গল্প সাহিত্য

স্ক্রল করে দেখা ৭ || মাসুদার রহমান

শেয়ার করুন:

৭. লাল স্কুলবাড়ি


আমার কৈশোরের স্কুলের কথা মনে করলে সমীর রায়চৌধুরীর কবিতাবইয়ের নামটিই মনে পড়ে—লাল স্কুলবাড়ি। ইটের গায়ে রোদের তাপ জমে থাকা লাল। বর্ষার জলে ধোয়া লাল। সময়ের হাতে ঘষা খেয়ে টকটকে হয়ে থাকা লাল। স্কুলবাড়ির সামনে সারি সারি নারিকেল গাছ। যেন পাহারাদার। মাথায় সবুজ পাগড়ি বেঁধে ওরা দাঁড়িয়ে থাকত সারাদিন। বাতাস এলে পাতায় পাতায় কথা বলতো—‘এই তো ছেলেরা আসছে, এই তো ছুটি হলো।’ নারিকেল গাছের সামনে বেঁটে একটা প্রাচীর। হাঁটু সমান। কিন্তু ওটাই ছিল আমাদের সীমারেখা। ওপারে স্কুল। এপারে বাকি পৃথিবী। আমরা প্রাচীর ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকতাম, আর মনে হতো লালরঙের রাজ্যে ঢুকছি।

প্রাচীরের পরেই বিশাল বিখ্যাত সেই স্কুলমাঠ। বলাহার স্কুলমাঠ। ফুটবল, ক্রিকেট, হাডুডু সব এই মাঠে। দুপুরে রোদে পুড়তো। বিকেলে ছায়া নরম হতো। বর্ষায় কাদা হয়ে যেত। তবু মাঠ কখনো না বলতো না।

মাঠের পশ্চিম প্রান্তে আমাদের ঘর—হোস্টেল। আধাপাকা। নিচে ইট, উপরে টিনের ছাউনি। বৃষ্টি নামলে টিনের উপর রিমঝিম শব্দ। রাতের ঘুম বাড়িয়ে দিত । আমরা বলতাম, বৃষ্টি পিয়ানো বাজচ্ছে। শীতকালে উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত শীতে হোস্টল ঘরের দেওয়াল টিন সব ঠান্ডা হয়ে যেত। লেপ মুড়ি দিয়েও হাড় কাঁপতো। গরমে উল্টো, মাথার উপর দিয়ে যেন সূর্য হেঁটে যেত। খুব সাদামাটা দিন ছিল। কিন্তু মাথার উপর একটা ছাদ ছিল। আর সামনে একটা মাঠ ছিল। এই দুইটাই আমাদের রাজত্ব।

মাঠের দক্ষিণে কোল ঘেঁষে বয়ে যেত একটা প্রশস্ত নালা। আমরা বলতাম নয়নজুলি। দেখতে পরিখার মতো। গভীর। পাড় ভাঙা। লালরঙা স্কুলের সামনে প্রশস্ত মাঠ, তারপর জলবেষ্ঠনি। এই নয়নজুলি সাধারণ নালা ছিল না। পশ্চিমে ১০/১২ মাইল জুড়ে ধূ ধূ ধানের মাঠ। আষাঢ়শ্রাবণে সেই মাঠ জলে থইথই। সব জল এসে নামতো এই নয়নজুলিতে। তারপর ১৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে করতোয়ার বুকে গিয়ে মিশছে। ভাবতাম, নয়নজুলিরও কষ্ট আছে। সারাদিন এত জল বয়ে নিয়ে যায়, তবু নিজে তৃষ্ণার্ত থাকে। নয়নজুলির শরীর ঘেঁষেই একটা মেঠো রাস্তা। মেঠো, কিন্তু রাজপথের মতো প্রশস্ত। আর সোজা। এত সোজা যে মনে হতো জ্যামিতি বই থেকে সরলরেখাটা কেউ তুলে এনে এখানে ফেলে দিয়েছে। আর সেই রাস্তার দুই পাশে মাইল মাইল ধরে জামগাছের সারি। শতবর্ষী। কোনো কোনো গাছের গুঁড়ি তিন জনেও জড়িয়ে ধরা যেত না। পাতা এত ঘন যে দিনের বেলাতেও নিচে সন্ধ্যার ছায়া খেলা করতো। রোদ ফুটো হয়ে মাটিতে আল্পনা আঁকতো। মানুষ হেঁটে যেতো সেই ছায়া দিয়ে। আর আমি খুব অবাক হয়ে ভাবতাম—ত্রিশ/চল্লিশ মাইল জুড়ে এই জামগাছের সারি কে লাগিয়েছিল? কোন রাজা? কোন জমিদার? নাকি কোনো অজানা মানুষ, যে নিজে ফল খেতে নয়, ভেবেছিল একশবছর পরেও মানুষ ছায়া পাবে, ফল খাবে।

লাল স্কুলবাড়ি, নারিকেল, প্রাচীর, মাঠ, টিনের হোস্টেল, নয়নজুলি, আর জামগাছের সরলরেখা—এই ছিল আমার স্কুলবেলা। এই ছিল আমার কৈশোরের একচিলতে পৃথিবী। উত্তরের জেলা দিনাজপুর। সে-সময়েও কিছু নামি স্কুল ছিল,  কিন্তু শহরের কোলাহল থেকে অনেক অনেক দূরে, প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল একটা নাম—বলাহার উচ্চ বিদ্যালয়। পড়াশোনা। রেজাল্ট। কড়া নিয়মের বেড়াজাল, কারণে—শিক্ষার্থীর ভিড় ছিল এখানে। সাইকেল ঠেলে, জামগাছের ছায়া মাড়িয়ে ছেলেমেয়েরা আসতো। দিন ফুরাতো। ক্লাস শেষ হতো। খেলাধুলা শেষে সন্ধ্যা নামতো। আমরা যারা হোস্টেলে ছিলাম দেখতাম, সন্ধ্যা নামলেই ইলেকট্রিক আলো হার মেনে যেত। দুই-তিনটে বাল্ব টিমটিম করতো। তার আলো প্রাচীরের গোড়া পর্যন্তও যেত না। বাকি সব অন্ধকার। ঘন, ভারী, পাহারাদারের মতো অন্ধকার।

পশ্চিমে অনন্ত ধানমাঠ। দশ/বারো মাইল জুড়ে শুধু ধান আর ধান। সন্ধ্যা হলেই সেই মাঠের উপর দিয়ে বাতাস আসতো হু হু করে। বাতাস না, যেন একটা দীর্ঘশ্বাস। মাঠের, মানুষের, সময়ের। সেই বাতাস প্রাচীর টপকে, মাঠ পেরিয়ে, হোস্টেল ঘরের গরাদ ঠেলে ঢুকে যেত। এমন সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে মন টিকতো না। বই খুলে বসতাম। কিন্তু অক্ষরগুলো নড়তো। ইলেকট্রিক আলোর হলুদ বৃত্তের সীমানা ছেড়ে আমি প্রায়ই উঠে যেতাম। পা টিপে টিপে বেরিয়ে যেতাম হোস্টেল থেকে। সোজা মাঠের অন্ধকারে।  কেউ বকতো না। স্যাররাও হয়তো মানতেন—এই বয়সে অন্ধকারও পড়ার বিষয়।

মাঠে দাঁড়ালেই অনন্ত ধানমাঠের বাতাস এসে আমার চুলে বিলি কেটে দিতো। ঠান্ডা, ভেজা, ধানের গন্ধঅলা বাতাস। গায়ের জামাটা পিঠের কাছে বেলুনের মতো ফুলে উঠতো। মনে হতো, যে কোনো সময় আমি উড়ে যাবো। হ্যাঁ, উড়েই যেতাম। অন্ধকার অসীমে। ধানমাঠের বাতাসে ভেসে। নিচে লাল স্কুলবাড়ি ছোট হয়ে আসতো। টিনের চাল ছোট হয়ে আসতো। আর আমি? আমি বড় হয়ে যেতাম। স্বপ্নের মতো বড়।

স্কুলমাঠ পেরিয়ে রাস্তায় ওঠার মুখে ছিল একটা ছোট্ট কালভার্ট। একদম ছোট। দুই পা ফেললেই পার হওয়া যায়। কিন্তু ওটার নিচ দিয়ে বয়ে যেত সেই নয়নজুলি। যে-জল পশ্চিমের ধানমাঠ থেকে আসে, ১৪ কিলোমিটার স্রোত পেরিয়ে করতোয়ায় গিয়ে পড়ে। আমি কালভার্টের উপর দাঁড়াতাম। নিচে তাকাতাম। কালো জল। তাতে আমার ছায়া। চুল উড়ছে। জামা ফুলছে। চোখে অনন্ত। আর আমার ভাবতে ভালো লাগতো—এই যে আমার ছায়া, এই জলের সাথে সেই ছায়াও ভেসে যাচ্ছে। প্রথমে নয়নজুলি, তারপর খাড়ি ধরে ১৪ মাইল দূরের করতোয়া নদী। করতোয়া থেকে হয়তো বড় নদী। বড় নদী থেকে সাগর। আমার ছায়া সাগরে যাচ্ছে। আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি।  একটা ছেলে, একটা কালভার্ট, একটা ছায়া, আর অনন্ত বাতাস।

কোনো কোনো রাতে ঘুম আসত না। টিনের চালে বৃষ্টি না থাকলেও, বুকের ভেতর বৃষ্টি হতো। মনে হতো, আমি যদি লিখতে পারতাম, তাহলে এই বাতাস, এই অন্ধকার, এই ছায়ার যাত্রা—সব লিখে ফেলতাম। খাতা খুলে কখনো এলোমেলো চেষ্টা করতাম। পারতাম না। কারণ তখনও কলম ধরতে শিখিনি (এখনও শধু চেষ্টা করে যাই)। শুধু চোখ দিয়ে গিলতাম। আমার লাল স্কুলবাড়ি শুধু পড়া শেখায়নি। আমাকে শিখিয়েছিল—অন্ধকারেও দাঁড়ানো যায়। বাতাসেও উড়া যায়। আর একটা ছোট্ট কালভার্ট থেকেও করতোয়া পর্যন্ত যাওয়া যায়।


স্ক্রল করে দেখা ধারাবাহিক অন্যান্য পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মাসুদার রহমান। কবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *