গল্প সাহিত্য

স্ক্রল করে দেখা ৯ || মাসুদার রহমান

শেয়ার করুন:

৯. পৃথিবীতে না-আসা কন্যার কবিতা


আমার পুত্র ‘প্রথম প্রান্তর’ তখন ওর মাতৃগর্ভে। একদম প্রাথমিক অবস্থায়—আলট্রাসনোগ্রাম করার আগের পাঁচমাস। তখনো জানি না, যে আসছে সে পুত্র না কন্যা। অজানাই সুন্দর, আমরা জানতেও চাইনি। তবে ভেতরে ভেতরে হয়তো কন্যার প্রত্যাশা ছিল। সন্তানের মুখ দেখার প্রতীক্ষায় থাকা তরুণটি হয়তোবা গোপনে একবার কন্যার বাবা হতে চায়। সে-মতো আমি কন্যাসন্তানের একটি নামও ভেবে রাখি। সুমাত্রা। সুমাত্রা রহমান। নামটা কোথা থেকে এল জানি না। সুমাত্রা দ্বীপের নামে? নাকি ‘সু’ আর ‘মাত্রা’, সুন্দর মাত্রার কোনো গোপন আকাঙ্ক্ষা থেকে? জানি না। শুধু জানি, নামটি আমার জিভে লেগে ছিল, মনের ভেতর গেঁথে ছিল।

তারপর পুত্র জন্মালো। প্রথম প্রান্তর এল পৃথিবীতে। আলো করে। আমার ঘর ভরে গেল। কিন্তু কন্যার জন্য ভেবে রাখা নামটির কী হবে? যে-নামটা এতদিন ধরে আমি জপ করেছি, আদর করেছি, সে তো জন্মাতে পারল না। তাকে কোথায় রাখি? তখন একটা অদ্ভুত কাজ করলাম। নামটি স্বল্পমাত্রায় আমার লেখালেখিতে ব্যবহার শুরু করলাম। ছদ্মনাম বলতে যা বোঝায় আর কি। আসলে ছদ্মনামও না, ওটা ছিল আমার না-আসা মেয়ের নামে বাঁচিয়ে রাখা একটা জীবন। দ্রুত পরিচিতি পেতে থাকল নামটি। অবাক হয়ে দেখলাম, সুমাত্রা রহমান নামটি আমার নিজের নামের চেয়েও দ্রুত পাঠকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে যেন। সম্পাদকরা যেনবা পছন্দ করছেন। ভাবতাম, একজন নারী হলে কেমন লিখতাম আমি? একজন নারীর চোখে এই পৃথিবীটা কেমন দেখায়? তার বিরহ, তার প্রেম, তার শরীর, তার প্রতিরোধ কেমন হয়? সেটাও চেষ্টা করতাম। পুরুষের কলমে নারীর স্বর বসানোর চেষ্টা। বেশ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠলো বিষয়টি। এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে লোকে সত্যি সত্যি বিশ্বাস করতে শুরু করল। কেউ ভাবলেন, এই মেয়ে মাসুদার রহমানের বোন হয়তোবা। কেউ ভাবলেন, একই ঠিকানা থেকে লিখতে আসা মেয়েটি নিশ্চয় মাসুদারের বউ হবে। এই ভুলগুলো আমার ভালো লাগত। মনে হতো, আমি পেরেছি। আমাকে ফোন করে অনেকেই জানতে চাইত, কে সে? সুমাত্রা কে? সেসব প্রশ্নে আমি পাশ কাটিয়ে যেতাম। একটু হাসতাম। বলতাম, আছে, একজন আছে। কেউ কেউ সরাসরি বলত, আমাদের কাগজের জন্য আপনার ২টি আর ভাবি/বউদির একগুচ্ছ লেখা পাঠাবেন। আমি বিনা বাক্য ব্যয়ে পাঠিয়ে দিতাম দু’নামেই। একই খামে দুটো জীবন। কেউ শুধু যোগাযোগ করে বলত, ‘দাদা, দিদির কবিতা দিন’। আমি দিতাম। আমার না-আসা মেয়ের কবিতা দিতাম।

প্রসঙ্গক্রমে বিনয়ের সঙ্গে বলি, সচরাচর কোনো দৈনিক বা বাণিজ্যিক কাগজে যেচে কখনো লেখা দিই না। এটা হয়তো আমার একটা জেদ, একটা অভিমান। আবার এই কথাটি বলা এক ধরনের মিথ্যে বলাও হয়। দিয়েছি, ওই ছদ্মনামে বা পৃথিবীতে না-আসা আমার সেই কন্যাটির নামে। দৈনিক সমকালের পাতায় অনেক লিখেছি ওই নামে। লিখেছি দৈনিক সমকালের সাহিত্য সাময়িকী কালের খেয়াতেও। আরও অনেক অনেক কাগজে, যেখানে মাসুদার রহমানের লেখা তখন পর্যন্ত ছাপা হয়নি, সেখানে সুমাত্রা রহমানকে সানন্দে ছেপে দিচ্ছেন।

সবচেয়ে অবাক হতাম কিছু কথা শুনে। একবার শ্রদ্ধাভাজন এক অগ্রজ কবি বললেন—তোমার কবিতা কী হবে জানি না, তবে সুমাত্রা রহমানের কবিতা টিকে যাবে বাংলা কবিতায়। কথাটা শুনে আমি চুপ করে ছিলাম। বুকের ভেতর কী হয়েছিল জানি না। আনন্দ, নাকি এক ধরনের পিতার গর্ব? নাকি ঈর্ষা?

কখনো সরাসরি দেখা না হওয়া আর এক অগ্রজ ফোনে অনেক প্রশংসা করতেন আমার দু’নামের কবিতা নিয়েই। অনুভব করতাম, সুমাত্রার কবিতার প্রতি ওঁর পক্ষপাত বেশি। তাতে আমার ঈর্ষা হতো? জানি না। তবে প্রেমের বাইরে ঈর্ষা বিষয়টি আমার মধ্যে খুব একটা কাজ করে কি না বুঝতে পারি না। হয়তো ছিল না। ছিল এক ধরনের বিস্ময়। আমি যে নারী নই, অথচ নারী হয়ে লিখতে পারছি, এই বিস্ময়।

অল্পস্বল্প আলোচকদের লেখায় আলোচনাও আসতে থাকল মেয়ে নামে লেখা আমার কবিতা প্রকল্প। কেউ কেউ তত্ত্ব খুঁজলেন, কেউ জেন্ডার। যতদূর মনে পড়ে, ২০০৬ সাল, একদিন সকালে আমার ফোনে একটি ফোন এল। ও-প্রান্ত থেকে ভদ্রলোক তার নাম জানিয়ে জিজ্ঞেস করেন, আমি সুমাত্রা রহমান কি না। আমি বলি—হাঁ, আমি সুমাত্রা রহমান বলছি। বুঝতে পারি, আমার কথা শুনে কিঞ্চিৎ অবাক হন ভদ্রলোক। নামের সঙ্গে মিলিয়ে হয়তো নারীকণ্ঠ প্রত্যাশা করেছিলেন। পর মুহূর্তে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে ও-প্রান্তে থেকে জানান, তাঁর বন্ধু হাসান মোরশেদ, যিনি তখন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। হাসান মোরশেদ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’-এর একজন অ্যাক্টিভিস্ট। হাসান মোরশেদ একজন কথাসাহিত্যিকও। ফোনের ওপ্রান্ত থেকে একনাগাড়ে গড়গড় করে বলে যেতে থাকেন। আরও বলেন—আপনার ‘মেয়েটিকে বাঘে ধরেছিল’ কবিতাটি আপনার অনুমতি পেলে হাসান মোরশেদ তাঁর একটি উপন্যাসে ব্যবহার করতে চান। আমি খোলা সম্মতি জানিয়ে দিই ওপ্রান্তের ভদ্রজনকে। তখন পর্যন্ত হাসান মোরশেদের লেখালেখি সম্পর্কে জানতাম না। ২০০৯-এ শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুল আমাকে পাঠিয়ে দেন হাসান মোরশেদের চমৎকার এক উপন্যাস ‘শমন শেকল ডানা’। যে-উপন্যাসে সুমাত্রা রহমানের কবিতা ‘মেয়েটিকে বাঘে ধরেছিল’ সহ সৈয়দ শামসুল হক ও  জফির সেতুর কবিতা ব্যবহার করা হয়েছে। এর অনেক পরে হাসান মোরশেদের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ ও আলাপ হয়। প্রসঙ্গত জানাই, ‘মেয়েটিকে বাঘে ধরেছিল’ কবিতাটি আমার ‘হাটের কবিতা’ কাব্যগ্রন্থে সূচিভূক্ত করেছি।

