গল্প সাহিত্য

যেমন যৌবনের ঢেউ || শেখ লুৎফর

শেয়ার করুন:

পাঁচ ভাইয়ের পরে দুনিয়াতে আমার আসা একটা বিশেষ ঘটনা ছিল। তাই বাপ-মা খুশিতে নাম রাখছিল চম্পা। দাদা-দাদি, চাচা-চাচি, অনেকগুলা ভাই-বোন…মস্তবড়ো সংসার—বাগানে আমি হইলাম চম্পা ফুল। চৌদিকে কত গান, কত ধান! নতুন ধানের গন্ধে খুশি ছড়ায়। আত্মীয়রা ঘনঘন আসা-যাওয়া করে। সন্ধ্যার পরে পরেই হিন্দুপাড়ার দিক থেকে ভেসে আসে কীর্তনের সুর। রাইত একটু গভীর হইলে আছিম শাহ’র মাজারের দিকে শোনা যায় দোতারার সুরের সাথে বাউল গানের মরমী কথা। ভাবের আভাসে মন কান্দে যেমন বাতাসের মুখে কলমি শাকের ডগা। ভরা হাওরের ঢেউগুলা হাঁপায়; হাওয়ায় ইনাইবিনাই বিলাপ। আর যদি সব আপদ কাটায়া হাওরবাসী বোরোধান গোলায় তুলতে পারে, সেই বছর বিয়েশাদির ধুম পড়ে যায়। বাতাসে মাছ-মাংসের সুঘ্রাণের সাথে ধামাইল গানের সুর…। তখন দুনিয়াডা যে কী সুন্দর লাগত!

ভাই রে ভাই, এইরকম সংসারে আমি এক চম্পাবতী। কালা মাটি আর কালা কালা মানুষের দেশে আমিও কাজলবরন। বারিষা মাসে কালা মেঘ যখন আসমান ছায়া ফেলে তখন হাওরের পানিও কালা। এমনি কালে আমার দুই চোখে হরিণীর আমোদ; ভয়, সন্দেহ। অঙ্গে অঙ্গে হাওরের রাণীমাছের তেলতেলা গড়ন। যারে কয় ভাটির দেশের রূপকুমারী। তোমরা হাসবা না ভাই; আমি এক অভাগীর বেটি গো!

যারে কয় চৌত্রমাসের খা খা দিন। মাইলের পর মাইল ঢনঢনা শুকনা। হাওর জ্বলছে। পানির অভাবে সবুজ ধানের পেটে পুড়ছে অবুঝ শীষ! হাওরবাসীর মুখের দিকে তাকানো যায় না। কুড়াখালী গাঙ শুকায়া ফাটা বাঙ্গি। আমার কপালের ঘাম বায়া থুতনিতে আসে। হঠাৎ হঠাৎ গরম বাতাস বয়। দুপুর গড়ায়া ভাটি লয়। কাদা-পানিতে মাখামাখি শিশুরা মরা গাঙ থাইকা ফেরে; প্লাস্টিকের বদনা-বাটিভরা গোতুম-বাইন-ইচামাছ। বেশ করি তেল আর কাঁচা মরিচের জ্বাল দেয়া রান্না করছি। ভাই গো, কারে খাওয়াইতাম স্বাদের ছালুন? আমার দাদি কইত :

ঘরের শোভা খাট-পালঙ্ক,
নারীর শোভা পুরুষ

ভাই গো ভাই, এইবার চম্পাবতীর হৃদয়খান এট্টু ভাইবা লও।

যখন রাইত গভীর হয়, আসমান কান্দে জমিনের দিকে চাইয়া, জমিন কান্দে আসমানের লাগি। সাপ-ব্যাঙ-ঝিঁঝি, বাতাসের শনশন…সব রোদন এক হইয়া কী যেন কয়! মনে কয়, দুনিয়ার গর্ভ থাইকা কালের কামনায় কেন্দে উঠছে হাওর। শোঁ শোঁ, পনপন…বিলাপের ভাষা যে কত রকম হয়! কামনাকাতর ঢেউগুলা আমার ঘরের পিছে সারারাইত আছড়ে পড়বে। বিবি হাওয়ারে হারায়া যেমন কইরা কেন্দেছিলেন আদি পিতা আদম তেমনি তাদের ভাষা।

মাঝিবাড়ির যুবতী বউ আমি। স্বামী গেছে আরব দেশে। আমার গতর ভরতি হাওরের রঙ্গ-লিপ্সা। রাইত গভীর হয়। পৃথিবী হয় ঠাণ্ডা। একলা একলা বিছানায় ছটফট করি, অঙ্গার হই। আসমান চৌচির হয় বিজলির চমকে, দুনিয়া বিদীর্ণ কইরা বাজ পড়ে মানিককোনা গ্রামের দিকে। কিন্তু বৃষ্টি আসে না। কুঁচের ঘা-খাওয়া মাছের মতন গতরটা আমার মোচড়ায়। খোলা জানালা দেয়া শাঁ শাঁ কইরা আসে গরম বাতাস। পাশের ঘরের দেবর ঘাটের সোলার প্যানেলের তলায় একলা একলা খাাড়ায়া থাকে। আমারে দেহায়া দেহায়া কন্ডম ফোলায়। উত্থিত পুরুষাঙ্গের মতন আকৃতি বানায় আর খেলন ফকিরের গান গায় :

প্রাণবন্ধু দেশে নাই গো,
সখি, রহিল কোথায়।
অভাগী বন্ধু ছাড়া,
বাঁচা বিষম দায়…

আমি গুম হইয়া ভাবি, তৃপ্তির জীবন না যৌবনের সর্বনাশা সুখ? ভয়ে কাঁপি, দ্বন্দ্ব-হতাশায় নেশাখোরের মতন বিছানায় পৈড়া থাকি।

হাওরের দেশে যখন নিঝুম হইয়া দুপুর নামে, সোনার বরন রইদ ঢেউয়ে ঢেউয়ে হাসে কিংবা শুকনা হাওরের সবুজে গাড়াগড়ি দেয়। চিল-কাউয়া-কানিবক…পানিখাউরির (পানকৌড়ি) চকচকে কালা শরীর বাতাসে ঝলক মারে। হেই…আসামপুরার দিক থাইকা ছুইটা আসে গরম বাতাস। জলীয় বাষ্পের ঘোরে হাওরের বুক খোয়া খোয়া কুয়াশায় ঠাসা। ছলিমপুর, কুতুবনগর…ছায়া ছায়া কালো। চক্ষু অপলক হয়…এট্টু এট্টু গ্রাম। গোপন কষ্টের মতন ধিকিধিকি জ্বলে। কীরহম যেন অস্ফুট কান্দনের লাহান লাগে! বুক ফাইটা যাইতে চায়। দূর থাইকা ভাইসা আসে বিরহী কুড়াপক্ষীর কুল্লুম কুল্লুম সুর! পাজিটা অসীম শূন্যে হাহাকার ছড়ায়।

বৈকালে হাওরের দুনিয়া লালে-নীলে একাকার হয়। তখনো সতর্ক চিলগুলা হিজল-জারুল-বরুণ গাছের ডালে বসে তীক্ষ্ণ চোখে ধান্দা করবে। একটা-দুইটা পাখি উড়তে শুরু করবে আকাশে। মরা সুরুজের লাল, আসমানের নীল মিলেমিশে আচানক আলাপ! হাওরের বুকেও রোদন ওঠে, বাতাস কান্দে কত না সুরে! যুবতী কৈন্যার দীর্ঘশ্বাসে ঝলসানো আকাশ ধীরে ধীরে গোলাপি রঙ ধরবে। হে-ই…আসামপুরার দিকে এট্টু এট্টু রাত নামবে। এইবার ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়বে। সবাই ফিরতে চায় আপন ঠিকানায়।

ঘাটের সামনে দেয়া হাওরের জেলেরা ডিঙ্গি বায়া যায়। নাওয়ের পাটাতনে স্তূপ স্তূপ জাল, চোখে শিকারের ফন্দি। যুবক জেলের চকচকে কালা শরীর বায়া তেল পড়ে। হে আমারে কুড়াশিকারীর মতন চায়া চায়া দেখে আর গান গায় :

পাড়াগাঁয়ে বসত করি,
সামনে ভরা নদী।
সঙ্গে যাইতাম ও মাঝিভাই,
ঘাটে নাও ভিড়াইতায় যদি।
উড়াইয়া যাও রঙ্গের বাদাম,
মনে লয় সঙ্গে যাইতাম, যেথায় গুণনিধি।

২৬ জুলাই ২০২১

শেয়ার করুন:

1 Comment

  1. মাসুদার রহমান

    September 7, 2026

    চরাচরে হাওরের বিস্তার, তার পাড়ে ও জলে ক্রিয়া করা সব চরিত্র- খুব জীবন্ত এবং চলচ্চিত্রময়। ভালো লাগলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *