রাজনীতি

বাব আল-মানদাব দখলে হুতিরা, চাপে লোহিত সাগরের বাণিজ্য

বাব আল-মানদাব দখলে হুতিরা, চাপে লোহিত সাগরের বাণিজ্য
শেয়ার করুন:

ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর কৌশলগত বাব আল-মানদাব প্রণালিতে কার্যত প্রভাব বিস্তার করেছে হুতি বাহিনী। সপ্তাহান্তে তারা বন্দরনগরী মোখা দখল এবং কৌশলগত মায়ুন বা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আফ্রিকার উপকূল থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।

লোহিত সাগরের সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এর মধ্যে সামুদ্রিক তেলের ১১ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ৮ শতাংশ রয়েছে। ফলে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে ইয়েমেনের সীমান্তের বাইরে হুতিরা হস্তক্ষেপ করবে—এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে সংঘাতের প্রভাব আফ্রিকা মহাদেশে পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেন থেকে দুই হাজারের বেশি মানুষ জিবুতিতে পালিয়ে গেছে। ইয়েমেনের উপকূল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের জিবুতির ওবক শহরে পৌঁছানো মানুষদের খাবার ও পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে আরও সহায়তা প্রয়োজন বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হাজেম আল-আসাদ দাবি করেছেন, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাবে নৌ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে। ইরানও বলে আসছে, ইয়েমেনে তাদের মিত্ররা স্বাধীনভাবে কাজ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নৌ কর্মকর্তা আলেক্সান্দ্রু ক্রিস্তিয়ান হুদিস্তেয়ানু বলেছেন, বাব আল-মানদাব প্রণালি হরমুজ প্রণালির চেয়েও সরু। হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাদের সামগ্রিক সক্ষমতায় মৌলিক পরিবর্তন না আনলেও জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা তাদের জন্য আগের চেয়ে সহজ করেছে। উপকূলীয় এলাকায় গোলন্দাজ অবস্থান নিয়ে জলসীমায় থাকা লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা বলা এক হুতি কমান্ডারের ভিডিওও ছড়িয়ে পড়েছে।

আইএমএফের পোর্টওয়াচ তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ ও মোট টনেজ ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কমেছে। ওই সময় লোহিত সাগরে উত্তেজনা বাড়ার পর বড় জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজকে কেপ অব গুড হোপ ঘুরিয়ে চালাতে থাকে। এতে যাত্রায় ২০ দিনের বেশি সময় যোগ হচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ছে।

লোহিত সাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা দেওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন-নেতৃত্বাধীন অপারেশন আতালান্তা নতুন করে হামলা শুরু হলে পর্যাপ্তভাবে কাজ করতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। হুদিস্তেয়ানুর মতে, বিদ্যমান সামরিক মিশনগুলোর নির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকায় হুমকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হতে পারে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে নৌবাহিনীর নজর বাব আল-মানদাব ও হরমুজ প্রণালির দিকে সরিয়ে নেওয়ায় আফ্রিকার শিং অঞ্চলের উপকূলে নিরাপত্তা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুতার পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

হুতিদের আশ্বাস সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলা হয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েল বা তার মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করে গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরে শতাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।

জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় সুয়েজ খালের টোলনির্ভর মিশরের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মিশর প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, যা সুয়েজ খালের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। আফ্রিকা বিষয়ক অধ্যাপক ও সংঘাত নিরসন বিশেষজ্ঞ বদর হাসান আল-শাফেই বলেছেন, ক্ষতি সত্ত্বেও ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ না করার কৌশলগত অবস্থান বজায় রেখেছে মিশর।

এদিকে ইয়েমেনের বিপরীত পাশে অবস্থিত ইরিত্রিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইসাইয়াস আফওয়ার্কি আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে লোহিত সাগরে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন আল-শাফেই।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *