কবিতা সাহিত্য

স্মৃতির জাদুঘরে একদিন ও অন্যান্য কবিতা || মোহাম্মদ জায়েদ আলী

শেয়ার করুন:

স্মৃতির জাদুঘরে একদিন

একদিন হঠাৎ একটি জাদুঘরে ঢুকে পড়লাম|  জাদুঘরটির কোনও দরজা নেই। অন্ধকারের ভিতর দিয়ে শুধু একটি সরু করিডর চলে গেছে। করিডরের দুইপাশে কাচের বাক্সে সাজানো মানুষের ফেলে যাওয়া দিনগুলো।

প্রথম কক্ষে গিয়ে দেখলাম একটি বিকেল। জানালার পাশে বসে আছে এক কিশোর। তার হাতে অর্ধেক-পড়া একটি বই। বাইরে বৃষ্টিতে ভিজছে কৃষ্ণচূড়া। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, এই বিকেলটি আমি আগে কোথাও দেখেছি। আরও ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম, কিশোরটি আসলে আমারই কোনও পুরনো বয়স।

পরের কক্ষে রাখা একটি হাসি। এত স্বচ্ছ, এত অপ্রস্তুত যে মনে হলো, তখনও পৃথিবী কোনও দুঃসংবাদ আবিষ্কার করেনি। কাচের বাক্সের সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। কাচ ছুঁতেই হাসিটা সামান্য কেঁপে উঠল। কোনও শব্দ হলো না।

আরও ভিতরে গিয়ে দেখলাম একটি দীর্ঘ টেবিল। তার ওপর ছড়িয়ে আছে কিছু অসমাপ্ত কথা। কোনও কথার শেষে কমা, কোনওটির শেষে ড্যাশ, কোনওটির শেষে শুধু তিনটি বিন্দু দেখে মনে হলো, কত মানুষ কত কথা বলতে চেয়েও শেষপর্যন্ত বলতে পারেনি।

সেখানে একজন বৃদ্ধ কর্মচারী ছিলেন। তিনি জানালেন, এগুলো মানুষের না-বলা কথার সংগ্রহ। এই জাদুঘরে নাকি এসব কথারই সবচেয়ে বেশি মূল্য।

জানতে চাইলাম, এখানে আমারও কিছু আছে কি না। বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, আমি জীবনে যা যা ভুলে গেছি, তার সবই এখানে আছে। শুধু যেগুলো মনে রেখেছি, সেগুলো এখনও জাদুঘরের বাইরে পড়ে আছে।

শেষ কক্ষে গিয়ে একটি বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। কিন্তু আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পেলাম না। সেখানে দেখা যাচ্ছিল অসংখ্য রাস্তা, পুরনো বাড়ি, নদীর ঘাট, স্কুলের মাঠ, বন্ধ জানালা আর চলে যাওয়া ট্রেন।

সেইসব দৃশ্যের ভিতর দিয়ে একের পর এক মানুষ হেঁটে যাচ্ছিল। তাদের কাউকেই আর চিনতে পারলাম না। অথচ মনে হলো, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই আমার কোনও-না-কোনও দিনের সম্পর্ক ছিল।

অনেকক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম। তখন বুঝতে পারলাম, স্মৃতি আসলে এমনই একটি জাদুঘর—সেখানে মানুষ হারিয়ে যায়, সময় হারিয়ে যায়, মুখগুলো একসময় অচেনা হয়ে যায়। কিন্তু তারা কোথাও-না-কোথাও থেকে যায়।

শুধু তাদের কাছে ফিরে যাওয়ার দরজাটি আমরা আর খুঁজে পাই না।

 

 

পুরনো ডাকঘর

একদিন পুরনো ডাকঘরে গিয়ে দেখি—
দরজা বন্ধ। জানালায় ধুলো।
তবু ভিতর থেকে কেউ যেন ডাকল।

ঢুকে দেখি,
একটি টেবিলের ওপর পড়ে আছে অনেকগুলো চিঠি।
কোনও চিঠির খাম নেই,
কোনও চিঠিতে ঠিকানা নেই।

একটি চিঠি তুলে দেখি, তাতে লেখা—
যে চলে গেছে,
তার কাছে পাঠানো হয়নি।

আরেকটি চিঠিতে শুধু একটি শিশুর হাতের লেখা—
বাবা, তুমি কবে বাড়ি আসবে?

চিঠিগুলো আবার রেখে বেরিয়ে আসার সময়
ডাকঘরের দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল।

বাইরে তখন সন্ধ্যা।

 

 

দূরত্ব

একটি নদী, দুটি তীর—
মাঝখানে শুধু জল নয়,
অসংখ্য না-বলা কথা জমেও রয়।
সময়ের স্রোতে ভেসে যায়
কত অভিমান, কত নীরবতা।

কাছে থেকেও মানুষ
কখনও কখনও
পৌঁছাতে পারে না মানুষের কাছে।

কিছু দূরত্ব ফিতায় মেপে নয়,
হৃদয় দিয়ে বোঝা যায়।


মোহাম্মদ জায়েদ আলী
কবি, প্রাবন্ধিক, গ্রন্থসম্পাদক ও লোকসাহিত্যগবেষক 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *