২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে নিউইয়র্ক সিটিতে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের সফরকে কেন্দ্র করে শত বছরের পুরনো এক বিতর্ক নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। এই বিতর্কের মূলে রয়েছে ঐতিহাসিক কোহিনূর হীরা এবং এটি ফেরত দেওয়ার দাবি। নিউইয়র্ক শহরের প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানি যখন সরাসরি রাজাকে হীরাটি ভারতে ফেরত দিতে উৎসাহিত করার ঘোষণা দেন, তখন বিশ্বজুড়ে শুরু হয় নতুন আলোচনা।
ঘটনাটি ঘটে ২৯ এপ্রিল, ২০২৬। ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকীর প্রস্তুতি হিসেবে রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলা নিউইয়র্কের মেমোরিয়াল পরিদর্শনে যান। সেখানে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর গম্ভীর পরিবেশের মধ্যেই মেয়র জোহরান মামদানি জানান, ব্যক্তিগত আলাপের সুযোগ পেলে তিনি রাজাকে বলবেন যেন ১০৫.৬ ক্যারেটের ঐতিহাসিক কোহিনূর হীরাটি ভারতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তার এই একটি মন্তব্য কেবল রাজকীয় শিষ্টাচারকে চ্যালেঞ্জ করেনি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মালিকানা নিয়ে এক নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে।

কোহিনূর বা ‘আলোর পাহাড়’ বিশ্বের অন্যতম দামী হীরা। এটি মূলত দক্ষিণ ভারতের খনি থেকে পাওয়া যায় এবং দীর্ঘ সময় মোগল সম্রাটদের অধীনে ছিল। পরবর্তীতে এটি পারস্যের নাদির শাহ, আফগান শাসকদের হাত ঘুরে সবশেষে শিখ মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের হাতে আসে। ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা যখন পাঞ্জাব দখল করে, তখন ১০ বছর বয়সী মহারাজা দলীপ সিংকে দিয়ে একটি চুক্তি সই করিয়ে হীরাটি ব্রিটেনের রানীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি একে ‘উপহার’ বললেও সমালোচকদের মতে, একজন শিশু রাজাকে চাপে ফেলে চুক্তিতে সই করিয়ে সম্পদ কেড়ে নেওয়াকে কোনোভাবেই ‘উপহার’ বলা যায় না, বরং এটি ছিল এক ধরনের ঐতিহাসিক চাতুরি।
মেয়র জোহরান মামদানির এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে তার বাবা, বিখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তাবিদ মাহমুদ মামদানির দর্শন। মাহমুদ মামদানি তার গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে ইউরোপীয় শক্তিগুলো উপনিবেশ গড়ে তোলার সময় স্থানীয় মানুষের পরিচয় বদলে দিয়েছিল এবং তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল। জোহরান মামদানি যখন হীরাটি ফেরত চান, তিনি আসলে তার বাবার সেই ‘বি-উপনিবেশায়ন’ (Decolonization) তত্ত্বকেই বাস্তবে রূপ দিতে চান।
কোহিনূর ফেরত দেওয়ার দাবিটি শুনতে যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই জটিল। ব্রিটিশ সরকার দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছে যে, ১৯৬৩ সালের ‘ব্রিটিশ মিউজিয়াম অ্যাক্ট’ অনুযায়ী তারা রাষ্ট্রীয় সংগ্রহ থেকে কোনো বস্তু অন্য দেশে ফিরিয়ে দিতে পারে না। এছাড়া একটি বড় প্রশ্ন হলো—হীরাটি কাকে ফেরত দেওয়া হবে? কারণ ভারত, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান- সব দেশই ঐতিহাসিকভাবে এর দাবিদার।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরাসরি হীরা ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলেও কিছু মধ্যবর্তী পথ বের করা যেতে পারে। যেমন- আইন সংশোধন করা, দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ভিত্তিতে হীরাটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা, অথবা একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনশালা তৈরি করা যেখানে সবাই এর মালিকানার অংশীদার হবে।
বর্তমানে সারাবিশ্বেই লুণ্ঠিত প্রত্নসম্পদ ফেরত দেওয়ার একটি বড় আন্দোলন চলছে। নাইজেরিয়ার ‘বেনিন ব্রোঞ্জ’ বা গ্রিসের ‘পার্থেনন মার্বেলস’ নিয়ে ব্রিটেন ও ইউরোপীয় দেশগুলো চাপের মুখে আছে। তবে কোহিনূর যতদিন লন্ডনের টাওয়ারে থাকবে, ততদিন এটি ঔপনিবেশিক ক্ষতের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়েই থেকে যাবে।

তারিক হাসান ঋজু । প্রকৌশলী



