- প্রবাসে একান্নবর্তী পরিবারের অনন্য দৃষ্টান্ত : শতাধিক স্বজনের ভালোবাসায় বেঁচে আছে সম্পর্কের বাংলাদেশ
যে পৃথিবীতে দিন দিন যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট ছোট পরিবারে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে মানুষের জীবন, যেখানে ব্যস্ততা আর দূরত্ব অনেক সম্পর্ককে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত করছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এক বাংলাদেশি পরিবার নীরবে রচনা করছে এক অনন্য ইতিহাস। তাঁরা প্রমাণ করেছেন—পরিবার শুধু একসঙ্গে বসবাসের নাম নয়; পরিবার মানে হৃদয়ের বন্ধন, আত্মার টান এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভালোবাসার উত্তরাধিকার।
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার জলডুপ, লাউতা ইউনিয়নের পাড়িয়াবহর (কালাইউরা) গ্রামের সন্তান জনাব মাসুকুল ইসলাম খান। তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম হাজি নিমার আলী খান (মাস্টার)। প্রায় ৪০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে এবং গত ২৩ বছর ধরে ফিলাডেলফিয়ায় বসবাস করলেও তিনি কখনো তাঁর শিকড় কিংবা আত্মীয়তার বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হননি।
আজ তাঁর উদ্যোগ ও পারিবারিক ঐক্যের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে প্রবাসে এক বিরল একান্নবর্তী পরিবারের উদাহরণ। এই বৃহৎ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ২৫টি পরিবার। ভাই-বোন, কাজিন, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগনে-ভাগনি, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি এবং নিকটাত্মীয় মিলিয়ে সদস্যসংখ্যা এখন শতাধিকেরও বেশি।

প্রতিবছর ঈদ, পারিবারিক পুনর্মিলনী, বাৎসরিক পিকনিক কিংবা বিশেষ উপলক্ষে সবাই একত্রিত হন। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই আয়োজন এখন শুধু একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মীয়তার বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার এক সুন্দর ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
গত ২৬ জুলাই পেনসিলভানিয়ার বেনসালামের মনোরম কোর ক্রিক পার্কে অনুষ্ঠিত হয় তাঁদের বার্ষিক পারিবারিক পিকনিক। সবুজ প্রকৃতির বুকে শতাধিক স্বজনের উপস্থিতিতে পার্কটি যেন একদিনের জন্য রূপ নিয়েছিল ছোট্ট এক বাংলাদেশে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশুদের খেলাধুলা, বড়দের আড্ডা, পারিবারিক গল্প, সুস্বাদু খাবার, বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, স্মৃতিচারণ এবং আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর ছিল পুরো পরিবেশ।
বিশেষভাবে চোখে পড়ে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ। আমেরিকায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোররা এই আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের শিকড়, আত্মীয়স্বজন এবং পারিবারিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। বড়রা তাঁদের শেখান—পরিবার কেবল বাবা-মা বা ভাইবোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; চাচা, ফুফু, মামা, খালা, চাচাতো-মামাতো-ফুফাতো-খালাতো ভাইবোন—সবাই মিলে একটি পরিবারের পূর্ণতা।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, একান্নবর্তী পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারস্পরিক সহযোগিতা, মানসিক নিরাপত্তা, মূল্যবোধের চর্চা এবং প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন। প্রবাসের বাস্তবতায় যেখানে সময়ের অভাব, কর্মব্যস্ততা এবং দূরত্ব আত্মীয়তার সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়, সেখানে এই পরিবারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
এটি শুধু একটি পিকনিকের গল্প নয়; এটি ভালোবাসার গল্প, শিকড়কে ধরে রাখার গল্প, পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প। দূরদেশে থেকেও যে বাংলাদেশি সংস্কৃতি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা সম্ভব, মাসুকুল ইসলাম খানের পরিবার তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এমন দৃশ্য সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়। শতাধিক স্বজন যখন একই ছায়াতলে মিলিত হয়ে হাসি, আনন্দ আর ভালোবাসা ভাগাভাগি করেন, তখন মনে হয়—দূরত্ব মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু আন্তরিকতা ও পারিবারিক বন্ধন কখনোই ভেঙে দিতে পারে না। আর সেই কারণেই এই পরিবার আজ শুধু একটি পরিবারের নাম নয়; প্রবাসে বাংলাদেশি ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও একান্নবর্তী পরিবারের জীবন্ত প্রতীক।
আশরাফুল ইসলাম আরিফ



