সমাজ

সতর্কবার্তার পরও চলছিল রিসোর্ট, আগুনে ঝরল ১০ প্রাণ

শেয়ার করুন:

কক্সবাজারে পর্যটকদের মর্মান্তিক মৃত্যু : নিরাপত্তাহীনতার দায় কার, জবাবদিহি করবে কে?

একটি পরিবার বের হয়েছিল আনন্দভ্রমণে। সমুদ্র দেখবে, প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটাবে কিছু সুন্দর মুহূর্ত, ফিরবে নতুন স্মৃতি নিয়ে। কিন্তু সেই ভ্রমণই কেড়ে নিল তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—প্রিয় মানুষগুলোকে। কক্সবাজারের ইনানীতে একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ পর্যটক। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্বজনদের কাছে আনন্দভ্রমণ এখন পরিণত হয়েছে এক অসহনীয় শোকের অধ্যায়ে।

কিন্তু এই মৃত্যুর ঘটনা কি কেবলই একটি দুর্ঘটনা? আগুন লাগার কারণ নির্ধারণের তদন্ত এখনো চলমান। তবে এর মধ্যেই সামনে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—রিসোর্টটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল এবং অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। গত জুনে পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল বলেও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, সতর্কবার্তার পরও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল?

 

আগুনে পুড়ল রিসোর্ট, নিভে গেল ১০ প্রাণ

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। সকাল আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে ছড়িয়ে পড়া আগুন দ্রুত গ্রাস করে রিসোর্টের কাঠের তৈরি ভবনটি। আগুনের তীব্রতায় পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন। পরে রিসোর্ট থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

রিসোর্টটি কাঠের তৈরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত সূত্রপাত কোথায়, কীভাবে আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল এবং অতিথিদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছেন। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যু স্বজনদের জন্য শোকের গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যে জায়গায় নিরাপদে থাকার কথা ছিল, সেই আবাসনই কীভাবে প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হলো—এই প্রশ্ন এখন কেবল নিহতদের পরিবারের নয়, দেশের পর্যটন খাতের সঙ্গেও জড়িত।

 

সতর্কবার্তা ছিল, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছিল কি?

এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আগের সতর্কবার্তা। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, জুন মাসে রিসোর্টটি পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং ১১ জুন সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল না।

এখানেই উঠে আসে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন।

প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর রিসোর্টটির বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই পর্যটকদের থাকার সুযোগ দেওয়া হলো কীভাবে? তৃতীয়ত, পরিদর্শন ও সতর্কবার্তার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুনরায় যাচাই করেছিল কি না? চতুর্থত, ভবনে জরুরি নির্গমনপথ, কার্যকর অ্যালার্ম, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত কর্মী পর্যাপ্ত ছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন নথিপত্র যাচাই, পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি। সতর্কবার্তা জারির পরও যদি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়ে থাকে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় কার—তাও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

 

পর্যটনশিল্পের বিকাশ, নিরাপত্তা কি পিছিয়ে?

কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর দেশ-বিদেশের বহু মানুষ পরিবার নিয়ে সেখানে বেড়াতে যান। হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও বেড়েছে।

পর্যটন খাতের উন্নয়ন শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রতিটি আবাসনে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনপথ, বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম এবং নিয়মিত মহড়া নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিশেষ করে কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণে তৈরি স্থাপনায় আগুনের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থার প্রয়োজন আরও বেশি।

একটি লাইসেন্স বা ছাড়পত্র কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থার অংশ। নিয়ম না মানলে শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যক্রম বন্ধের মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

 

তদন্ত হোক, দায় নির্ধারিত হোক

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন তদন্তকে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর রাখা। আগুনের উৎস, ভবনের নির্মাণ উপকরণ, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, রান্নাঘরের নিরাপত্তা, জরুরি নির্গমনপথ, অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র এবং পূর্ববর্তী পরিদর্শনের নথি—সবকিছু খতিয়ে দেখতে হবে।

একই সঙ্গে কক্সবাজারসহ দেশের অন্যান্য পর্যটন এলাকায় হোটেল ও রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। কোথাও নিয়মের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে তা সংশোধনে সময়সীমা নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

১০টি প্রাণের ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যানমাত্র নয়। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, স্বপ্ন, সম্পর্ক এবং অসংখ্য অপূর্ণতা। স্বজনদের কান্না কোনো ক্ষতিপূরণে থামানো যাবে না। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি দূর করা যায়, ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।

প্রশ্ন তাই শুধু আগুন কীভাবে লাগল, তা নয়—আগুন লাগার আগেই যে ঝুঁকি শনাক্ত হয়েছিল, সেই ঝুঁকি দূর করতে কী করা হয়েছিল?

এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর, দায় নির্ধারণ এবং কার্যকর পদক্ষেপই এখন নিহতদের প্রতি রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ন্যূনতম দায়িত্ব।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *