—কন্যাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ অ্যানি ফেরদৌস দম্পতি
—৩৫ বছরেই না ফেরার দেশে নৃত্যশিল্পী ও শিক্ষক তাসীন ফেরদৌস
—মা-বাবা ও পরিবারকে শোকসাগরে ভাসিয়ে রেখে গেলেন স্বামী ও শিশুপুত্র
নিজস্ব প্রতিবেদক, নিউইয়র্ক
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের আশার কেন্দ্রবিন্দু ছিল যে সন্তান, সেই কন্যাকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অ্যানি ফেরদৌস ও প্রকৌশলী জাফর আহমেদ দম্পতি। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যুতে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তাঁদের আদরের মেয়ে তাসীন ফেরদৌস। রেখে গেছেন শোকাহত মা-বাবা, ভাই, স্বামী ও লুকাস নামের এক শিশুপুত্রসহ অসংখ্য স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীকে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ভোরে নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তাসীন। তাঁর এই অকালপ্রয়াণে নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজ, সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও পরিচিতজনদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

পারিবারিক ও কমিউনিটি সূত্রে জানা গেছে, হঠাৎ তীব্র ভাইরাসজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হলে শনিবার তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তবে তাঁর অসুস্থতা ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
তাসীন ফেরদৌস ছিলেন ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস’ (বিপা)-র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও শৈল্পিক পরিচালক অ্যানি ফেরদৌস এবং প্রকৌশলী জাফর আহমেদের একমাত্র কন্যা। পেশাগত জীবনে তিনি নিউইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অব এডুকেশনের একজন শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি নৃত্যশিল্পী হিসেবে প্রবাসের বাংলা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গড়ে তুলেছিলেন স্বতন্ত্র পরিচিতি।

মায়ের হাত ধরেই শৈশবে বিপার মাধ্যমে নৃত্যচর্চার সূচনা তাসীনের। লোকনৃত্য ও সমসাময়িক নৃত্যে দক্ষতা অর্জনের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি নিউইয়র্কের ‘শিব জ্যোতি ড্যান্স একাডেমি’তে প্রখ্যাত নৃত্যগুরু তেজস্বিনী রাজের অধীনে ভরতনাট্যম শেখা শুরু করেন। দীর্ঘ আট বছরের সাধনা শেষে ২০১৩ সালে সম্পন্ন করেন ভরতনাট্যমের আনুষ্ঠানিক একক মঞ্চাভিষেক ‘আরাঙ্গেত্রাম’।
বিপা ও শিব জ্যোতি ড্যান্স একাডেমির সঙ্গে যুক্ত থেকে নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক মঞ্চ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন তিনি। শিল্পচর্চার বাইরেও ব্রুকলিনের কেনসিংটনসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসী বাংলাদেশিদের নাগরিক অধিকার ও সমাজসেবামূলক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

তাঁর জীবন ছিল শিল্প, শিক্ষা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার এক সম্মিলিত পথচলা। কিন্তু সেই পথচলা থেমে গেল মাত্র ৩৫ বছরেই। যে মেয়েকে ঘিরে মা-বাবার ছিল অসংখ্য স্বপ্ন, যে মায়ের হাত ধরে নৃত্যের জগতে প্রবেশ, সেই মাকে আজ সহ্য করতে হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে কঠিন শোক। অন্যদিকে, স্বামী হারালেন জীবনসঙ্গীকে, আর এক শিশুপুত্র হারাল তার মাকে—এমন এক শূন্যতা, যা কোনো সান্ত্বনার ভাষায় পূরণ হওয়ার নয়।
তাসীনের আকস্মিক মৃত্যুতে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত মা অ্যানি ফেরদৌস, বাবা জাফর আহমেদ, ভাই, স্বামী, শিশুপুত্র ও পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

মহান আল্লাহ তাসীন ফেরদৌসকে ক্ষমা করুন, তাঁর আত্মার শান্তি দান করুন এবং শোকাহত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দিন। আমিন।


