দেশে দেশে সংগীত ও সংস্কৃতির ভাষা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষের মনের উৎসব বোধ হয় সব দেশেই সমান। ভিন্ন দেশ ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ যখন একই মাঠে এসে মিলিত হয়, তখন পরিচয়ের দূরত্বটুকুও ধীরে ধীরে মুছে যায়। ঝালমুড়ি আর হাওয়াই মিঠাইয়ের স্বাদের মতোই মানুষ তখন একে অন্যের আনন্দে মিশে যায়—একসময় সবাই হয়ে ওঠে একই উৎসবের অংশ।
গত ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে পেনসিলভানিয়ার হ্যাটফিল্ডে School Road Park, 1619 School Rd, Hatfield, PA 19440 ঠিকানায় বাংলাদেশ আমেরিকান সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দেশীয় ঐতিহ্য, সংগীত, নৃত্য, খাবার এবং বহুসংস্কৃতির সম্মিলনে পুরো আয়োজনটি হয়ে উঠেছিল প্রবাসের মাটিতে এক টুকরো বাংলাদেশ।
সকালে বর্ণাঢ্য প্যারেডের মধ্য দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্যারেডে অংশগ্রহণকারীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি, দেশীয় সাজপোশাক এবং উৎসবমুখরতা দিনের শুরুতেই পুরো পার্কে আনন্দের আবহ তৈরি করে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী এবং প্রবীণ—সব বয়সের মানুষের মিলনে পার্কটি হয়ে ওঠে একটি বৃহৎ পারিবারিক মিলনমেলা।
আয়োজনের নেপথ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ পলাশ ও শহিদুল পার্থ । তাঁদের সঙ্গে প্রায় চল্লিশজন সহযোগী পুরো অনুষ্ঠানটি সফল করে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করেন। আয়োজকদের পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও আন্তরিকতা উৎসবের প্রতিটি পর্বেই স্পষ্ট ছিল। অতিথিদের স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে মঞ্চ, স্টল, খাবার এবং অন্যান্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছুতেই ছিল পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাট্যের ছাপ। এককথায়, আয়োজনটি ছিল অত্যন্ত গোছানো ও টিপ-টপ।

মঞ্চে দিনব্যাপী পরিবেশিত হয় দেশীয় গান, নৃত্য এবং শিশু-কিশোরদের নানা পরিবেশনা। পরিচিত বাংলা গানের সুর যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে ফেলে আসা দেশের স্মৃতিও যেন নতুন করে জেগে উঠছিল। শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ ছিল উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। বিদেশের মাটিতে বেড়ে উঠলেও তারা যে নিজেদের ভাষা, সংগীত ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে, তাদের পরিবেশনায় সেই আশাব্যঞ্জক চিত্রই ফুটে ওঠে।
মাঠজুড়ে ছিল দেশীয় খাবার, পোশাক ও বিভিন্ন পণ্যের প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশটি স্টল। ঝালমুড়ি, হাওয়াই মিঠাইসহ পরিচিত সব স্বাদ উৎসবে যোগ করেছিল আলাদা আনন্দ। দেশীয় পোশাকের দোকানগুলোতেও ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। নানা বয়সের মানুষের রুচিশীল পোশাক ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে আরও বর্ণিল করে তোলে। মনে হচ্ছিল, মানুষ শুধু একটি অনুষ্ঠান দেখতে আসেননি; নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করে অন্যের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতেও এসেছেন।
তবে আয়োজনটি কেবল বাংলাদেশের সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অন্য দেশের মানুষ ও সংস্কৃতিকে জানার জন্যও আয়োজকেরা রেখেছিলেন বিশেষ ব্যবস্থা। এই উদ্যোগ উৎসবটিকে একটি সাধারণ দেশীয় মিলনমেলা থেকে বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতির আয়োজনে পরিণত করেছে।
বিশেষভাবে নজর কেড়েছে কোরিয়ান সম্প্রদায়ের একটি স্টল। সেখানে তাঁরা আগ্রহীদের নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। কেউ আগ্রহ প্রকাশ করলে তাঁর নাম কোরিয়ান ভাষায় লিখে দেওয়া হচ্ছিল; পাশাপাশি ইংরেজি অক্ষরে বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল নামটির উচ্চারণ। দর্শনার্থীদের কোরিয়ান সংগীত বাজিয়ে দেখার সুযোগও দেওয়া হয়। অনেকেই কৌতূহল নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, নিজের নাম কোরিয়ান ভাষায় লিখিয়ে নিয়েছেন এবং নতুন একটি সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছেন।

স্টলটিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ দেখে বোঝা গেছে, আন্তরিকভাবে কাছে আসার সুযোগ তৈরি হলে ভাষার ভিন্নতা মানুষের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। বরং অপরিচিত ভাষার একটি অক্ষর কিংবা অন্য দেশের একটি সুরও তখন নতুন সম্পর্কের সূচনা করতে পারে। মঞ্চে যখন চলছিল দেশীয় গান, মাঠের অন্য পাশে তখন মানুষ পরিচিত হচ্ছিল ভিন্ন একটি দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে। একই আয়োজনে নিজের শিকড়কে উদ্যাপন এবং অন্যের সংস্কৃতিকে সম্মান জানানোর এই প্রয়াস ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়।
একটি বড় আয়োজন সফল করতে আয়োজকদের পরিকল্পনা ও শ্রম যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা। যাঁরা আয়োজন করেন, তাঁরা মঞ্চ ও পরিবেশ তৈরি করে দেন; কিন্তু যাঁরা সেখানে উপস্থিত হন, গান শোনেন, শিশুদের উৎসাহ দেন, খাবার ও পোশাকের স্টল ঘুরে দেখেন এবং অন্য সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কথা বলেন—তাঁরাই সেই আয়োজনকে প্রাণ দেন।
আজকের দর্শনার্থীরা না এলে গানগুলো হয়তো মঞ্চেই থেকে যেত, শিশুদের পরিবেশনা পূর্ণতা পেত না, আর এত বড় আয়োজনের আনন্দও সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত না। তাই এই সাফল্য শুধু আয়োজকদের নয়; উপস্থিত প্রতিটি মানুষেরও। তাঁদের অংশগ্রহণেই School Road Park-এর সবুজ মাঠটি কয়েক ঘণ্টার জন্য হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ, প্রবাস এবং বহুসংস্কৃতির এক সম্মিলিত প্রাঙ্গণ।

প্রবাসে এমন আয়োজন কেবল বিনোদনের উপলক্ষ নয়। এর মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম নিজের দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে অন্য দেশের মানুষও বাংলাদেশি সংস্কৃতি, বই, খাবার, পোশাক ও সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। পারস্পরিক পরিচয় থেকে জন্ম নেয় সম্মান, আর সম্মান থেকেই তৈরি হয় সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি।
বাংলাদেশ আমেরিকান সাংস্কৃতিক -এর এই আয়োজন তাই একটি দিনের উৎসবের চেয়েও বেশি কিছু। এটি ছিল শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা, প্রবাসী মানুষের মিলনমেলা এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার একটি সুন্দর উপলক্ষ।
এমন পরিপাটি, প্রাণবন্ত ও বহুসাংস্কৃতিক আয়োজন প্রতিবছর ফিরে আসুক। প্রবাসের মাঠে দেশীয় গান বাজুক, শিশুদের কণ্ঠে বাংলা উচ্চারিত হোক, খাবারের ঘ্রাণে জেগে উঠুক ফেলে আসা দেশের স্মৃতি—আর সেই আনন্দে এসে যোগ দিক পৃথিবীর নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ। কারণ উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই পূর্ণ হয়, যখন নিজের আলোয় অন্যকেও দেখা যায়।

আহমদ সায়েম। কবি ও গদ্যকার



