সাহিত্য

কলম্বাস ডে : আবিষ্কারের গৌরব, নাকি ইতিহাসের অস্বস্তিকর সত্য?

শেয়ার করুন:

যুক্তরাষ্ট্রে ৫৩৪ বছর পরও বিতর্কিত এক দিবস—অভিবাসী ঐতিহ্য, আদিবাসীদের অধিকার ও ইতিহাসের নতুন মূল্যায়ন

নিজস্ব প্রতিবেদন 

যুক্তরাষ্ট্রে সোমবার, ১২ অক্টোবর পালিত হচ্ছে কলম্বাস ডে। ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছেছিলেন। ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে যোগাযোগের ইতিহাসে এই যাত্রা গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এই দিবসের অর্থ ও তাৎপর্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গভীর বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক পক্ষের কাছে এটি ইতালীয়-আমেরিকান ঐতিহ্য ও অভিযাত্রার প্রতীক, অন্য পক্ষের কাছে ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তার এবং আদিবাসীদের ওপর নিপীড়নের ইতিহাস স্মরণ করার দিন।

 

ইতিহাসের কোন দিকটি স্মরণ করা হবে?

কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রা ইউরোপীয় শক্তিগুলোর জন্য আমেরিকায় বাণিজ্য, দখল ও উপনিবেশ বিস্তারের পথ প্রশস্ত করেছিল। তবে আমেরিকা তাঁর আবিষ্কার—এমন ধারণা ঐতিহাসিকভাবে যথার্থ নয়। কলম্বাসের আগমনের বহু হাজার বছর আগে থেকেই এই মহাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, নিজস্ব সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ব্যবস্থা ছিল।

ইউরোপীয়দের আগমনের পর আদিবাসীদের জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। রোগব্যাধি, দাসত্ব, ভূমি দখল, সহিংসতা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ফলে বহু জনগোষ্ঠী বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ে। স্মিথসোনিয়ানের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব দ্য আমেরিকান ইন্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয়দের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগের পরবর্তী প্রায় ১৩০ বছরে আমেরিকার আদিবাসী জনসংখ্যার আনুমানিক ৯৫ শতাংশ হারিয়ে যায়।

অতএব, কলম্বাসের যাত্রাকে কেবল আবিষ্কার ও বীরত্বের গল্প হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। একই সঙ্গে ইতালীয়-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর কাছে দিবসটির সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। উনিশ শতকে এই দিবস ইতালীয় অভিবাসীদের পরিচয় ও মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়। ১৯৩৪ সালে প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে দিবসটি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়; পরে ১৯৭১ সাল থেকে অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবারে এটি পালনের প্রচলন প্রতিষ্ঠিত হয়।

কলম্বাস ডে থেকে আদিবাসী দিবস

ইতিহাসের বহুমাত্রিক মূল্যায়নের দাবি থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইন্ডিজেনাস পিপলস ডে’ বা আদিবাসী জনগোষ্ঠী দিবসের গুরুত্ব বেড়েছে। এই দিবস আদিবাসীদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অবদান এবং টিকে থাকার সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানায়। দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, শহর ও স্থানীয় প্রশাসন কলম্বাস ডের পরিবর্তে অথবা পাশাপাশি এই দিবস পালন করে। তবে সব স্থানে একই নাম বা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না।

এ বছরের বিতর্কেও বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কলম্বাসের ঐতিহ্য ও স্মৃতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে, আদিবাসীদের ইতিহাসকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিও অব্যাহত রয়েছে। ফলে দিবসটি এখন ইতিহাসের ব্যাখ্যা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থানের সংঘাতের প্রতীক।

ইতিহাসের শিক্ষা হোক সবার জন্য

একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি অতীতের গৌরব স্মরণ করার পাশাপাশি অতীতের অন্যায় স্বীকার করার সাহসেও নিহিত। কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার না করেও আদিবাসীদের ওপর সংঘটিত নিপীড়ন, ভূমি হারানো ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের সত্য তুলে ধরা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসীদের দেশ। এখানে ইতালীয়-আমেরিকানদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন সম্মানের দাবিদার, তেমনি এই ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দাদের ইতিহাস ও অধিকারও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। ইতিহাসকে কোনো একটি গোষ্ঠীর গৌরবগাথায় সীমাবদ্ধ না রেখে সব জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও অবদানকে অন্তর্ভুক্ত করাই সময়ের দাবি।

কলম্বাস ডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই কাউকে এককভাবে নায়ক বা খলনায়ক ঘোষণা করা নয়; বরং ইতিহাসকে সম্পূর্ণভাবে জানা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। যে ইতিহাস সত্যকে ধারণ করে, সেই ইতিহাসই একটি জাতিকে আরও মানবিক, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক করে তুলতে পারে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *