সমাজ

বিধ্বংসী ব্যাধি সিজোফ্রেনিয়া ও মিরপুরের ঘটনা

শেয়ার করুন:

কিছুতেই মন থেকে ভয় যায় না। মনে হয় কেউ যেন আড়াল থেকে সবসময় তাড়া করে বেড়াচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অদ্ভুত সব দৃশ্য, কানে আসে এমন সব কণ্ঠস্বর যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। অবচেতনে কেউ যেন প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত করে চলেছে। মনের এই ভয়ংকর, জটিল ও অন্ধকার অসুখটির নাম সিজোফ্রেনিয়া।

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে জটিল ও বিধ্বংসী মানসিক রোগগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত এই রোগ সম্পর্কে আমাদের সমাজে সচেতনতা এখনো অত্যন্ত সীমিত। ফলে রোগটিকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য ভুল ধারণা, কুসংস্কার এবং সামাজিক কলঙ্ক।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে এক নারীর মর্মান্তিক মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ, বেদনা এবং নানা ধরনের মন্তব্যের ঝড় উঠেছে। অনেকেই ঘটনাটিকে কেবল পারিবারিক অবহেলার দৃষ্টিতে দেখেছেন। কিন্তু পরে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মৃত ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন।

এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—মানসিক রোগ সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা ও অসচেতনতা কি কখনও কখনও বাস্তবতাকে বোঝার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না?

 

সিজোফ্রেনিয়া কী?
সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল মস্তিষ্কজনিত মানসিক ব্যাধি। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো হ্যালুসিনেশন, ডিলিউশন, প্যারানয়া, চিন্তাভাবনার অসংলগ্নতা এবং ইচ্ছাশক্তির ঘাটতি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। বাংলাদেশেও বিপুল সংখ্যক মানুষ নীরবে এই রোগের সঙ্গে লড়াই করছেন, যদিও তাদের অনেকেই কখনো সঠিকভাবে শনাক্ত বা চিকিৎসার আওতায় আসেন না।

কেন একে সবচেয়ে ‘বিধ্বংসী’ মানসিক রোগ বলা হয়?
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সিজোফ্রেনিয়াকে সবচেয়ে বিধ্বংসী মানসিক রোগ বলা হয় কারণ এটি সাধারণত কৈশোর ও তারুণ্যের শুরুতে আঘাত হানে—যখন একজন মানুষ তার শিক্ষা, কর্মজীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ার পথে এগিয়ে যেতে শুরু করেন।

সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে রোগটির প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পায়। অনেক ক্ষেত্রে শৈশব থেকেই এর বীজ সুপ্ত অবস্থায় থাকে, যা পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ পায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগত কারণ, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা, জন্মকালীন জটিলতা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, পারিবারিক অশান্তি কিংবা শৈশবের মানসিক আঘাত রোগটির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

হ্যালুসিনেশন ও ডিলিউশনের ভয়ংকর জগৎ
সিজোফ্রেনিয়ার সবচেয়ে জটিল দিক হলো হ্যালুসিনেশন ও ডিলিউশন।

রোগীরা এমন কিছু দেখতে বা শুনতে পারেন যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। অনেকেই একসঙ্গে একাধিক কণ্ঠস্বর শুনতে পান, যা তাদের নিয়ে কটূক্তি করে, ভয় দেখায় কিংবা বিভিন্ন নির্দেশ দেয়।

চূড়ান্ত পর্যায়ে রোগীরা এমন এক অবাস্তব ভয়ের মধ্যে বাস করতে থাকেন যে তাদের চারপাশের সবাই তাদের ক্ষতি করতে চায়। এমনকি নিজের সন্তান, স্বামী, স্ত্রী কিংবা নিকট আত্মীয়দের প্রতিও তাদের গভীর অবিশ্বাস জন্মাতে পারে।

এই প্যারানয়ার কারণে অনেক রোগী পরিবারের দেওয়া খাবারকে বিষ মনে করে খেতে অস্বীকৃতি জানান। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধকে ষড়যন্ত্রের অংশ মনে করে ফেলে দেন। কেউ কেউ দিনের পর দিন নিজেকে ঘরের একটি কোণে বা বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখেন।

বাইরের মানুষের কাছে এসব আচরণ অবুঝ, অস্বাভাবিক কিংবা বিরক্তিকর মনে হলেও রোগীর কাছে এগুলোই তখন বাস্তবতা।

সমাজের ভুল ধারণা ও নির্মম বাস্তবতা
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে সিজোফ্রেনিয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি কুসংস্কার ও সামাজিক কলঙ্ক বিদ্যমান।

অনেকেই এই রোগীদের ‘পাগল’, ‘উন্মাদ’ কিংবা ‘জিনে ধরা’ বলে আখ্যায়িত করেন। সমাজে এমন ধারণাও প্রচলিত যে সিজোফ্রেনিয়ার রোগীরা অত্যন্ত হিংস্র ও বিপজ্জনক।

বাস্তবে চিত্রটি ভিন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রোগীরা অন্যের চেয়ে নিজের জন্যই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রচেষ্টার মুখোমুখি হন।

যে সংগ্রাম সমাজ দেখে না
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক সিজোফ্রেনিয়া রোগী নিজেরাই বুঝতে পারেন না যে তারা অসুস্থ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ‘অ্যানোসোগনোসিয়া’।

ফলে তারা চিকিৎসা নিতে চান না, ওষুধ খেতে অস্বীকৃতি জানান এবং পরিবারের সহায়তাকেও সন্দেহের চোখে দেখেন।

এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের ওপর বিশাল মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। একজন মা, বাবা, সন্তান কিংবা জীবনসঙ্গী বছরের পর বছর রোগীর পাশে থেকে সংগ্রাম করে যান। কিন্তু সমাজ তাদের সেই নিরবচ্ছিন্ন লড়াই, মানসিক যন্ত্রণা এবং অসহায়ত্ব খুব কমই দেখতে পায়।

মিরপুরের ঘটনাকে ঘিরে যে জাতীয় ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে শুধু বিচার-বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। কারণ একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগীর পেছনে প্রায়শই থাকে একটি ক্লান্ত, বিপর্যস্ত এবং দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রামরত পরিবার।

নিরাময় না হলেও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব
সিজোফ্রেনিয়া পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়। তবে এটি কোনো আশাহীন রোগও নয়।

আধুনিক চিকিৎসা, নিয়মিত ওষুধ, সাইকোথেরাপি, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি, সামাজিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং পারিবারিক সহায়তার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীকেই অনেকাংশে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

বর্তমানে বাংলাদেশেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাই রোগীকে লুকিয়ে রাখা, অবহেলা করা কিংবা ‘পাগল’ বলে দূরে সরিয়ে না দিয়ে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের করণীয়
মিরপুরের সেই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।

মানসিক রোগকে লুকিয়ে রাখা নয়, বুঝতে শেখা জরুরি। রোগীকে দোষারোপ নয়, চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। পরিবারকে বিচার করা নয়, তাদের সংগ্রামকেও উপলব্ধি করা জরুরি।

ক্ষোভ প্রকাশ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার এবং মানবিক সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

কারণ সিজোফ্রেনিয়া শুধু একজন মানুষের রোগ নয়; এটি একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং কখনও কখনও একটি জাতির নীরব সংগ্রামের নাম।


আশরাফুল ইসলাম আরিফ 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *