল

একজন খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন— “হাওয়া তো ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র নকল!”
কারণ? একটি সাপের দৃশ্য।

এখানেই আমাদের দর্শক-মানসিকতার সবচেয়ে মজার দিকটি ধরা পড়ে। একটি চলচ্চিত্রে সাপ থাকলে তা আরেকটি সাপ-অবলম্বিত ছবির নকল হয়ে যায়— এ এক অভিনব আবিষ্কার। তাহলে জঙ্গল মানেই ‘টারজান’, প্রেম মানেই ‘রোমিও-জুলিয়েট’, জাহাজ মানেই Titanic?

যদি যুক্তিটা এত সরল হয়, তবে জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্র বেদের মেয়ে জোসনা-কেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে হয়। সেখানে প্রেম আছে, সামাজিক দ্বন্দ্ব আছে, নাটকীয়তা আছে। পৃথিবীর অগণিত ছবিতেই এগুলো আছে। তাহলে কি সবই সবার নকল?

সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়।

সমস্যা নকল নয়— সমস্যা আমাদের বিচার-পদ্ধতি।
আমরা দ্রুত তকমা দিই, ধীর বিশ্লেষণ করি না।

আমরা মিল খুঁজতে ভালোবাসি, বিশ্লেষণ করতে নয়। মিল খুঁজে পাওয়া সহজ; বিশ্লেষণ করতে পরিশ্রম লাগে। একটি দৃশ্য, একটি প্রপ, একটি আবহ— এগুলো ধরে পুরো চলচ্চিত্রকে ‘নকল’ বললে দর্শক হিসেবে আমরা দায়িত্ব এড়িয়ে যাই। কারণ তখন আর আমাদের ভাবতে হয় না— নির্মাণভঙ্গি কেমন, ক্যামেরা-ভাষা কী বলছে, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব কোথায় ভিন্ন।

কপিরাইট নিয়ে হুবহু রিমেক হয়— সেটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। কিন্তু অভিনয়, সংলাপ, মিজ-আঁ-সেন, সাউন্ড ডিজাইন— সবকিছু এক রেখে দেওয়া সম্ভব? অসম্ভব। একই গল্পও দুই নির্মাতার হাতে দুই জগত তৈরি করে। শিল্পে ‘পুনরাবৃত্তি’ নেই; আছে ‘পুনর্নির্মাণ’।

তবু আমরা দ্রুত রায় দিই।
কারণ ‘নকল’ শব্দটি উচ্চারণে এক ধরনের ক্ষমতা আছে। বললেই মনে হয় আমরা যেন গভীর কিছু ধরে ফেলেছি। অথচ বেশিরভাগ সময় সেটি হয় পৃষ্ঠস্থ পর্যবেক্ষণ।

এখন একই নির্মাতার মানে মেজবাউর রহমান সুমনের পরিচালনায় মুক্তি পাচ্ছে নতুন চলচ্চিত্র ‘রইদ’। সিনেমাটি এখনো মুক্তি পায়নি— কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। কোথায় মিল পাওয়া যায়, কোন দৃশ্য কার সঙ্গে মেলানো যায়, কোন পোস্টার কোন ছবির ছায়া— আমরা খুঁজতে প্রস্তুত।

প্রশ্ন হচ্ছে— আমরা কি সিনেমা দেখতে যাই, না তুলনা করতে যাই?

বিশ্বের প্রায় সব গল্পই মূলত কয়েকটি আদিগল্পের ভিন্ন সংস্করণ— প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, বেঁচে থাকা, প্রতিশোধ, ক্ষমতা। নতুনত্ব আসে উপস্থাপনায়। ক্যামেরার কোণে, সংলাপের স্বরে, নীরবতার ব্যবহারে। শিল্পের মৌলিকতা বিষয়বস্তুতে নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে।

একটি সাপের উপস্থিতি যদি ‘নকল’-এর প্রমাণ হয়, তবে একটি জাহাজডুবি দৃশ্য মানেই Titanic-এর অনুসরণ— এমন যুক্তিও দাঁড় করানো যায়। কিন্তু আমরা জানি, বিষয় আর ভঙ্গি এক জিনিস নয়।

সমস্যা নকল নয়— সমস্যা আমাদের বিচার-পদ্ধতি।
আমরা দ্রুত তকমা দিই, ধীর বিশ্লেষণ করি না।

চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে দেখতে হলে আমাদেরও শিল্প-দর্শক হতে হবে। কপি করলে বলুন— প্রমাণসহ বলুন। কিন্তু মিল পেলেই নকল— এই সরলীকরণ শিল্পের প্রতি অবিচার।

তাই ‘রইদ’ আসার আগে একটু অপেক্ষা করা যাক।
সিনেমা দেখার আগে রায় নয়— দেখার পর বিশ্লেষণ হোক।

নইলে একদিন দেখবেন, পৃথিবীর সব গল্পই কারও না কারও নকল হয়ে গেছে— আর আমাদের নিজের ভাবনার জায়গাটা ফাঁকা পড়ে আছে।

লেখেছেন: আহমদ সায়েম
শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *