সাহিত্য

বই-ভাষা-সংস্কৃতির বন্ধনে শেষ হলো পেনসিলভেনিয়া আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬

শেয়ার করুন:

• শেষ দিনে প্রকাশকদের আড্ডা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব
• বিশ্বজিৎ সাহার ৩৫ বছরের বইমেলার গল্প
• নতুন প্রজন্মের জন্য ঘরে ঘরে বুকশেলফের আহ্বান
• গান-নৃত্য ও রবীন্দ্রসংগীতে বর্ণিল সমাপ্তি

ফিলাডেলফিয়া প্রতিনিধি

তিন দিনের আয়োজন শেষে নতুন প্রজন্মের গান, নৃত্য ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হলো ‘পেনসিলভেনিয়া আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬’। শেষ দিন ৩০ আগস্ট বইয়ের স্টল ঘিরে পাঠকদের আনাগোনার পাশাপাশি প্রকাশক ও বইসংশ্লিষ্টদের আড্ডায় উঠে আসে প্রবাসে বাংলা বইয়ের দীর্ঘ সংগ্রাম, ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলা বই ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা।

দিনের শুরু থেকেই মেলার বিভিন্ন স্টলে ছিল দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। কেউ বই দেখেছেন, কেউ কিনেছেন পছন্দের বই, আবার কেউ লেখক ও প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

বই দেখা ও কেনাবেচার এই ব্যস্ততার মধ্যেই শুরু হয় প্রকাশক, বইয়ের স্টল পরিচালনাকারী ও দর্শকদের নিয়ে বিশেষ আড্ডা এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব।

৩৫ বছরের বইমেলার গল্প বললেন বিশ্বজিৎ সাহা
প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এই আড্ডায় অংশ নেন নিউইয়র্কের মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা, সময় প্রকাশনীর আবু রায়হান এবং আদিম বইঘরের কর্ণধার আহমদ সায়েম।

আলোচনায় উঠে আসে আমেরিকায় বাংলা বইমেলার গোড়ার কথা, প্রকাশনা ও বই বিপণনের বাস্তবতা, দীর্ঘদিন বইয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা এবং প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ভবিষ্যৎ।

বিশ্বজিৎ সাহা শোনান আমেরিকায় বাংলা বইমেলা নিয়ে তাঁর প্রায় ৩৫ বছরের পথচলার গল্প। কীভাবে এই দেশে বাংলা বইমেলার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বছরের পর বছর সেই আয়োজন ধরে রাখতে হয়েছে—তাঁর স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই ইতিহাস।

তাঁর কথায় অর্থনৈতিক প্রাপ্তির চেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বইয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার বিষয়টি। দীর্ঘ ৩৫ বছর একটি বইমেলাকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার শক্তি যে শুধু অর্থের হিসাব থেকে আসে না, তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রকাশভঙ্গিই যেন তা বলে দেয়।

বইয়ের সঙ্গে এমনভাবে থেকে যাওয়া সম্ভবত একধরনের প্রেমই। যে প্রেমে লাভ-ক্ষতির খাতা থাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিসাব মেলে না।

১০ হাজার ডলারের প্রস্তাবেও বই ছাড়েননি আবু রায়হান
সময় প্রকাশনীর আবু রায়হান তাঁর বক্তব্যে বইয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের একটি ব্যক্তিগত গল্প তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, একসময় তাঁর পরিবার থেকে বলা হয়েছিল—বই ও লেখালেখির জগৎ ছেড়ে আসতে পারলে তাঁকে ১০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু সেই প্রস্তাবও তাঁকে বই থেকে সরাতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত বইয়ের পিছু তিনি ছাড়তে পারেননি।

তাঁর এই স্মৃতিচারণে উঠে আসে বইয়ের সঙ্গে একজন মানুষের সম্পর্ক কখনো কখনো পেশা কিংবা ব্যবসার সীমা অতিক্রম করে কীভাবে জীবনযাপনের অংশ হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, জীবিকার চাপ কিংবা পারিবারিক প্রত্যাশার বাইরেও বইয়ের জন্য থেকে যায় আলাদা এক জায়গা।

‘বাচ্চারা বই পড়ে না—এ কথা বলে দায় শেষ করা যাবে না’
আদিম বইঘরের কর্ণধার আহমদ সায়েম তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার পরিবেশ তৈরি এবং প্রবাসে বাংলা ভাষাকে দৃশ্যমান রাখার ওপর।

তিনি বলেন, ‘বাচ্চারা বই পড়ে না’—এ কথা বলে দায় শেষ করে দেওয়া যাবে না।

তাঁর মতে, প্রতিটি ঘরে ছোট হলেও একটি বুকশেলফ থাকা প্রয়োজন। শিশুরা প্রতিদিন বই দেখতে দেখতে কোনো একদিন নিজের আগ্রহেই একটি বই হাতে তুলে নেবে।

তিনি বলেন, সেই শিশু বইটি পড়ুক, ছবি দেখুক—এমনকি বইয়ের একটি পাতা ছিঁড়ে যদি এরোপ্লেনও বানায়, তবু সেটি বইয়ের সঙ্গে তার পরিচয়ের শুরু হতে পারে। আগে তার চোখের সামনে বই থাকতে হবে। বইয়ের সঙ্গে পরিচয় না ঘটিয়ে তাকে বইপ্রেমী হওয়ার উপদেশ দেওয়ার মধ্যে খুব বেশি ফল নেই।

পরবর্তী প্রজন্মের হাতে বাংলা বই তুলে দেওয়ার আগে তাই পরিবারকেই বইয়ের জন্য একটি দৃশ্যমান জায়গা তৈরি করতে হবে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত বাংলায় একটি ‘ধন্যবাদ’ লিখুন
প্রবাসে বাংলা ভাষার দৃশ্যমানতা নিয়েও কথা বলেন আহমদ সায়েম।

তিনি বলেন, বাঙালিদের নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত বাংলায় একটি ‘ধন্যবাদ’ লিখে রাখা উচিত। বাইরে থেকে দেখেও যেন বোঝা যায়—এটি বাঙালিদের একটি প্রতিষ্ঠান।

এ প্রসঙ্গে তিনি চীনা জনগোষ্ঠীর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, তাঁদের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের ভাষা বড় ও দৃশ্যমান করে লেখা থাকে; প্রয়োজন অনুযায়ী ইংরেজি থাকে তুলনামূলক ছোট পরিসরে।

অথচ প্রবাসে বাঙালিদের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতিই থাকে না।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে—নিজের ভাষা ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধা শুধু মুখে প্রকাশ করার বিষয় নয়। সেই শ্রদ্ধা দৈনন্দিন জীবন ও কর্মের মধ্যেও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা পৌঁছে দিতে চাইলে প্রথমে নিজেদের কর্মেই তার প্রকাশ ঘটাতে হবে। কারণ শিশুরা শুধু আমাদের কথা শোনে না—আমাদের জীবনযাপনও দেখে।

প্রকাশক ও বইসংশ্লিষ্টদের এই আড্ডা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব পরিচালনা করেন পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়।

শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় প্রাণবন্ত শেষ দিন
প্রকাশক ও বইসংশ্লিষ্টদের আড্ডা এবং দর্শকদের প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে মেলার মঞ্চ চলে যায় নতুন প্রজন্মের দখলে।

শিশু-কিশোরদের গান ও নৃত্যের পরিবেশনায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে মেলার শেষ দিনের আয়োজন। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে বাংলা সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ মঞ্চে উঠে আসে।

তাদের এই অংশগ্রহণ যেন দিনের আগের আলোচনারই আরেকটি উত্তর—পরবর্তী প্রজন্ম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি তাদের সামনে আমরা কতটা সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

রবীন্দ্রসংগীতে বর্ণিল সমাপ্তি
শেষ দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুস্মিতা গুহ-রায়। তাঁদের পরিবেশনা দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।

এরপর রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে মঞ্চে আসেন একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী কাদেরী কিবরিয়া। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত মেলার সমাপনী আয়োজনকে দেয় ভিন্ন এক আবহ।

পরবর্তী সময়ে আবারও রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে মঞ্চে আসেন ছায়ানটে শিক্ষাপ্রাপ্ত সংগীতগুরু জাফর বিল্লাহ ও তাঁর দল।

তাঁদের সম্মিলিত ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশনার মধ্য দিয়েই তিন দিনের পেনসিলভেনিয়া আন্তর্জাতিক বইমেলার পর্দা নামে।

অতিথিদের উপস্থিতিতে মিলনমেলা
তিন দিনের এই আয়োজনে লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের উপস্থিতি ছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর জিয়াউদ্দিন আহমদ, বদরুজ্জামান আলমগীর, আলী সিদ্দিকী, শেখ খোরশান, ড. ফাতেমা আহমেদ, আশরাফুল ইসলাম আরিফ, আব্দুল হাফিজ চৌধুরী, জোহরা খাতুন কলি, জলি দাস, সিমু দে, রুমানা আপু, ঝুমা দাস, টুটুল দাস, রহিত, মাধব সাহা, তন্ময় চক্রবর্তী, সুব্রত চৌধুরী, রুমানা আলম, ফারুক সলিমল্লাহ, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ সহ আরও অনেকে।

তাঁদের উপস্থিতি এবং বই ও সংস্কৃতিকে ঘিরে পারস্পরিক আলাপচারিতা মেলাকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে যুক্ত মানুষের একটি মিলনমেলায় পরিণত করেছিল।

মেলা শেষ, থেকে গেল ভাষা ও বইয়ের কথা
তিন দিনের এই আয়োজন শেষ পর্যন্ত শুধু বই কেনাবেচার মেলা হয়ে থাকেনি। প্রকাশক, লেখক, পাঠক, সংস্কৃতিকর্মী, সংগীতশিল্পী এবং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণে এটি হয়ে উঠেছিল প্রবাসে বাংলা ভাষা, বই ও সংস্কৃতিকে ঘিরে একটি মিলনক্ষেত্র।

প্রবাসে একটি বাংলা বইমেলা কয়েক দিনের জন্য বসে। মেলা শেষে স্টল গুটিয়ে যায়, বই ফিরে যায় যার যার ঠিকানায়, মানুষেরাও ফিরে যান নিজেদের ব্যস্ত জীবনে।

কিন্তু একটি শিশু যদি মেলা থেকে ফিরে প্রথমবারের মতো ঘরের বুকশেলফ থেকে একটি বাংলা বই হাতে নেয়, কোনো তরুণ যদি নিজের ভাষার গান নতুন করে শুনতে শেখে, কিংবা কোনো ব্যবসায়ী যদি পরদিন তাঁর প্রতিষ্ঠানের দরজায় বাংলায় ছোট্ট করে একটি ‘ধন্যবাদ’ লিখে রাখেন—তবে মেলা আসলে সেখানেই শেষ হয় না।

কারণ ভাষা ও সংস্কৃতি উত্তরাধিকার হিসেবে শুধু বলে দিয়ে যাওয়া যায় না—তার জন্য ঘরে, কর্মে এবং জীবনে কিছু চিহ্ন রেখে যেতে হয়।

‘পেনসিলভেনিয়া আন্তর্জাতিক বইমেলা ২০২৬’ শেষ হলো সেই চিহ্নগুলো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আরও দৃশ্যমান করে তোলার প্রত্যাশা নিয়ে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *