গল্প প্রবন্ধ সাহিত্য

‘গাছবাড়ি পরানসত্র’ দ্বিতীয় আড্ডা || আহমদ সায়েম

শেয়ার করুন:

শুধু টাকা বানানোর মেশিন হয়ে বেঁচে না থেকে, মাঝে মাঝে নিজের মুখোমুখি হওয়ারও চেষ্টা থাকে। সব সময় তা হয়ে ওঠে না; তবে কখনো কখনো আমরা পারি। সেই ‘কখনো’রই একটি দিন ছিল আজকের বিকেল।

সবাই সময়টাকে ধরতে পারে না। কেউ কেউ সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত শুধু অর্থ উপার্জনের কাজে ব্যয় করতে চায়—মনটাকে তেমন পাত্তা না দিয়েই এগিয়ে যায়। কিন্তু জীবন তো শুধু উপার্জনের হিসাব নয়; কখনো কখনো থামতে হয়, নিজের ভেতরের মানুষটির পাশে বসতে হয়। কিছু কবিতা, গান, স্মৃতি আর প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে নিজের সঙ্গে কথা বলতে হয়। আমরা অন্তত কয়েকজন মানুষ সেই উদ্দেশ্যে একত্র হতে পেরেছি—এটাও কি কম কিছু!

আজ ৮ আগস্ট ছিল আমাদের ‘গাছবাড়ি পরানসত্র’ আড্ডার দ্বিতীয় আয়োজন। এবারের বিকেলটি আমরা নিবেদন করেছিলাম বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শহীদ কাদরীর স্মৃতি, জীবন ও অনন্য কাব্যকর্মের প্রতি।

আড্ডার শুরুতেই কবি কাউসারী মালেক রোজী আপা শহীদ কাদরীকে ঘিরে তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি শোনান। কবির স্ত্রী নীরা কাদরীর সঙ্গে কাউসারী মালেক রোজী আপার বিশেষ যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্রে তিনি কবির বাসায় বহুবার গিয়েছেন, কিছু সাহিত্য আড্ডায় যুক্ত হতে পেরেছেন, সেইসবের কিছু স্মৃতি আপার মুখ থেকে শুনতে পারি। প্রবাসজীবনে কেমন আছেন—কেউ শহীদ কাদরীকে এমন প্রশ্ন করলে তিনি নাকি বলতেন, ‘দেশ ছেড়ে প্রবাসে আছি—সেটাই তো ভালো না থাকার সবচেয়ে বড় কারণ।’ এই একটি কথার মধ্যেই যেন ধরা পড়ে তাঁর দেশহীনতার বেদনা, স্বদেশের প্রতি গভীর টান এবং প্রবাসের দীর্ঘ বিষণ্নতা। তিনি এভাবেই নিজের কথা বলতে বলতে দেশের কথা স্মরণ করতেন; আবার দেশের কথা বলতে গিয়ে নিজের নির্বাসিত জীবনকেই সামনে নিয়ে আসতেন। প্রথম দিকে দেশে আসার ইচ্ছে থাকলেও নিজের ব্যস্ততা এবং দেশের রাজনৈতিক অবস্থার জন্য আসা হয়নি আর শেষ দিকে অসুস্থতার জন্য ফেরা হয়নি।

শহীদ কাদরীর জীবন, ব্যক্তিত্ব ও কবিতা নিয়ে কথা বলেন কবি বদরুজ্জামান আলমগীর এবং আলী সিদ্দিকী। তাঁরা কবিকে ঘিরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা, ঘটনা ও স্মৃতি তুলে ধরেন। কিন্তু মনে না থাকার রোগে পেয়ে বসলে যা হয় আর কী—অমূল্য কথাগুলোর অনেকটাই মন থেকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে; স্মৃতিতে রয়ে গেছে শুধু সেই ফাঁকিবাজিটুকুই।

শহীদ কাদরীকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি এত কম লিখেছেন কেন। উত্তরে বলেছিলেন, পুনরাবৃত্তির ভয়েই তিনি বেশি লেখেননি। একই কথা, একই অনুভব কিংবা নিজেরই কোনো পুরোনো উচ্চারণকে আবার নতুন নামে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তাঁর গভীর সতর্কতা ছিল। সম্ভবত সে কারণেই তাঁর কবিতার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও প্রতিটি কবিতা বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র উচ্চারণ ও নিজস্ব মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আলোচনায় কবির ব্যক্তিজীবনের কথাও উঠে আসে। তাঁর বহুল আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’। জীবনের শেষ পর্বে নীরা কাদরী ছিলেন কবির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় ও নিকটতম সঙ্গী। প্রবাসের নিঃসঙ্গতা, অসুস্থতা এবং কবির শেষ যাত্রা পর্যন্ত তিনি গভীর মমতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পাশে ছিলেন।

সত্যি বলতে, নীরা কাদরীর আন্তরিকতা, যত্ন ও নিরলস উদ্যোগের কারণেই প্রবাসের আড়ালে চলে যাওয়া কবি শহীদ কাদরীকে আমরা নতুন করে ফিরে পেয়েছি। কবি নিজে আর দেশে ফিরতে না পারলেও নীরা কাদরী তাঁকে দেশের মানুষ ও কাব্যপ্রেমীদের কাছে নানাভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন। কবির স্মৃতি, সৃষ্টিকর্ম এবং তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের অনেক মূল্যবান কথা তিনি যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করেছেন। একজন কবির পাশে থাকা শুধু তাঁর ব্যক্তিজীবনের সঙ্গী হওয়া নয়; কখনো কখনো তাঁর কবিতা, স্মৃতি ও উত্তরাধিকারেরও দায়িত্ব নেওয়া। নীরা কাদরী সেই দায়িত্ব ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। তাই শহীদ কাদরীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি নীরা কাদরীকেও আমরা গভীর কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

ঢাকার বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই কিংবদন্তিতুল্য সাহিত্যিক আড্ডার কথাও আলোচনায় আসে। সেখানে অনেক কবি-সাহিত্যিকের উপস্থিতি থাকলেও বিশেষভাবে উচ্চারিত হয় শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানের নাম। বাংলা কবিতার তিনটি পৃথক কণ্ঠ, তিনটি স্বতন্ত্র কাব্যভুবন—তবু একই সময়ের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাঁরা যেন পাশাপাশি জ্বলে থাকা তিনটি আলো।

আলোচনার পাশাপাশি ছিল স্বরচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তি ও গান। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন বদরুজ্জামান আলমগীর, আলী সিদ্দিকী এবং আমি। শহীদ কাদরীর কবিতা আবৃত্তি করেন জোহরা খাতুন কলি, দিলরুবা আফরোজ রুবা ও মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। রুমানা আলম শহীদ কাদরীর ‘বৃষ্টি’ কবিতাটি অসাধারণ আবৃত্তির মধ্য দিয়ে সেদিনের আয়োজনে এক বিশেষ আবহ তৈরি করেন। তাঁর কণ্ঠে কবিতাটির শব্দ, বেদনা ও ব্যঞ্জনা যেন নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেয়েছিল।

নার্গিস পারভীন আবৃত্তি করেন বদরুজ্জামান আলমগীর ভাইয়ের একটি কবিতা। শাহিদা আফরোজ একটি গানের কথামালা পাঠ করে শোনান। আব্দুল হাফিজ চৌধুরী ইমু আবৃত্তি করেন আহমদ সায়েম ও বদরুজ্জামান আলমগীরের একটি করে কবিতা। সুরভি আপা কণ্ঠে তুলে নেন একটি গান—যা কবিতা ও স্মৃতিময় বিকেলটিকে আরও সুরময় করে তোলে।

দর্শকসারিতে উপস্থিত ছিলেন ফারুক সলিমল্লাহ, মুন্নি তাফাদার এবং ডা. নাবিলা করিম। তাঁদের মনোযোগ, উপস্থিতি ও আন্তরিক অংশগ্রহণ আড্ডাটিকে আরও প্রাণবন্ত করেছে।

কবিতা, গান, স্মৃতি ও কথার ভেতর দিয়ে বিকেলটি ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে এগিয়ে গেছে। আমরা শহীদ কাদরীকে স্মরণ করেছি, কিন্তু সেই স্মরণের ভেতর দিয়ে হয়তো নিজেদেরও কিছুটা চিনেছি। কবির দেশহীনতার বেদনায় আমাদের প্রবাসজীবনের মুখ দেখেছি; তাঁর কবিতার নিঃসঙ্গতায় নিজেদের নীরবতার শব্দ শুনেছি। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্।

দিন শেষে মনে হয়েছে—অর্থ উপার্জনের প্রয়োজন অবশ্যই আছে, কিন্তু মানুষ কেবল উপার্জনের জন্য জন্মায় না। তার স্মৃতি লাগে, কবিতা লাগে, গান লাগে; লাগে এমন কিছু মানুষ, যাদের পাশে বসে অন্তত একটি বিকেলের জন্য হলেও নিজের মুখোমুখি হওয়া যায়।

‘গাছবাড়ি পরানসত্র’-র দ্বিতীয় দিনের এই আয়োজন আমাদের কাছে তেমনই একটি বিকেল হয়ে রইল।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *