সম্পর্কটারে দেয়ালে দেয়ালে আড়াল করে দেওয়ার
কোনো মানে হয়?
দুইটা সম্পর্কের মিলনেই আমাদের আসা—
একজনের রক্ত, আরেকজনের অপেক্ষা
একজনের শরীর, আরেকজনের স্বপ্ন
মিলেমিশে আমাদের এই পৃথিবীর আলো-বাতাস…
আর শেষ বিদায়ে—
কয়েকজন মানুষের হাতেই তুলে দেওয়া হবে
কেউ কাঁধ দেবে, কেউবা মাটি দেবে
কেউ চোখ মুছতে মুছতে বলবে—
মানুষটারে যেভাবে দেখা যায়, সে আসলে অন্য আলো!
কিছু বলার, বা না বলারও কোনো ইখতিয়ার
থাকবে না তখন।
কোনো অভিমান, কোনো যুক্তি
কোনো পক্ষ কিংবা বিপক্ষ—
কিচ্ছু সঙ্গে যাবে না; কিচ্ছুটি না।
তাহলে—এই সামান্য জীবনে
সম্পর্কটারে
দেয়ালে দেয়ালে আড়াল করে দেওয়া—
কী মানে হয়! বা, কোন মূল্যে এই আড়ালের দেয়াল?
কত শত মানুষ প্রতিদিন; উড়ে উড়ে ঘরে ফেরে
উড়ে বেড়ায় চোখের মলাটে—
একবারও সামান্য কথা বলা হয় না
কেউ কারও দরজায় দাঁড়িয়ে বলে না—
কেমন আছো? এখনো কি রাত জাগো?
এখনো শব্দে শব্দে আঁকতে পারো
আমার ঠোঁট, আমার গ্রীবা?
এখনো কি চায়ের কাপে
অর্ধেক পৃথিবী ডুবিয়ে রাখো?
ভয়ের সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে এখনো কি বই পড়া হয়?
বাথরুমের দরজা আটকে বই পড়ার সেই দিনগুলো!
আহ্!
সম্পর্কটারে দেয়ালে দেয়ালে আড়াল করে দেওয়ার
কোনো মানে হয়?
বা, কোন মূল্যে এই আড়ালের দেয়াল?
কোন মূল্যে এই আড়ালের দেয়াল?
অথচ যার সঙ্গে একদিন
চা আর সিগারেটের ধোঁয়া ছিল
একে অন্যের মুখে মুখে—
যেন ঠোঁটে ঠোঁট রাখা কোনো গোপন বন্ধুত্ব
যেন ধোঁয়ার ভেতর দিয়েই
আমরা চিনে নিতাম পরস্পরের মুখ।
একটি সিগারেট শেষ হওয়ার আগেই
কতবার বদলে ফেলেছি পৃথিবীর মানচিত্র
কত সরকার নামিয়েছি
কত সমাজ গড়েছি,
মুখে মুখে কত সমাজ পুড়িয়ে দিয়েছি
কত কবিতার ভুল শুধরে দিয়েছি—
নিজেদের ভুলগুলো ছাড়া।
আড্ডা ছিল রাতদুপুর থেকে সন্ধ্যাতারা
সন্ধ্যা থেকে ভোরের আজান
একটি টেবিল—অথচ সেই টেবিলের চারপাশে
চায়ের কাপের চেয়ে মানুষ ছিল বেশি!
আর মানুষের চেয়ে স্বপ্ন ছিল বিশাল।
সেই মানুষের সঙ্গেই আজ—কেবল দেয়াল তুলে রাখব?
কোন মূল্যে এই আড়ালের দেয়াল?
একটি মতের অমিল
কী করে এত দিনের হাসির চেয়ে বড় হয়?
একটি ভুল বাক্য
কী করে হাজারটি আন্তরিক কথাকে মুছে দেয়?
একদিনের রাগ—কী করে বহু বছরের পথচলার
একমাত্র পরিচয় হয়ে যায়?
সম্পর্ক, সময়—সব কি এতটাই ছোট হয়ে গেছে
যে, একটি শব্দের ভেতর ঢুকে
সম্পূর্ণ মানুষটাকে আর দেখতে পাই না আমরা?
মত আলাদা হতেই পারে, পথ আলাদাই তো হবে
একই আকাশের নিচে থেকেও
সব পাখি তো একই দিকে ওড়ে না! উড়বে না কখনোই।
তাই বলে কি আকাশ ভাগ হয়ে যায়?
তাই বলে কি বাতাস বলে—
তুমি আমার বিপক্ষ মত, নষ্টশক্তি!
তোমার জন্য আমার কোনো মনপুরা নেই?
সম্পর্কের সেইসব দিনগুলো মনে রেখে
আজকের দিনটাকে অন্তত শ্রদ্ধা করি।
যে হাত একদিন কাঁধে ছিল
আজ সে হাত দূরে থাকলেও
তার উষ্ণতাকে অস্বীকার না করি।
সম্পর্ক মানে সব কথায় সম্মতি নয়।
সম্পর্ক মানে—
অসম্মতির মধ্যেও একটি চেয়ার খালি রাখা
ফিরে এলে বসতে দেওয়া
কথা বললে শুনতে পারা।
সম্পর্ক মানে দরজা বন্ধ করার আগে
আরেকবার পেছন ফিরে দেখা—
মানুষটা সত্যিই চলে যাচ্ছে
নাকি একটু ডাকের অপেক্ষায়
এখনো দাঁড়িয়ে আছে…
এসো, দেয়ালগুলো তুলে দিই।
সম্পর্ক, সময়—সব কি এতটাই ছোট হয়ে গেছে
যে, একটি শব্দের ভেতর ঢুকে
সম্পূর্ণ মানুষটাকেই আর দেখতে পাই না আমরা?
আমরা বরং দেয়ালে লিখে রাখি—
মতামত মুক্ত মনে প্রকাশ করুন
ভিন্নমত থাকতেই পারে
তবু সবার অধিকার গুরুত্ব পাক।
লিখে রাখি—
এখানে প্রশ্ন করা অপরাধ নয়
এখানে দ্বিমত শত্রুতা নয়
এখানে রাগের পরেও ফিরে আসা যায়
এখানে বন্ধুর জন্য
একটি চেয়ার সব সময় খালি থাকে।
এসো, আবারও এক টেবিলে বসি
তুমি তোমার সত্য বলো
আমি আমার ভুল কথাগুলো
এলোমেলো বাক্যে উচ্চারণ করি।
তর্ক হোক, কণ্ঠ উঁচু হোক
চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে যাক—
তবু সম্পর্কটারে ঠান্ডা হতে না দিই।
আবারও সিগারেটের ধোঁয়া উড়াই—
যদি ধূমপান ছেড়ে দিয়ে থাকো
তবে চায়ের বাষ্পই উড়ুক
কিন্তু মাঝখানে
আর কোনো দেয়াল না থাকুক।
কারণ, শেষ পর্যন্ত
আমরা কেউই দেয়াল নই—
আমরা দরজা, আমরা জানালা
আমরা আগামীর প্রজন্মের আলো
আমরাই একে অন্যের কাছে পৌঁছানোর
অসমাপ্ত রাস্তা।
একদিন আমাদের সবাইকেই যেতে হবে।
কারও হাতে থাকবে মাটি
কারও চোখে জল
কারও স্মৃতিতে থেকে যাবে
একটি টেবিল, কয়েকটি চেয়ার
আর বহুদিন আগে থেমে যাওয়া কোনো আড্ডা।
সেদিন যেন কেউ আফসোস করে না বলে—
দেয়ালটা তুলে দিলে
মানুষটাকে আরেকবার দেখা যেত
একবার ডেকে বললে
হয়তো সে ফিরে আসত।
তাই সময় থাকতে—দেয়ালগুলো তুলে দিই।
এসো, আবার কথা বলি
আবার তর্ক করি; আবার রাগ করি
আবার ফিরে আসি।
আর একটি টেবিল ঘিরে বসে
চা, সিঙ্গাড়া কিংবা সিগারেটের ধোঁয়ার ভেতর
মানুষগুলোর মুখ আবারও মানুষের মতো দেখি।
তুলে দিই সম্পর্কের সব দেয়াল।
আর ফের প্রাণ ফিরে পাক
বহুদিন আগে থেমে যাওয়া আড্ডা।
৩০ জুলাই ২০২৬
আহমদ সায়েম প্রণীত অন্যান্য রচনা
কবি ও গদ্যকার



