
১. ব্রিফকেস ভর্তি জোনাকি
নিবিড় গ্রামগুলোতে এখনো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে জগৎসংসারের চেহারাই বদলে যায়। দিনের যে প্রখরতা, যে কোলাহল, যে ছুটোছুটি—সব এক নিমেষে ম্লান হয়ে আসে। আলো সরে যাওয়ার সাথে সাথে চারপাশের পরিবেশ, পরিস্থিতি, এমনকি সময়ের চলনও যেন অন্য নিয়মে বাঁধা পড়ে। দূরের গ্রামখানি প্রথমে আবছা হয়। তারপর ধানমাঠের ঢেউ, বাগানের ঘন সবুজ, পাকারাস্তার সোজা রেখা, জলাশয়ের চিকচিক, পুকুরের স্থির জল, এমনকি পথের পাশের ডোবাটুকুও—একে একে গা ঢাকা দেয় অন্ধকারের আঁচলে। গাছের পাতায়, মাটির বুকে, ঘরের চালে নেমে আসে নীলচে-কালো এক বিষণ্ণতা। পাড়াগাঁয়ের দিনের ব্যস্ততা তখন নিঃশেষ। হাটের হাঁকডাক, রাখালের গরু তাড়ানো, স্কুলফেরত ছেলেমেয়েদের চিৎকার, কলের পাড়ে বউ-ঝিদের গল্প—সব থেমে যায়। তার বদলে নেমে আসে এক বিশাল, ভারী, মখমলের মতো নৈঃশব্দ্যের চাদর। সেই নিস্তব্ধতা এতটাই গভীর যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও কানে বাজে। কিন্তু খেয়াল করে দেখো, এই নৈঃশব্দ্যও নিখুঁত নয়। তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে অসংখ্য ঝিঁঝিপোকা। বাঁশঝাড় থেকে, ধানখেতের আল থেকে, পুকুরপাড়ের ঝোপ থেকে—চারদিক থেকে উঠে আসছে একটানা, একঘেয়ে, অথচ মায়াবী ঝিঁঝির ঐকতান। মনে হয় কেউ যেন অন্ধকারের কাগজটাকে ধীরে ধীরে ছিঁড়ছে, আর তার প্রতিটি ছেঁড়া টুকরো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। রাত বাড়ার সাথে সাথে সেই শব্দ আরও গাঢ় হয়। দূরে কোনো কুকুর ডাকে, বাতাসে নারকেলপাতা খসখস করে, জোনাকিরা টিপটিপ করে জ্বলে নেভে। গ্রাম তখন আর জেগে-থাকা গ্রাম থাকে না, সে পরিণত হয় এক স্বপ্নের ভূখণ্ডে—যেখানে দিনের যুক্তি নেই, আছে শুধু শব্দ, অন্ধকার আর স্মৃতির ফিসফাস। সন্ধ্যা শুধু দিন আর রাতের সন্ধিক্ষণ নয়। সে এক মায়াবী রূপান্তর। যে-রূপান্তরে পৃথিবী নিজেকে গুটিয়ে নেয়, আর প্রকৃতি তার সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে রহস্যময় চেহারাটা আমাদের সামনে মেলে ধরে।
দূর থেকে ভেসে আসে শেয়ালের ডাক। একটা, তারপর আরেকটা। ফাঁকা মাঠ, খালপাড় আর বনবাদাড়ের গা ছমছমে নিস্তব্ধতাকে চিরে সেই ডাক অন্ধকারে গড়িয়ে যায়। শুনলে গা শিউরে ওঠে, অথচ কী অদ্ভুত মায়া আছে তাতে। আর এই গাঢ় অন্ধকারের বুকেই, বনবাদাড়ের কালো শরীরে মুণিমুক্তার মতো জ্বলে ওঠে জোনাকিরা। তারা যেন রাতের রাজটিকা। ছোট ছোট আলোর ফুলকি—নিভে যায়, আবার জ্বলে। সমস্ত অন্ধকারকে রাজসিক করে তোলে তাদের নিঃশব্দ উৎসব। যদিও এখন প্রায় সব গ্রামেই বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। সুইচ টিপলেই নেমে আসে কৃত্রিম আলোর বন্যা। অন্ধকারের স্বাভাবিক, আদিম বিস্তার তাই খণ্ডিত হয়ে পড়েছে। টিউবলাইটের সাদা আলোয় জোনাকিরা আজকাল লজ্জা পায়। তবুও…তবুও বাঁশবনের ভেতর, নিবিড় ঝোপেঝাড়ে, নদীর পাড়ের নলখাগড়া আর কাশবনে, অন্ধকার কবরস্থানে, শ্মশানের পোড়োবাড়ির ভেতরে—সেখানে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। সেখানে এখনো রাত তার নিজস্ব নিয়মে চলে। আর সেখানেই জোনাকিরা দেয় আলোর অন্য মাত্রা। তাদের জ্বলানেভায় কোনো তাড়া নেই, কোনো শব্দ নেই। কেবল আছে সহস্র বছরের পুরনো এক নীরব ভাষা। মনে হয় অন্ধকার নিজেই নিঃশ্বাস নিচ্ছে, আর প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে ফুটে উঠছে হাজারটা নক্ষত্র। এইভাবেই সন্ধ্যা রাতের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়। গ্রাম ঘুমায়। কিন্তু প্রকৃতি জেগে থাকে—শেয়ালের ডাকে, ঝিঁঝির ঐকতানে, আর জোনাকির রাজটিকায়।
এই জোনাকিদের নেভা-জ্বলা দেখতে, সন্ধ্যার পর এখনো আমি মাঝে মাঝে গা ঢাকা দিয়ে চলে যাই। বাঁশবাগানের পাশের সেই পুরনো বকুলতলায় গিয়ে বসে থাকি। চারপাশে নিকষ অন্ধকার। মাথার ওপর বকুলের ডালপালা, আর পায়ের নিচে ঝরা ফুলের মৃদু গন্ধ।
আমার মুখে এই গল্প শুনে কে যেন একদিন হেসে বলেছিল, ওই জায়গাটাকে তাহলে ‘জোনাকি পড়া’ বললেই হয়। নামটা আমার বড় পছন্দ হয়েছিল। কারণ সত্যিই তো, সন্ধ্যা নামলেই ওখানে আকাশ থেকে যেন আলোর বৃষ্টি নামে। আজকাল শহরের মানুষের বড় শখ হয়েছে—ফ্ল্যাটের ব্যালকনি, ছাদের কোণে শৌখিন বাগান করছে সবাই। টবে গাছ, রঙিন লাইট, দোলনা। ভারি সুন্দর। আমার মনে হয়, সন্ধ্যার পর যদি সেই বাগানবাড়িগুলোতে একটুখানি অন্ধকারের আবহ রাখা যেত, আর তার বুকের ভেতর ছেড়ে দেওয়া যেত কিছু জোনাকি—মন্দ হতো না নিশ্চয়ই।
আলো সরিয়ে নিয়ে ব্যালকনি বা ছাদে অন্ধকার করা যায়। সুইচ অফ করলেই হয়ে যায়। কিন্তু জোনাকি? জোনাকি তো আর অর্ডার দিলেই আসবে না। সে আসে মাটির গন্ধে, বকুলের ছায়ায়, নদীর জোলো বাতাসে। তবু আমার একটা বড় সাধ হয়। ইচ্ছা হয়, এক সন্ধ্যায় বকুলতলার আশপাশ থেকে ব্রিফকেস ভর্তি করে কিছু জোনাকি ধরে আনি। তারপর শহরের কোনো-এক ছাদবাগানে গিয়ে, সব আলো নিভিয়ে, সেই ব্রিফকেসের মুখটা খুলে দিই। মুহূর্তের মধ্যে ব্রিফকেসের খাঁচা থেকে অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়বে ছোট ছোট আলোর প্রাণ। প্রথমে তারা দিশেহারা হবে। তারপর ধীরে ধীরে টবের পাতায়, গ্রিলে, দোলনার দড়িতে বসবে। শহরের কোলাহলের ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াবে তাদের নিঃশব্দ উৎসব।
সেই রাতে শহরের ছেলেমেয়েরা জানালা দিয়ে দেখব—তাদের কৃত্রিম বাগানে নেমেছে প্রকৃতির নিজস্ব আলো। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে তারা অবাক হয়ে বলবে, দেখো—জোনাকি! হয়তো এক রাতেই তারা মরে যাবে। হয়তো সকালের আলোয় তাদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবুও সেই একটা রাতের জন্য, কংক্রিটের শহর একটু হলেও গ্রাম হয়ে উঠবে। ব্যালকনির অন্ধকার একটু হলেও বকুলতলা হয়ে উঠবে।
আর আমি? আমি দূর থেকে দেখে মনে মনে বলব—অন্ধকারকে ভয় পেয়ো না। অন্ধকারকে একটু জায়গা দাও। তার বুকের ভেতর জোনাকিদের জন্য একটু ফাঁক রাখো। তাহলে দেখবে, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি আলো, নিভে-যাওয়া আলো নয়—জ্বলে-ওঠা আলোই, আমাদের খুঁজে নেবে।

মাসুদার রহমান। কবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।