আরও এক অবাক করা ব্যাপার সামনে আসে, সুমাত্রা রহমান প্রসঙ্গে আমার টাইমলাইনে একটি পোস্ট দেবার পর। সেই পোস্টে প্রথম পাবলিকলি জানাই সুমাত্রা রহমান সম্পর্কে। দেশের আলোচিত একজন অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবীর যিনি সংবাদপত্র এবং টেলিভিশনে দেশের অর্থনীতি বাণিজ্য মূল্যস্ফীতি নানাবিধ বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণমূলক মতামত প্রদান করেন। তিনিই ২০১৯-এর কোনো এক সন্ধ্যায় ম্যাসেঞ্জারে নক করেন। জানান, সুমাত্রা রহমানের কবিতা ‘মেয়েটিকে বাঘে ধরেছিল’ পড়েছেন ২০০৬ সালে। তারপর থেকে তিনি সুমাত্রা রহমানের খোঁজ করে গেছেন, পত্রপত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সুমাত্রা রহমান সংক্রান্ত আমার করা পোস্ট তিনি গুগল সার্চ করে পেয়েছেন ২০১৯-এর ১৯ জুলাই। সম্ভবত ওই দিন সন্ধ্যায় আমি পোস্টটি করি। খুব অবাক হয়েছিলাম ডাকসাইটে এই অর্থনীতিবিদের মুখে অনামী অখ্যাত এক কবির কবিতা পড়ে ২০০৬ সাল থেকে বছরের পর বছর খোঁজ চালিয়ে গেছেন এবং ২০১৯-এ এসে সেই ক্লু উদঘাটন করেছেন। আমি ভদ্রলোককে বিশদ জানাই। তিনি পুত্র প্রথম প্রন্তরের খোঁজখবর নেন। জানান, সে-সময়েই তিনিও কন্যাসন্তানের পিতা হয়েছেন। মি. মাহফুজ কবীর এখন আমার ফেসবুকবন্ধু। একজন অর্থনীতিবিদ, ভেতরে বহন করেন বাংলা কবিতার উন্মাদনা। সত্যিই অবাক হই। অনেকের ধারণা, বাংলা কবিতার পাঠক নেই। তখন এমন ঘটনা আর নামগুলো সামনে এলে সেই ধারণাকে আমার কাছে মিথ্যে করে দেয়।

কবি শামীম হোসেন, তখন রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘সোনার দেশ’ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনার দায়িত্বে। মাঝেমধ্যে ও কবিতা চাইত সাময়িকীর পাতার জন্য, দিতাম। একবার শামীম চেয়ে বসলো, সুমাত্রা রহমানের কবিতা। কথা না বাড়িয়ে ওকে পাঠিয়ে দিই ‘বেবুন’ নামে একটি কবিতা। সোনার দেশ  সাহিত্যপাতায় প্রকাশিত হয় কবিতাটি। শামীম সেদিন সন্ধ্যায় ফোন করে জানায়—মাসুদারভাই, আজ সারাদিন বেশ কয়েকটি ফোন এসেছে আমাদের সম্পাদকীয় দপ্তরে। প্রসঙ্গ—সুমাত্রা রহমানের কবিতা। আগ্রাসী পৌরুষ ও নারীর যৌন-অনিচ্ছা ছিল সে-কবিতার উপজীব্য। যা পড়ে মানুষ অস্বস্তিবোধ করেছে। কেউ কেউ বলেছেন, ‘সোনার দেশ’ আমরা পড়ি, এমনকি পরিবারের কনিষ্ঠরাও পড়ে পত্রিকাটি। সেই স্বাভাবিকতায় সুমাত্রা রহমানের কবিতাটি গোল বাঁধিয়েছে। শামীম বলে, যারা কবিতা পড়ে না তারাও আজ কবিতা পড়েছে, মাসুদারভাই! আমি উৎকণ্ঠিত শঙ্কিত হই, শামীম কবিতাটি বড় দুঃসাহস নিয়ে ছেপেছে বলে। শামীম বলে, না, তা নিয়ে ওঁর পেশাগত জায়গায় কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু কয়েক বছর মাত্র, তারপর বন্ধ করে দিলাম এই পর্বের কবিতা। হঠাৎ একদিন মনে হলো—থাক। সুমাত্রা তো আমার মেয়ে হয়ে জন্মাবার কথা ছিল। ওর কবিজন্মের সম্ভাবনা আমি নিজের হাতে গলা টিপে মেরে দিলাম। কারণ একসময় বুঝলাম, ওকে দিয়ে আমি কবিতা লেখাতে পারি না। ও কবি নয়, ও আমার মেয়ে। ওকে আমি কাগজে কাগজে ছাপতে পারি না। ও পৃথিবীতে না এলেও ওর অস্তিত্ব আমি বহন করছি। আমার ভেতরে।

স্ক্রল করে দেখা ধারাবাহিক পড়তে এখানে ক্লিক করুন

মাসুদার রহমান। কবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *