
৬. আকাশে উড়িছে বকপাখি
সকালের আলো উঠে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললাম—জানো, তোমাকে কেউ ভালোবাসে! সে হাসলো। সেই হাসি যার মধ্যে রোদ আর ঘুম দুটোই মিশে থাকে। বললো সে—হ্যাঁ, ওই কাক দুটো ভালোবাসে আমাকে। ওরা তারে এসে বসেছে, কেমন তাকিয়ে আছে দেখো। এখন ওদের খেতে দেবো।
আমি চুপ করে রইলাম। তারের উপর দুটো কাক। কালো, শক্ত, বাস্তব। ওরা ঝগড়া করছে না। ওরা ভাগ করে খাচ্ছে। একটা ঠোকর দেয়, আরেকটা সরে দাঁড়ায়। তারপর আবার কাছে আসে। ওদের চোখে পৃথিবী নেই। শুধু একে অপরের ডানা আছে।
ওরা তোমার কাছে খেতে এসেছে, তার মানে এই নয় যে ওরা তোমাকে ভালোবাসে। বরং ওই কাক দুটো দুজন দুজনকে ভালোবাসে, বললাম তাকে।
সে ভাতের থালা হাতে নিলো। জানালার কার্নিশে ছড়িয়ে দিলো। কাক দুটো নেমে এল। ঠুকরে ঠুকরে খেল। খাওয়া শেষে একটা আরেকটার গা ঘেঁষে বসলো। তারপর একসাথে উড়ে গেল। আমি দেখলাম, ভালোবাসা কত সহজ। একসাথে খাওয়া। একসাথে ওড়া। তারপর তাকে বললাম—তবে তৃতীয় একটি কাক তোমাকে ভালোবাসে, কিন্তু তুমি তো দিগন্তে উড়ে চলা সাদা বক পাখি…
সে আকাশের দিকে তাকালো। সত্যিই, অনেক দূরে একটা সাদা বক উড়ে যাচ্ছে। একা। তার ডানার নিচে সকালের আলো সোনা হয়ে গলে পড়ছে। ওটা বক না। ওটাই তুমি। তৃতীয় কাকটা আমি। কালো। মাটির কাছের। কার্নিশে বসে থাকি। তোমার হাতের ভাতের জন্য না। তোমার একটা কথার জন্য। তুমি যখন আকাশ দেখো, আমিও দেখি। তুমি যখন চুপ করো, আমার বুকের ভেতর হাজারটা কাক ডেকে ওঠে।
তুমি বললে, বক’রা একা ওড়ে কেন জানো? ওদের সাথি লাগে না?
আমি বললাম, আর কাক? ওদের সাথি লাগে?
তুমি বললে, তাই তো ওরা সুখী।
আমি কিছু বললাম না। কারণ সুখী হওয়ার জন্য সাথি লাগে, এটা আমি জানি। আর সাথি না পাওয়ার জন্য কেউ কেউ কাক হয়েও থেকে যায়।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। তুমি কাজে গেলে। আমি থেকে গেলাম। তারের উপর আর কাক নেই। শুধু ভাতের দুটো দানা লেগে আছে। আর আকাশে বকপাখিটা এখন আর দেখা যাচ্ছে না। দিগন্ত তাকে গিলে ফেলেছে।
বিকেলে বৃষ্টি নামলো। আমি ভিজলাম না। ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, তুমি যদি এখন এসে বলতে—চলো ভিজি, তাহলে আমি কাকের সব নিয়ম ভেঙে বকের মতো উড়ে যেতাম। কিন্তু তুমি বললে না।
রাত নামলো। তোমার ঘরের আলো জ্বললো। জানালায় তোমার ছায়া। তুমি বই পড়ছো। আমি রাস্তার ওপাশে। তৃতীয় কাকের মতো। যার ডাক কেউ শোনে না, কারণ সে সকালের কাক না। সে রাতের কাক।
কাক দুটোকে তুমি ভালোবাসো, কারণ ওরা প্রতিদিন আসে। বকপাখিটাকে তুমি ভালোবাসো, কারণ ও প্রতিদিন যায়। আর আমাকে? আমাকে তুমি ভালোবাসো না, কারণ আমি না আসি, না যাই। আমি শুধু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকি। সকালের আলো আর রাতের অন্ধকারের মাঝখানে।
একদিন তুমি চলে যাবে। অন্য কোথাও। অন্য আকাশে। সেদিন তারে আর কাক বসবে না। ভাতের থালা খালি পড়ে থাকবে। আর দিগন্তে কোনো বকও উড়বে না। শুধু একটা কালো কাক সারাদিন কার্নিশে বসে থাকবে। কারো জন্য না। অভ্যাসের জন্য।
সকালের আলো আবার উঠে আসবে। কেউ বলবে না—জানো, তোমাকে কেউ ভালোবাসে! কারণ ভালোবাসার কথাটা বলার মানুষটাই তো থাকবে না।
তাই আজকের এই সকালটা রেখে দিলাম। তোমার হাসি, কাকদুটোর ঝগড়া, দূরের বক—সব।
তোমার থেকে উপহার পাওয়া ডায়েরির পাতায়। যে-ডায়েরি কেউ পড়বে না। কিছু গল্প কবিতাও এমন হয়। শেষে পাঠক শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস পায়। আর একটা সাদা পালক। যেটা কোথা থেকে উড়ে এসেছে, কেউ জানে না।
স্ক্রল করে দেখা ধারাবাহিক অন্যান্য পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

মাসুদার রহমান। কবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।



