সাহিত্য

গুলবাহারের ঋতুচক্র / ১ || মৌসুমী বিলকিস

শেয়ার করুন:

গ্রীষ্মের গন্ধগুলো

কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দেয় গুলবাহার। ঘামে লেপ্টে থাকা চুল। সারা মাথায় চুলগুলো উঁচু উঁচু হয়ে আছে, এলোমেলো সব। সেই সকালে বেরোনোর সময় একবার তাড়াহুড়ো করে চুল আঁচড়ে নিয়েছিল। ফলত এরকম হবেই। বিজ্ঞাপনের বা সিনেমার অভিনেতাদের মতো সিল্কি ঝকঝকে চুল হওয়ার কথা নয় তার। পরে জেনেছে সে প্রত্যেকবার ছবি তোলার আগে চুল ঠিক করা হয়, মেকআপ ঠিক করা হয়। তাছাড়া আলো, ক্যামেরা ইত্যাদির কারসাজি তো আছেই।

এ বিষয়ে একটা বই পড়েছিল সে। আজকাল টিভির চ্যানেল ঘোরালে বা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটালেও সব জানা যায়। একসময় সিনেমা নিয়ে কত পাগলামি ছিল তার। ভাবতো অভিনেতা বা ক্রিউ মেম্বার হবে। চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু নিকটজনদের ঘোরতর আপত্তিতে এগোতে পারেনি। আপাতত কাঁধে ভারি ব্যাগ নিয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে থাকে সে। তার বিপরীতে সরে সরে যায় উঁচু উঁচু বিল্ডিং, ধোপদুরস্ত ও সাধারণ পোশাকের লোকজন, সাজুগুজু তরুণী ও মহিলারা। একটা বিল্ডিং এর সামনে এসে লোহার গেট পেরিয়ে ঢুকতে যায় সে। সিকিউরিটি আটকে দেয়।

: কোন ফ্ল্যাটে যাবেন, ম্যাম?

নির্দিষ্ট কোনো ফ্ল্যাট তো নয়। সব ফ্ল্যাটগুলোই সে কভার করতে চায়। বিব্রত হয়ে পড়ে সে। আমতা আমতা করে। সত্যি বলার ফলাফল সে জানে। তবু আসল কথাটাই বলে,

: মানে, সেলস্‌ অফিস থেকে আসছি। বইপত্র আছে সঙ্গে।

: সেলস গার্ল? না ম্যাম, ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই।

তবুও ভিতরে তাকিয়ে গুলবাহার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। বিল্ডিং এর সামনে গেটের ভেতর সার দিয়ে গাছপালা লাগানো, কয়েকটা সিমেন্টের বসার জায়গা। এক কাজের মেয়ে, যার শাড়ি দেখলেই বোঝা যায়, হাতে একটা হালকা বাজারের থলে নিয়ে সিমেন্টের চেয়ারে বসে। সঙ্গে সঙ্গে সিকিউরিটি তাকে উঠিয়ে দেয়। মেয়েটি অনুচ্চ স্বরে কীসব বিড়বিড় করতে করতে গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। তার চোখ দুটো ক্লান্ত। সম্ভবত দুটো কাজের মাঝখানে একটু বসে জিরিয়ে নিতে চাইছিল। একটা গাড়ি ভেতরে ঢোকে।

গুলবাহার আর দাঁড়ায় না। নতুন একটা রাস্তায় হেঁটে যায়। আর একটা বিল্ডিং খুঁজে নেয়। এখানেও লোহার গেট। সিকিউরিটি নেই। গেট বন্ধ। কিন্তু আটকানো নয়। গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে যায় সে। সিঁড়ির পাশে লিফট। লিফটের পাশের একটা ছোট্ট ঘর থেকে কথাবার্তার শব্দ আসছে। সম্ভবত সিকিউরিটিরা লাঞ্চ করছে। লিফট অ্যাভয়েড করে সে। লিফটের সুইচ টিপে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। চার তলায় লিফট। আসতে সময় নেবে। চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়।

তিনতলায় উঠে সিঁড়ির মুখে থামে সে। দম নেয়। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত। কয়েক মিনিট অপেক্ষা ক’রে স্বাভাবিক হয়। ঢাউস ব্যাকপ্যাক থেকে একটা বই বের করে হাতে নেয়। গলা ঝেড়ে পরিষ্কার করে। তারপর একটা ফ্ল্যাটের কলিং বেল বাজায়। এক মহিলা এমন মুখ করে দরজা খোলে যেন কাঁচা করলা চিবিয়েছে। তার পিছনে একটি বাচ্চা কৌতূহলে চেয়ে আছে। গুলবাহার বাচ্চাটির উদ্দেশে হাসে। মহিলার গলায় যাবতীয় বিরক্তি,

: ক্যা?

সৌজন্য বোধ অবধি নেই। কী কর্কশ! গুলবাহার বুঝতে পারে এখানে সুবিধা হবে না। রান্না বা সৌন্দর্য চর্চার কোনো প্রোডাক্ট হলে একবার শেষ চেষ্টা করত। কিন্তু এ তো বই, শুধু বই নয় ঢাউস ডিকশিওনারি। গুলবাহার তাও ডেমনস্‌ট্রেট করে,

: অ্যাকচুয়ালি ম্যায় ম্যানেজমেন্ট কা স্টুডেন্ট হু। প্র্যাকটিস কে লিয়ে আপকা সামনে হাজির হু। মেরে পাস এক কিতাব হেঁ। আপ দেখ সাকতি।

সে জানে তার হিন্দি ভালো নয় এবং অফিস থেকে যেভাবে ডেমনস্‌ট্রেট করতে নির্দেশ দেওয়া আছে সেই লাইনগুলোও গুলিয়ে যায় তার। তবু গুলবাহার হাতে ধরা ডিকশিওনারি এগিয়ে দেয় মহিলার দিকে। মহিলা ভ্রূ কুঁচকেই ছিলেন, আরো কুঁচকে ফটাস করে দরজা বন্ধ করে দেন। বাচ্চাটা হঠাৎ কাঁদতে শুরু করে। সম্ভবত দরজার শব্দে সে চমকে গেছে বা মহিলা পিছন ঘুরতে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছেন। গুলবাহার হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

অন্য ফ্ল্যাটগুলিতে বেল বাজানোর ইচ্ছে তার চলে যায়। সে শুনতে পায় একটা টেলিফোনের রিং। রিংটোন বন্ধ হতেই ভেতর থেকে মহিলার গলা শোনে। সিকিউরিটিকে বকাবকি করছেন মহিলা। শুনতে পেয়ে বই হাতে নিয়েই সিঁড়ি ধরে নীচে নামতে থাকে। একজন সিকিউরিটিকে হন্তদন্ত হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসতে দেখে। মুখোমুখি হয় তার।

: ম্যাম, ইহাপে সেলসম্যান অ্যালাউড নেহি হে। কৃপায়া করকে আপ নিকাল যাইয়ে।

গুলবাহার কোনো প্রত্যুত্তর করে না। চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকে। লোকটি তার পিছন পিছন আসে গেট অবধি। গেট খুলে গুলবাহার সোজা বেরিয়ে যায় রাস্তায়। আত্মসম্মানে লাগে তার। কিন্তু সে জানে এইসব অপমান মনে রাখলে কাজ করতে পারবে না। তাকে আরো ঘুরতে হবে, বই বিক্রি করতে হবে। রুমাল বের করে মুখ মুছে নেয়।

দুপুর গড়িয়ে গেছে। লাঞ্চ হয়নি। বই বিক্রি হয়নি একটাও। ক্লান্ত পা দু’টি আবার এগিয়ে চলে। পায়ের নীচে সরে সরে যায় গরম পিচের রাস্তা। পিঠের ব্যাগটা ভারী হয়ে ঝুলে আছে। তবু ব্যাগ নামিয়ে কোথাও ব’সে রেস্ট নেওয়ার সময় নেই। মুখে, কপালে, ঘাড়ে বিজবিজ করছে ঘাম। হাঁটতে হাঁটতে ওড়নার প্রান্ত দিয়ে ঘাম মোছে। ওড়নার প্রান্তে জমে একগাদা ধুলোবালি, ধোঁয়ার পরত।

সে কী বড় ধীরে হাঁটছে? হাঁটার গতি খানিক বাড়িয়ে দেয় সে। হাঁটতে হাঁটতে বাঁ দিকে একটা সরু গলি চোখে পড়ে। গলিটার মুখে দাঁড়িয়ে মুহূর্তমাত্র ভেবে নেয়। গলিটায় ঢুকে পড়ে। দু’পাশের উঁচু দেয়াল সরে যায় দ্রুত। গলির বাঁক ঘুরে একটা বাড়িতে ঢোকার আগে চোখ বন্ধ করে দু’মিনিট আত্মস্থ করে নেয় নিজেকে। চোখ খুলেই দেখে বাড়িটার পাশ দিয়ে একটা লোক ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার দিকে তাকিয়ে। সে লোকটাকে একবার দেখেই চোখ সরিয়ে নেয়। কলিং বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করে।

দরজা খোলেন এক মহিলা। তাঁর মুখে হাসি ছড়িয়ে আছে। গুলবাহার আশ্বস্ত হয়, যাক এই মহিলা অন্তত তাকে তাড়িয়ে দেবেন না। মহিলা দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে ডান হাত ঘরের দিকে প্রসারিত করে গুলবাহারকে ভেতরে ঢোকার ইঙ্গিত করেন এমনভাবে যেন সে অনেকদিনের পরিচিত। দরজা বন্ধ করে সোফার দিকে হাত বাড়ান তিনি,

: প্লিজ।

গুলবাহার সামান্য হেসে সোফায় বসে। ভারী ব্যাগ নামিয়ে রাখে মেঝেয়। কিছু বলার জন্য সে মুখ খোলে। কিন্তু তার দিকে পিছন করে একটা স্বচ্ছ্ব পর্দা সরিয়ে মহিলা ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে গেছেন। গা এলিয়ে দেয় সে। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। কিছুক্ষণমাত্র। পায়ের শব্দে সচেতন হয়ে সে সোজা হয়ে বসে। মহিলা একটা ট্রে হাতে ঢুকছেন। টি টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখেন তিনি। এক গ্লাস জল, দুটো মিষ্টি, নিমকি, চানাচুর। বিব্রত হয় গুলবাহার। সে যে কাজের জন্য এসেছে সেটা বলেই চলে যাবে জানায়। মহিলা নাছোড়। তাকে খেতেই হয়।

খেতে গিয়ে আনমনা হয়ে গোগ্রাসে খায় সে। খেতে খেতে সচেতন হয়ে ওঠে। মহিলার দিকে তাকায়। মহিলা অপলক তাকে দেখছেন। খানিক অপ্রস্তুত হয় গুলবাহার। বোকার মতো হাসে। ধীরে ধীরে খায়। খাওয়া শেষ করে চোঁ-চোঁ জল খায়। গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ইতঃস্তত করে। অযথাই গলা পরিষ্কার করে সে। বইটা ডেমনস্‌ট্রেট করতে বাধো বাধো ঠেকে। নানান ভাবনা ঘুরতে থাকে মাথায়।

তাকে মহিলা জল ও খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করেছেন ঠিকই তাই বলে সে যদি নিজের কাজ না-করে তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এক বেলার খাদ্য মহিলা দিয়েছেন তারজন্য সেও তার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু বাকি দিনগুলোর ভাবনা যে তাকেই ভাবতে হবে। অনেক দুপুরেই তার খাবার জোটে না কিছু। হাতে টাকা থাকে না বলে বা সারা মাস এই সামান্য টাকায় চালাতে হবে মনে করে খাবার কিনতে সাহস হয় না। নিজের টাকা শেষ হয়ে গেলে কার কাছ থেকেই বা ধার করবে? ধার করে শোধ দিতে পারার নিশ্চয়তা নেই। পরের মাসে আদৌ তার কিছু আয় হবে কি না জানে না। না-খেয়ে খেয়ে মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার মা কতবার তাকে টিফিন নিয়ে বেরোনোর কথা বলে। কিন্তু নিজের জন্য টিফিন ক্যারি করা এক ধরণের বিলাসিতা তার পক্ষে। বরং সেই খাবার বাঁচলে আরো কিছুদিন সংসার চলবে। কম করে সপ্তাহখানেক চললেও মন্দ নয়। অথচ খাওয়া-পরার জন্য মানুষের এত চিন্তার প্রয়োজন ছিল না।

সব মানুষের খাওয়া-পরার মতো ধনসম্পদ পৃথিবীতে আছে। পৃথিবীর জনসংখ্যার নিরিখে খুব সামান্য কয়েকজন সেই সম্পদ রেখে দিয়েছে হাতের মুঠোয়। সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে হাসি হাসি মুখে মহিলাকে বইটা সম্পর্কে বলতে থাকে গুলবাহার। মহিলা একটা বই কিনেও নেন। যদিও খুব একটা উলটেপালটে দেখেন না। বইটা হাতে নিয়ে মহিলা পাতাগুলোর প্রান্ত আগুল দিয়ে চেপে ধ’রে বুড়ো আঙুলটা ডান প্রান্তের মলাটের দিকে সরাতে থাকেন। পাতাগুলো সরসর শব্দ ক’রে বাঁ-প্রান্তের মলাটের দিকে জমা হয়।

গুলবাহার কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই তাকিয়ে থাকে মহিলার সরে যাওয়া বুড়ো আঙুলটির দিকে। আত্মগ্লানি হয় তার। সে আসলে মহিলাকে বেচেছে একটা ইংরেজি ডিকশিওনারি যার অক্ষরগুলো আতশ কাচ ছাড়া উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। সে আসলে থার্ড পার্সন। কোম্পানি কী প্রোডাক্ট বেচবে তাতে তার হাত নেই। তার গ্রুপ লিডার পইপই করে ব’লে দিয়েছে, বইটা যেন কাস্টমারকে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে না-দেওয়া হয়। আর বিক্রি হলেই মূল্য নিয়ে স্যাট করে যেন অকুস্থল থেকে কেটে পড়ে।

সে-চেষ্টা যে সে করেনি তা নয়, কিন্তু কেউ কেউ ঠিক খুঁত বের করেছে। কেউ আবার কেনার আগে বইটার যে-কোনো পৃষ্ঠা খুলে একটা শব্দ বেছে নিয়ে তার অর্থ জানতে চেয়েছে। তখন তার অবস্থা, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। ইংরেজি আর অঙ্কতে একেবারে লবডঙ্কা। কেউ ইংরেজিতে কথা বললে তার সামনে যেতে ভয় করে। দ্রুত যারা ইংরেজি বলে তাদের একটা কথাও বুঝতে পারে না সে। আর ব্রিটিশ ইংরেজি বললে তো সব্বোনাশ!

একবার সে বই ফেরি করতে করতে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পাড়ায় ঢুকে পড়েছিল। সব বুড়োবুড়ি। কেউ কেউ একা। সাহস করে সে বাংলাতেই কথা বলেছিল। কেউ কেউ বুঝেওছিল। অনেকে বুঝেও ভাব করছিল বোঝেনি। তাদের সঙ্গে ভুলভাল ইংরেজিতে কমিউনিকেট করার চেষ্টা করেছিল। যদিও কেউ বই কেনেনি এক মহিলা ছাড়া।

একটা বড় বাড়িতে মহিলা একা একা থাকেন। খুব সফট্‌ ব্যবহার করেছিলেন তিনি গুলবাহারের সঙ্গে। ছাদের ওপর ডেকে নিয়ে তাকে দেখিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় বাগান, টবে লাগানো ছোট-বড় নানারকম গাছ। কিছু ছোট সাইজের ফলের গাছে ফল ধরে আছে দেখে গুলবাহার আশ্চর্য হয়েছিল। তখন মহিলাকে এড়িয়ে রাস্তায় বেরোতে পারলেই বাঁচে সে।

মনে আছে মহিলা গাছ দেখানো শেষ করে কফি খাওয়াতে চেয়েছিলেন। সেই সুযোগে গুলবাহার কাজের অজুহাত দিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল। মহিলা তখন বইয়ের টাকাটা দিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে গুলবাহারের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বাঁক নেওয়ার আগে একবার পিছন ফিরে গুলবাহার হেসে ওয়েভ করেছিল তাঁকে।            

এই ঠা-ঠা গরমে ঘামে ভিজে যেতে যেতে গুলবাহার খেয়াল করে রাস্তায় লোকজন কম। ওই দূরের ফুটপাথ থেকে ধোঁয়া ধোঁয়া স্বচ্ছ্ব হলকা উঠছে। ধোঁয়ার ওপারের সবকিছু অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে প্রায় রংহীন একটা পেন্টিং, কংক্রিটের বাড়িঘর আর দু’একটা মানুষের শরীর। কখনো কখনো সেই ফ্রেমের ভেতর এসে পড়ছে কয়েকটা সদ্য রং করা বাড়িও।

উলটোদিকে প্রায় শুকনো একটা জলের ট্যাপে বসে নিচু হয়ে ঠোঁট ঢুকিয়ে দিয়েছে একটি কাক। আর একটি কাক তাকে তেড়ে নীচে নামিয়ে দিল। নীচে জমে থাকা জল খেতে থাকল তারা। গুলবাহার এগিয়ে চলে। তার নাকে এসে লাগে নানারকম গন্ধ। খারাপ গন্ধই বেশি। একটা পুরো দিন যদি খারাপ গন্ধে কেটে যায় তো স্মৃতি থেকে ভালো গন্ধ পাওয়ার চেষ্টা করে সে। প্রত্যাশিত গন্ধটা মনে করতে পারলে তার মন সারা দিনের জন্য হালকা হয়ে যায়। রাস্তায় দেখা ভালোলাগা ছেলেগুলোর গা থেকেও তখন তার মনের গন্ধটা ভেসে আসে। ঘামে ভেজা শার্ট গায়ে আটকে আছে ভালোলাগা যে ছেলের তার গা থেকেও আসে গন্ধটা। সে তখন প্রায় উড়ে উড়ে সেইসব দিনগুলো পার করে দেয়।

সালোয়ার কামিজ গায়ে লেপটে থাকে তার। ফুল হাতা। গরমের পক্ষে অনুপযোগী। যদিও বিউটি টিপসে এখন রোদে বেরোলে হাত-পা ঢেকে বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়। শর্ট হাতা পোশাক বানিয়ে নিতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে পুরো পাড়াটা সার্ভে করে ফেলে।

বাড়ি ঢোকার গলিতে একটা শুকনো বাতাস ধুলোবালি, পলিথিনের ব্যাগ উড়িয়ে নিয়ে যায়। সন্ধের মুখে মুখে সে বাড়ি ঢোকে। প্রায় অন্ধকার ঘরে বিছানার ওপর মা শুয়ে আছেন। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পড়ছে বোন। একটা ফ্যান সারা জীবনের বিরক্তি নিয়ে শব্দ করে ধীরেসুস্থে ঘুরছে। এক চিলতে রান্নার জায়গায় ট্যাপে জল পড়ছে টপ্‌ টপ্‌। ওকে দেখতে পেয়েই বোন দৌড়ে এসে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে নেয়।

পাশের ছোট্ট ঘরটা গুলবাহারের নিজের। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে ডায়রিতে লিখে রাখে, ‘এই বিরক্তিকর সিলিং ফ্যানটা পালটাতে হবে। সবার জন্য কিনতে হবে গরমের উপযোগী পোশাক।’


তিনটি কিস্তিতে এই দিঘল আখ্যান, ‘গুলবাহারের ঋতুচক্র’, রইল এখানে এর প্রথম অংশ ‘গ্রীষ্মের গন্ধগুলো’। পরবর্তী কিস্তিদ্বয় আশু প্রকাশ্য।

মৌসুমী বিলকিস। কবি, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রপরিচালক। জন্ম মুর্শিদাবাদে। কলকাতায় বসবাস। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্মস্কুল ‘রূপকলা কেন্দ্র’ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে’ (কবিতা, ২০১৭); ‘একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যরা’ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭); ‘হলদে শাড়িটি এবং অন্যান্য অণুগল্প’ (২০১৭); ‘বোরখার প্রান্ত উড়ে যায়’ (গল্পগ্রন্থ, ২০২৬, আসছে) ‘একা এবং একরাত্রি’ (উপন্যাস, প্রকাশিতব্য)। পরিচালিত চলচ্চিত্র : ‘কবি’ (তথ্যচিত্র, ২০০৪); ‘শবনম’ (শর্ট ফিকশন, ২০০৪); ‘সবুজের অভিযান’ (তথ্যচিত্র, ২০০৫); ‘আবাদ’ (ডকুফিকশন, ২০১১)। নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্র : ‘সাউন্ড অফ কসমিক সেলফ’ (তথ্যচিত্র), ‘ওয়াকিং থ্রু দ্য ফায়ার’ (তথ্যচিত্র), ‘বাখ ইন দ্য আফটারনুন’ (ফিকশন) ইত্যাদি। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অনীক দত্ত সহ অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। বিভিন্ন দৈনিক, সাহিত্যপত্রিকা ও ওয়েবজিনে নিয়মিত লেখেন।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *