বিজ্ঞান

চাঁদে মানুষ পাঠানোর নেপথ্য কারিগর মার্গারেট হ্যামিল্টনের জীবনাবসান

শেয়ার করুন:

—অ্যাপোলো অভিযানের সফটওয়্যার উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়া কিংবদন্তি কম্পিউটার বিজ্ঞানীর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর

নিজস্ব প্রতিবেদন

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অ্যাপোলো চন্দ্রাভিযানের মহাকাশযান পরিচালনার সফটওয়্যার তৈরিতে নেতৃত্ব দেওয়া কিংবদন্তি কম্পিউটার বিজ্ঞানী মার্গারেট হ্যামিল্টন মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। গত ৩০ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের ক্যামব্রিজের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর ৭ অক্টোবর প্রকাশ করে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি।

হ্যামিল্টনের নেতৃত্বে তৈরি সফটওয়্যার ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো-১১ অভিযানে চাঁদে মানুষের প্রথম অবতরণ সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনি এমন এক পথিকৃৎ, যাঁর কাজ মহাকাশ অভিযানের পাশাপাশি আধুনিক সফটওয়্যার প্রকৌশলের বিকাশেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। 

 

চাঁদে অবতরণের সংকট সামাল দেয় তাঁর সফটওয়্যার

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই। চাঁদের বুকে অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে অ্যাপোলো-১১-এর লুনার মডিউল ‘ঈগল’। মহাকাশযানটির কম্পিউটারে হঠাৎ একের পর এক সতর্কসংকেত দেখা দিতে শুরু করে। গুরুত্বপূর্ণ সেই মুহূর্তে কম্পিউটারের কাজের চাপ বেড়ে গেলেও সফটওয়্যার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে জরুরি কাজগুলো চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। ফলে অবতরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার তৈরির পেছনে ছিলেন মার্গারেট হ্যামিল্টন ও তাঁর দল। তাঁদের নকশায় এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, যাতে কম্পিউটার একসঙ্গে অনেক কাজের চাপে পড়লেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। অ্যাপোলো-১১-এর চন্দ্রাভিযানে এই ব্যবস্থা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মহাকাশযানের সফটওয়্যার কেবল নির্দেশনা অনুসরণ করলেই চলে না; অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে কীভাবে ভুল শনাক্ত করতে হবে, কোন কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সচল রাখতে হবে—এসব বিষয়ও নিশ্চিত করতে হয়। হ্যামিল্টনের কাজ এসব ধারণাকে বাস্তব মহাকাশ অভিযানে কার্যকর করে তোলে।

 

সফটওয়্যার প্রকৌশলের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা

১৯৩৬ সালের ১৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন মার্গারেট হ্যামিল্টন। ১৯৫৮ সালে আর্লহাম কলেজ থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরের বছর এমআইটিতে কাজ শুরু করেন। সেখানে প্রথম দিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস তৈরির কম্পিউটার প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সফটওয়্যার উন্নয়নেও যুক্ত হন।

১৯৬০-এর দশকে নাসার অ্যাপোলো কর্মসূচির জন্য এমআইটির ইনস্ট্রুমেন্টেশন ল্যাবরেটরিতে মহাকাশযানের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সফটওয়্যার তৈরির কাজ শুরু হয়। হ্যামিল্টন প্রথমে মনুষ্যবিহীন মহাকাশ অভিযানের সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করেন। পরে তিনি নভোচারীবাহী অভিযানের ফ্লাইট সফটওয়্যার উন্নয়নকারী দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৮ সালের মধ্যে তিনি সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার দলের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

তখন কম্পিউটার প্রোগ্রামিংকে আজকের মতো স্বতন্ত্র ও সুপ্রতিষ্ঠিত প্রকৌশলক্ষেত্র হিসেবে দেখা হতো না। সফটওয়্যারের নির্ভরযোগ্যতা, ত্রুটি প্রতিরোধ এবং জটিল ব্যবস্থার নিরাপদ পরিচালনা নিয়ে তাঁর কাজ এ ক্ষেত্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা সফটওয়্যার প্রকৌশল ধারণাটিকে জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত করতেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

 

স্বীকৃতি ও উত্তরাধিকার

অ্যাপোলো কর্মসূচিতে হ্যামিল্টনের নেতৃত্বাধীন দল কয়েক শ প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞের সম্মিলিত প্রচেষ্টার অংশ ছিল। তাঁর কাজের গুরুত্ব কেবল চাঁদে অবতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মহাকাশযান, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অন্যান্য জটিল প্রযুক্তিতে নির্ভরযোগ্য সফটওয়্যার তৈরির ধারণাকেও তা সমৃদ্ধ করেছে।

২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ প্রদান করেন। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে নারীদের অবদানকে সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তিনি অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁর একটি ঐতিহাসিক ছবিতে দেখা যায়, অ্যাপোলো অভিযানের সফটওয়্যারের বিপুল পরিমাণ কাগজে মুদ্রিত কোডের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।

মহাকাশ জয়ের ইতিহাসে সাধারণত নভোচারীদের নামই বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু সেই অভিযানের সাফল্যের পেছনে থাকা অসংখ্য বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞের অবদানও ছিল অপরিহার্য। মার্গারেট হ্যামিল্টনের জীবন ও কর্ম সেই সত্যেরই উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর তৈরি প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার প্রকৌশলে রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের অনুপ্রাণিত করবে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *