সাহিত্য

কবির সঙ্গে কবিতার সঙ্গে ।। সুমন তুরহান

শেয়ার করুন:

‘সৌমিত্র দেব : কবিতাসমগ্র’ প্রকল্পটি বহু অনুরাগীর শ্রম ও ভালোবাসার প্রকাশ। এই কর্মযজ্ঞের সূচনায় যাঁর নাম উচ্চারণ করা অনিবার্য, তিনি কবির সহধর্মিণী ডিম্পেল দৌলা—শোকের তিমিরে দাঁড়িয়েও যিনি এই গ্রন্থের ব্যাপারে আমার প্রস্তাব ধৈর্য ধরে শুনেছেন, প্রত্যয়ের সাথে সমর্থন দিয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে কবির জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন। ধন্যবাদ জানাই কবির বড়বোন শর্বরী দেবকেও—কবির কৈশোর ও প্রথম জীবনের যে বিশ্বস্ত আলেখ্য তিনি উন্মোচন করেছেন আমার কাছে, তা এই সৃষ্টিসম্ভারকে অনুভব করতে সাহায্য করেছে। কবির এককালের নিত্যসহচর পুলক কান্তি ধরের প্রতি জানাই আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতা; এই গ্রন্থ সংকলনের প্রারম্ভিক ভাবনাটি প্রথম ভাগ করেছিলাম তাঁরই সঙ্গে, এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর প্রকাশনা-বিষয়ক অভিজ্ঞতা, উপদেশ ও নিরন্তর অনুপ্রেরণায় আমি উপকৃত ও উৎসাহিত হয়েছি।

আমার প্রাথমিক কাজ ছিলো কবির বিক্ষিপ্ত ও প্রায়-লুপ্ত সৃষ্টিসম্ভার পুনরুদ্ধার করা। এই প্রয়াসে কবির সহধর্মিণীর পাশাপাশি যাঁদের আমি পাশে পেয়েছি, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শ্রীলা শময়িতা (পূর্ণা ভৌমিক), সুনীল শৈশব (বিশ্বজিৎ লাল দত্ত), অসিত কুমার দাশ, এবং কবির মেজো বোন শর্মিলা দেব। তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা। পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের পর এর শ্রমসাধ্য অক্ষরবিন্যাসের কাজটি সম্পন্ন করেছেন রাজীব ভট্টাচার্য্য। আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের ক্যামেরায় মুহূর্তবন্দি কবির সেই দুর্লভ প্রতিকৃতিটি পুনরুজ্জীবিত করেছেন নিউ ইয়র্কের ‘ব্রুকলিন এডিশন্স’-এর সংরক্ষণবিদ মার্টিন চায়কভস্কি। এছাড়াও, প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে মানবেন্দ্র কিশোর দেব রায়, শান্তনু দাস, নির্বেন্দু নির্ধূত, হাসানআল আব্দুল্লাহ, রেদওয়ানুল রহমান জুয়েল-সহ বহু অগ্রজের প্রাজ্ঞ উপদেশ ও বৌদ্ধিক প্রেরণা আমার পথনির্দেশ করেছে। দীপিকা শঙ্কর ভট্টাচার্য্য, অভিজিত দাস, ও সজল দেবের মতো বাল্যবন্ধুদের অবদানও বিস্মৃত হওয়ার নয়।

একঝাঁক প্রতিভাদীপ্ত ভারতীয় বন্ধু এই প্রকল্পে কাজ করেছেন—এবং, এই গ্রন্থের নান্দনিক শরীর নির্মিত হয়েছে তাঁদের মেধা ও শ্রমে। এই মেলবন্ধনের প্রধান স্থপতি ‘ওপারের বই’-এর কর্ণধার ও আমার গ্রন্থসখা শুভদীপ ঘোষ, যিনি গভীর নিষ্ঠার সাথে তাঁর ওপর অর্পিত গুরুদায়িত্বটি পালন করেছেন। শিল্পী অরুণেশ মিত্রের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়—অলঙ্করণের অনবদ্য সুষমায় গ্রন্থটিকে নান্দনিক পূর্ণতা দিয়েছেন তিনি। শিল্পী পার্থ ঘোষ অনুরাগ ও নিষ্ঠার সাথে কাঠকয়লায় ফুটিয়ে তুলেছেন কবির একাধিক মুখচ্ছবি; যার একটি শোভা পেয়েছে প্রচ্ছদে, আর বাকিগুলো দীপ্ত হয়েছে বইয়ের অন্তরাল জুড়ে। শিল্পী তৌসিফ হকের ক্যালিগ্রাফিতে প্রাণ পেয়েছে অনন্য সব পংক্তি; পাশাপাশি গ্রাফিক ডিজাইনার রূপসা দাশের সযত্ন স্পর্শে অবয়ব পেয়েছে মুগ্ধকর সব প্রচারচিত্র। আর, এই সমস্ত অলঙ্করণ, ক্যালিগ্রাফি ও প্রতিকৃতিকে যিনি প্রকাশনার সৌন্দর্যশৃঙ্খলা, পৃষ্ঠাসজ্জা ও বর্ণবিন্যাসের শিল্পিত প্রতিসাম্যে বিন্যস্ত করেছেন, তিনি তন্ময় দাশগুপ্ত—নেপথ্যের নিঃশব্দ নিয়ন্তা। পাঠকের অগোচরেই থেকে যাবে যে, আমাদের এই বন্ধুরা জীবনের নানাবিধ সংকট ও ব্যক্তিগত বিয়োগব্যথার ভেতর দিয়েও নীরবে কাজ করে গেছেন। তাঁদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা চিরন্তন ও সীমাহীন।

এই গ্রন্থ সম্পাদনার কাজটি আমার জন্য ছিলো এক প্রকার সাধনধ্যান; আর এই বছরব্যাপী সাধনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্জনতার পরিসরটি নির্মাণে আত্মত্যাগ করেছেন আমার স্ত্রী ও কন্যা—তাদের প্রতি আমার এই জনমের ঋণ আরও গভীরতর হলো।

যারা কবি সৌমিত্র দেবকে চিনতেন, ভালোবাসতেন, ভুলে গেছেন কিংবা ভুলতে পারেননি—এই গ্রন্থ তাদের জন্য। আর আমার জন্য—পূর্ণসমাপ্তি। বৃত্তটি অবশেষে সম্পূর্ণ হলো।


সুমন তুরহান, কবি ও সম্পাদক।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *