সমাজ

হাওর সামিট ২০২৬ : হাওর রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

শেয়ার করুন:

হাওর শুধু বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকা বিস্তীর্ণ জনপদ নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি ও একটি স্বতন্ত্র প্রতিবেশব্যবস্থা। মাছ, পাখি, জলজ উদ্ভিদসহ বিপুল জীববৈচিত্র্যের আধার এই হাওরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে শুরু হয়েছে ‘হাওর সামিট ২০২৬’।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকেলে শীতলক্ষ্যার অস্ট্রিচ হারবার ঘাটে সামিটের উদ্বোধনী পর্ব ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘টেকসই হাওর ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও আমাদের করণীয়’।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও প্রতিবেশব্যবস্থায় অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট তৈরি করতে পারে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ হাওরাঞ্চলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই হাওর উন্নয়নের পরিকল্পনায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

বক্তারা হাওরের মাছ ও জলজ সম্পদ রক্ষা, পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং হাওরনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে হাওর উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা এবং হাওরের স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

হাওর জীবন, প্রতিবেশ, অভিযোজন ও সম্ভাবনা

সামিটের প্রথম দিনের সকালের প্রথম সেশনে ‘হাওর জীবন, প্রতিবেশ, অভিযোজন ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক উপস্থাপনা অনুষ্ঠিত হয়। এ পর্বে রিসোর্স পারসন হিসেবে উপস্থাপনা করেন হাওরবিষয়ক গবেষক, লেখক ও সংগঠক কাসমির রেজা। সেশন চেয়ার ছিলেন বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া এবং কো-চেয়ার ছিলেন নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শামস সুমন।

আলোচনায় হাওরের মানুষের জীবনযাপন, পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন, জীববৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সম্পদ, পর্যটন এবং হাওরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিভিন্ন দিক উঠে আসে। বক্তারা বলেন, হাওরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না।

 

পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনার তাগিদ

সেমিনারের দ্বিতীয় সেশনে ‘হাওরভিত্তিক পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়াটার অ্যান্ড রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের (ওয়ারপো) প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার হাসান শাহরিয়ার। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন শীতলক্ষ্যা বাঁচাও আন্দোলনের আহ্বায়ক হাফিজুল ইসলাম। সহসভাপতি ছিলেন নদী পরিব্রাজক দলের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট জাবেদ সারোয়ার।

সেমিনারে আলোচনায় অংশ নেন বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া, পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের প্রধান হিসাব সংরক্ষণ কর্মকর্তা আহামেদুল হক, হাওরাঞ্চলবাসীর প্রধান সমন্বয়ক ড. হালিম দাদ খান, তরু পল্লবের সাধারণ সম্পাদক মোকারম হোসেন, হাওরবিষয়ক লেখক ও গবেষক কাসমির রেজা, বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. নুরুজ্জামান সিপন, সাসটেইনেবল রিসার্চ অ্যান্ড কনসালটেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু জুবায়ের এবং হাওরবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ আশফাক জামান।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, হাওরের সংকট মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী, গবেষক, পরিবেশবাদী সংগঠন, নীতিনির্ধারক, জনপ্রতিনিধি ও অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। হাওর রক্ষায় আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট, বাস্তবভিত্তিক ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।

চার হাওর ও সাত জেলার ওপর দিয়ে নৌ-অভিযাত্রা

হাওর সামিট ২০২৬-এর অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে ঢাকা থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যন্ত নৌ-অভিযাত্রা। প্রায় ৬৫০ থেকে ৭৫০ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিয়ে চারটি হাওর ও সাতটি জেলার ওপর দিয়ে এই অভিযাত্রা পরিচালিত হচ্ছে।

অভিযাত্রায় হাওরের প্রকৃতি, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবন-জীবিকা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও তার সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন এবং হাওরের সম্ভাবনা নিয়ে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ, তথ্য সংগ্রহ ও মতবিনিময় করা হবে। এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে এনে হাওর ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সুপারিশ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন সামস, পরিবেশ ও নদী রক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এইচ. এম. সুমন, কম্প্যাক্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কাঞ্চন, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের লাইফ মেম্বার সাইফুল ইসলাম মুন্না এবং প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ অপু নজরুল।

আয়োজকরা জানান, হাওর সামিট ২০২৬-কে শুধু আলোচনা, সেমিনার বা মতবিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। সামিটে উঠে আসা সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি হাওরনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নে সামিটটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন তারা।

পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের হাওরগুলোকে কেবল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অঞ্চল হিসেবে দেখলে চলবে না; এগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, মাছের প্রজননক্ষেত্র, পাখির আবাসস্থল, জলজ উদ্ভিদ এবং স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যগত জীবনব্যবস্থা রক্ষা করেই হাওরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

তাদের মতে, সমন্বিত ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে তেমনি এর বিপুল অর্থনৈতিক, মৎস্য, কৃষি ও পর্যটন সম্ভাবনাকেও টেকসইভাবে কাজে লাগানো যাবে। হাওর রক্ষায় এখন প্রয়োজন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়—প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *