সমাজ

প্রবাসী কমিউনিটির এক প্রেরণার নাম এমডি নূরুল ইসলাম

শেয়ার করুন:

—সংগ্রাম, সততা ও সাফল্যের অনন্য গল্প
—৭০ বছরেও প্রবাসী কমিউনিটির প্রেরণার নাম এমডি নূরুল ইসলাম
—সন্তানের সাফল্য, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও মানবিকতার আলোয় এক জীবনের পথচলা

বিশেষ প্রতিনিধি

জীবনের সাফল্য কেবল অর্থ-বিত্ত, পদ-পদবি কিংবা সামাজিক পরিচিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষের প্রকৃত অর্জন নিহিত থাকে তাঁর সততা, ত্যাগ, পরিশ্রম, পরিবারকে সুশিক্ষায় গড়ে তোলা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনের মধ্যে। প্রবাসের মাটিতে এমনই এক সংগ্রামী, বিনয়ী ও অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন এমডি নূরুল ইসলাম।

১৯৫৫ সালের মার্চ মাসে জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। প্রতিকূলতার মধ্যেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিকম (সম্মান) ও এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—সে সময় উক্ত বিভাগ থেকে কেউই প্রথম শ্রেণিতে ডিগ্রি অর্জন করেননি। তিনি ১৯৮০ সালে উচ্চতর সেকেন্ড ক্লাস (সেকেন্ড) নিয়ে এমকম ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৮১ সালে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। সাভারে পরিবার নিয়ে বসবাস করে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন। নিজের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে সন্তানদের শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠাকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি।

তাঁর সেই ত্যাগ আজ সাফল্যের গল্প হয়ে ফিরে এসেছে। বড় ছেলে ডা. জাহিদ ইসলাম (এমডি) যুক্তরাষ্ট্রের একজন স্বনামধন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি পেনসিলভেনিয়ার লিহাই ভ্যালি হেলথ নেটওয়ার্কে অধ্যাপক ও সাইকিয়াট্রি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর একমাত্র ছেলে বর্তমানে ১১তম গ্রেডে অধ্যয়নরত।

মেয়ে শামসুন্নাহার সুমনা পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর দুই ছেলে—বড় ছেলে ১১তম গ্রেডে এবং ছোট ছেলে ৬ষ্ঠ গ্রেডে পড়াশোনা করছে।

অপর ছেলে প্রকৌশলী মো. ওয়াহেদুল ইসলাম বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর একমাত্র মেয়ে সাভার ক্যান্টনমেন্ট মর্নিং গ্লোরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংলিশ মিডিয়ামে সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। আগামী ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে পরিবারটি ইমিগ্রেশন ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০১৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বড় ছেলে ডা. জাহিদ ইসলামের উদ্যোগে স্ত্রীসহ যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এমডি নূরুল ইসলাম। দীর্ঘ পথচলার পর ২০২৩ সালে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন। বর্তমানে পেনসিলভেনিয়ার আপার ডারবিতে বসবাস করলেও বয়স তাঁকে কখনো থামিয়ে রাখতে পারেনি।

প্রায় ৭০ বছর বয়সেও তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন সক্রিয় ও পরিচিত মুখ। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক বিভিন্ন আয়োজনে তাঁর উপস্থিতি নিয়মিত। তাঁর হাসিমুখ, সহজ ব্যবহার এবং সবার সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক তাঁকে কমিউনিটির মানুষের কাছে আপনজন করে তুলেছে।

তিনি বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটি ফোরাম অব পেনসিলভেনিয়া (BACF)সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। নতুন প্রজন্মকে উৎসাহ দেওয়া, প্রবীণদের সম্মান করা এবং কমিউনিটির ঐক্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে তিনি নীরবে ভূমিকা রেখে চলেছেন।

বাংলাদেশে থাকাকালে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাঁর দর্শন—মানুষের প্রতি ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করাই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

কমিউনিটির অনেকেই মনে করেন, “নূরুল ইসলাম ভাই বয়সকে কখনো বাধা হিসেবে দেখেন না। প্রতিটি অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি, মানুষের খোঁজ নেওয়া এবং সবাইকে উৎসাহ দেওয়ার মানসিকতা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়।”

একজন বাবার ত্যাগ, একজন নাগরিকের দায়িত্ববোধ এবং একজন মানুষের মানবিকতার সমন্বিত প্রতিচ্ছবি এমডি নূরুল ইসলামের জীবন। তাঁর পথচলা প্রমাণ করে—সততা, পরিশ্রম ও ভালো মূল্যবোধ দিয়ে গড়ে ওঠা জীবনই প্রকৃত সাফল্যের গল্প।

প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করা হয়েছে। তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও মানবিক চিন্তা আগামী প্রজন্মকে আরও দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনে অনুপ্রাণিত করবে—এটাই সবার প্রত্যাশা।


ডেস্ক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *