গল্প সাহিত্য

স্ক্রল করে দেখা ৪ || মাসুদার রহমান

শেয়ার করুন:


৪. রাজ্যপাট 


ঢাকঢুলকি আর ঝুমঝুমি বাঁশবন—শৈশবের নিজস্ব পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা দু’টি। পিছনবাড়ির নির্জনতা, গাছপালার সবুজ ছায়াচ্ছন্নতার ভেতরে ঢাকঢুলকির পারে আমার একা একা খেলার জগৎ। টানা দীর্ঘ এক প্রাচীর। ভাবতাম, ইচ্ছে করে আমার জন্য কেউ দুর্গ বানিয়ে রেখেছে। সেই নির্জনতার ভেতরে কবে কখন এক অশত্থ গজিয়ে উঠেছিল।  শতবর্ষী এক অশত্থবৃক্ষ। তার গা ঘেঁষে শ্যাওলা, শেকড়ে পিঁপড়ের সারি। গাছের শাখাপ্রশাখা জুড়ে শত শত বাদুড় উল্টো হয়ে ঝুলে থাকত সারাবছর জুড়েই। দিনের বেলায় ওরা ঘুমাতো। পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে ওদের ডানায় পড়ত। আর সন্ধ্যা নামলেই—হঠাৎ একটা বাদুড় নড়ে উঠত। তারপর আরেকটা। তারপর আকাশ কালো করে ওরা ছড়িয়ে যেত নানা দিকে। ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাওয়ার শব্দটা ছিল সরসর। যেন জাদুকর অশ্বত্থগাছ আকাশের গায়ে কালো কালি ছিটিয়ে দিলো। আমি ঢাকঢুলকির পাড়ে বসে দেখতাম। বাঁশবনের ভেতর থেকে আসত ঝুমঝুম শব্দ। বাতাস লাগলেই বাঁশে বাঁশে ঘষা।  মনে হতো বনটা নিজেই কথা বলছে।

একটি লম্বা আমগাছ। টাওয়ারের মতো উঠে গেছে আশপাশের সকল গাছের মাথা ছাড়িয়ে। ওটা ছিল সবচেয়ে উঁচু। দূর তাকালেও চোখ আগে ওই আমগাছেই আটকাত। খুব একটা আম হতো না গাছটায়। মৌসুমে অল্প কিছু আম ঝুলে থাকত একেবারে মগডালে। সেই অরণ্যের ভিতরে ঢুকে একেকদিন কাঁচা কিংবা পাকা আম পেয়ে যেতাম।  হয়তো কাকের ঠোকর খাওয়া, হয়তো বাতাসে নিজে থেকে ঝরে পড়া। সকালের কাঁচা রোদ নামত। আমার আনন্দ ছড়িয়ে যেত ঢাকঢুলকির পারের গাছপালার পাতায় পাতায়। পাতার ছায়া নড়ত, আর মনে হতো গাছগুলোও আমার সাথে হাসছে।

খেজুরগাছ ছিল একটা। রুক্ষ গা, মাথায় ঝাঁকড়া চুল। পাশে আরও বয়সী এক বেলগাছ। বেলগাছের গায়ে শ্যাওলা আর পুরনো দিনের গল্প। তাল-খেজুর কাছাকাছি দু’টো গাছের মাঝেই সেই ঢাকঢুলকির গাছ। নরম ডালপালা—বিরুৎ। দীর্ঘ পাতা। সারাবছরে একবার আশ্চর্য ফুল হতো। সাদা, গন্ধ নেই। কিন্তু ওই ফুলটা আমিই পেয়ে যেতাম। আর কেউ খেয়াল করত না। মনে হতো গাছটা শুধু আমাকেই দেখিয়েছে।

দীর্ঘ প্রাচীরের উপরে বিকেলের রোদ গায়ে মেখে সাপের অলস শোয়াও দেখেছি। রোদ পোহাচ্ছিল। নড়ছিল না। আমরা দূর থেকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখতাম। ভয়ও লাগত, আবার টানতও। মনে হতো প্রাচীরটা ওদেরও বাড়ি। বাঁশবনের ঝুমঝুমি, অশত্থের বাদুড়, মগডালের আম, আর প্রাচীরের উপরকার সাপ সব মিলিয়ে ওইটুকু জায়গা ছিল আমার নিজস্ব রাজ্য। কোনো রাজা ছিল না, কোনো নিয়ম ছিল না। শুধু রোদ ছিল, ছায়া ছিল, আর সময় ছিল থমকে থাকার মতো।

খেজুরগাছটার নিচে খেজুরবীজ ছড়িয়ে থাকত। কালো-খয়েরি, মসৃণ। আমি দুই হাতে কুড়াতাম। তারপর একটা একটা করে গুনতাম। এক…দুই…তিন…চারের পর গিয়ে আটকে যেতাম। সোজা ছয় বলে ফেলতাম।  নিজেই বুঝতাম ভুল হয়েছে। আবার নতুন করে শুরু করতাম। মনে পড়ে—সে-সময় আমাকে কেউ সংখ্যা শেখাচ্ছিলেন। লজিং টিচার ছিলেন। নামটা আবছা। সম্ভবত হামিদস্যার। খাতায় লাল কালি দিয়ে দাগ দিতেন। পরদিন আবার সেই খেজুরগাছের নিচে বসে বীজ কুড়িয়েছি। এবার আর ভুল হয়নি। এক দুই তিন চার পাঁচ ছয় সাত—ঠিকঠাক। বীজগুলো সারি করে রেখে নিজেই তালি দিয়েছি। মনে হয়েছিল বিশাল কিছু জয় করে ফেলেছি।

ওদিকে একটা প্রকাণ্ড বেলগাছ। তার গা বেয়ে শ্যাওলা, আর মাথায় থোকা থোকা বেল ঝুলত। বড় বড়, সবুজ। নাগালের বাইরে। আরেকটু দূরে—একটা বেঁটে তালগাছ। উঁচু না। বেঁটে, গোলগাল। মাথায় ঝাঁকড়া পাতা। সেই তালগাছের মাথায় রোজ একটা কাঁথা শুকোতে দেওয়া হতো। বাড়িতে আলম নামের এক কিশোর ছিল। কাজকর্ম করত। ওর জন্য বরাদ্দ একটা ছোট ঘর ছিল। প্রতি রাতে আলম বিছানায় হিসু করে দিত। সকালে উঠেই ওর কাজ ছিল—সেই ভেজা বিছানাপত্র পুকুরে নিয়ে গিয়ে চুবানো। ধোয়া শেষে ভেজা কাঁথা-চাদর কাঁধে করে এনে তুলে দিত বেঁটে তালগাছের মাথায়। সমস্ত দিনের রোদ লেগে লেগে কাঁথাটা আস্তে আস্তে শুকাত। বাতাসে দুলত। কখনো পাখি এসে বসত তার উপর। সন্ধ্যার আগে আলম আবার নামিয়ে আনত। গন্ধে রোদ আর সাবানের মিশেল।

আলম গল্প বলতো ভালো। নিখুঁত বর্ণনা। ওর সব গল্পের সব চরিত্রই রাজা-রাজ্য-রাজকুমার-রাজকন্যাদের।  রাজপুত্র তলোয়ার হাতে দৈত্য মারছে। রাজকন্যা সাততলা ঘরে জানালায় বসে কাঁদছে। সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে নীল রঙের ঘোড়া ছুটছে। আলম এমনভাবে বলত যেন সে নিজেই সেখানে ছিল। একবার শ্বাস না ফেলে। হা করে শুনতাম। কিন্তু সকাল হলেই চারপাশে ফিরে দেখতাম—খুব সাধারণ খেটে-খাওয়া লোকজন। মাথায় কাঠের বোঝা, গায়ে ঘাম, হাতে কোদাল। রাজপুত্র নেই রাজকন্যা নেই। সাততলা বাড়ি নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম, গল্পের মানুষগুলো গেল কোথায়? তারপর একদিন বুঝলাম। যখন মাঠে একপাল গরু নিয়ে আলম সকাল সকাল বেরিয়ে যেত। হাতে লাঠি, কাঁধে গামছা। পেছনে ধুলো উড়িয়ে গরুর সারি। সারাদিন ও উধাও। মাঠে, পুকুরপাড়ে, বিলের ধারে। রোদে পুড়ত। গরু হারালে খুঁজত। কাদায় পা ডুবত। আর সন্ধ্যার মুখে যখন বাড়ি ফিরত— গায়ে ধুলো, চোখ লাল, কিন্তু মুখে একটা আলো।  রাজ্য জয় করার আনন্দ। ‘আজ গরুগুলোকে নতুন ঘাসের জায়গা দেখাইছি’…‘ওই বিলে পানি আছে, কাল ওখানে নিয়ে যাব’ বলতে বলতে ওর চোখ চকচক করত। তখন তাকেই প্রকৃত রাজকুমার ভাবতে ভালো লাগত। রাজ্য মানে তো ওই মাঠ। প্রজা মানে তো ওই গরুগুলো। আর তলোয়ারের বদলে হাতে লাঠি। সাততলা ঘর নেই, কিন্তু মাথার উপর আকাশ আছে। রাজকন্যা নেই, কিন্তু সন্ধ্যার বাতাস আছে।

আমার শৈশবের ঢাকঢুলকির পারে তখন দুটো রাজ্য ছিল। একটা আলমের গল্পের। আরেকটা একান্তই আমার। আমি দুই রাজ্যের মাঝখানে বসে বীজ গুনতাম। টানা প্রাচীরটি উত্তর-দক্ষিণ হয়ে অনেক দূর গিয়ে হঠাৎ বাঁক নিয়েছে। ঠিক যেন একটা ক্লান্ত সাপ। চলতে চলতে দিক ভুল করে পূর্ব-পশ্চিমে মুখ ফিরিয়েছে। এই পূর্ব-পশ্চিম টানা প্রাচীরের গা ঘেঁষে একটা আতাগাছ। বড় গাছটি। লাবণ্যভরা সবুজ পাতা, আর ডালে ডালে ঝুলে-থাকা আতা। পাকলে সুবাস ছড়াত। দূর থেকেই দেখা যেত। নাগালের বাইরে, স্বপ্নের মতো। সেই গাছ পর্যন্ত যাবার সাহস হতো না। কারণ মাঝখানে ঝোপ-জঙ্গল। কাঁটাবন, লতাপাতা, আর অচেনা পোকার ডাক।

আমার সেখানে যাবার সাহসও ছিল না, অনুমতিও ছিল না। তাই এপাশ থেকেই ঘাড় উঁচু করে দেখতাম। একদিন দুপুরবেলা। প্রাচীর টপকিয়ে একটা ছেলে। বয়স ১৫/১৬ হবে। সোজা আতাগাছে উঠে গেল। ডাল বেয়ে, লাফিয়ে, যেন গাছটা ওর নিজের। আমি গাছপালার আড়াল থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। ভেতরবাড়ি থেকে কেউ চেঁচিয়ে উঠল—‘এই! আতা চুরি করছে!’ গলার শব্দে পাখি উড়ে গেল।  কিন্তু প্রাচীর টপকিয়ে গাছে ঝুলে আতা পাড়তে আসা ছেলেটির কোনো হেলদোল নেই। সে দিব্যি ডাল ধরে দুলছে। ইচ্ছেমতো আতা ছিঁড়ছে। কচি, কাঁচা, পাকা—যা পাচ্ছে কোঁচড়ে ভরছে। কোঁচড় ফুলে ঢোল। তারপর এক লাফ। ধুপ করে প্রাচীরের ওপাশে। আমি তখনো দাঁড়িয়ে—মুখে বিস্ময়। আমার সেই মুহূর্তে মনে হলো—এই ছেলেটি যেন আলমের রূপকথার গল্পেরই এক চরিত্র। যে নিষেধ মানে না। যে ঝোপ-জঙ্গল-চিৎকার-ভয় সব তুড়ি মেরে ওড়ায়। যে অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলতে পারে। আলম গল্পে বলত রাজপুত্র দেয়াল টপকায়। আর বাস্তবে আমি দেখলাম—একটা সাধারণ ছেলে প্রাচীর টপকে আতা পেড়ে নিয়ে চম্পট। দুটোই আমার কাছে সমান আশ্চর্য লেগেছিল। সেদিনের পর থেকে আতাগাছটাকে আর শুধু গাছ মনে হতো না। ওটা ছিল একটা নিষিদ্ধ রাজ্য। আর ওই ছেলেটা ছিল সেই রাজ্যের ডাকাত রাজপুত্র।

বাড়ির পিছনে ঢাকঢুলকির পার—অতি শৈশবে ওটাই ছিল আমার পৃথিবী। প্রাচীর ঘেরা ওইটুকু পরিসরের মধ্যে আমার একার চলাচল। কারো অনুমতি লাগত না। কারো নিষেধ মানতে হতো না। সকালে রোদ পড়ত প্রাচীরের গায়ে। বিকেলে ছায়া নামত অশত্থের তলা দিয়ে। সেখানেই আমার দুর্গ, আমার মাঠ, আমার রাজ্য। বছরের একদিন হঠাৎ ঢাকঢুলকির  সেই আশ্চর্য ফুলটি পেয়ে যেতাম। ঢাকঢুলকির নরম শরীরে, লম্বা পাতার আড়ালে—সাদা, নিঃশব্দ। কেউ জানত না। শুধু আমি জানতাম। হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো গাছটা আজ শুধু আমাকেই ডেকেছে। তারপর ফুলটা পাতার ভাঁজে রেখে দিতাম। যেন পরের বছরের জন্য গচ্ছিত রাখা।

সেই ঢাকঢুলকির রাজ্য থেকে কবেই রাজ্যচ্যুত হয়েছি। জানি—আর কখনো আমার সেই পৃথিবী ফিরে পাবো না। আর কখনো সেই রাজ্যপাটও পাবো না। না সেই শতবর্ষী অশত্থ, না বেঁটে তালগাছের মাথার কাঁথা, না আলমের গল্প, না আতাগাছের নিষিদ্ধ আতা। তবু মাঝে মাঝে আকাশে মেঘ দেখলে বুকের ভেতর ঢাকঢুলকির বাতাস বয়। ঝুমঝুমি শব্দ কানে আসে। আর বছরের একদিন, কেউ একজন— ঠিক আমার মতোই—সেই আশ্চর্য ফুলটি খুঁজে পাবে।

স্ক্রল করে দেখা ধারাবাহিক


মাসুদার রহমানকবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *