সাহিত্য

অন্তিম চিঠি ।। পলি শাহীনা

শেয়ার করুন:

‘মা, ও মা, আর দশটা মিনিট বস।’

নুরুল চাচার এমন মায়া জড়ানো মিনতি আমি এড়াতে পারি না। তাঁর অপেক্ষায় আমি পাহাড়ের মতো স্থানু হয়ে বসে থাকি। উনি ঘুড়ির মতো উড়তে থাকেন রেস্তোরাঁর এক টেবিল হতে অন্য টেবিলে। মানুষের বিশৃঙ্খল কোলাহল জেনারেটরের বিকট শব্দের মতো কানে এসে লাগে। আমি দুই হাতে কান চেপে ধরে চোখ বুঁজে নুরুল চাচার অপেক্ষায় বসে থাকি। দশ মিনিট ইতিমধ্যে ঘন্টা ছাড়িয়ে গেছে, আমি নিশ্চিত। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, কাঁটা সে আগের জায়গায়, এগারোটা বেজে দশ মিনিট। গত কয়েকদিন ধরে ঘড়ির কাঁটা এই একই জায়গায় থেমে আছে। ব্যাটারি কিনব কিনব করেও কেনা হচ্ছে না আলসেমির জন্যে। ঘড়ির কাঁটা এগারোটার ঘরে হলেও আজ চাচা সম্ভবত আমার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন। বয়োজ্যেষ্ঠ এ মানুষটার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতায় বুঁদ হয়ে থাকা আমি মুখে কিছু বলতেও পারছি না।

করোনা মহামারি শুরুর দুঃসহ সময়টায় এ মানুষটা আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। কঠিনতম সে বিপন্ন সময়ে এক মানুষ যখন অন্য মানুষের সংস্পর্শ হতে দৌড়ে দূরে সরে যেত, তখন এ নুরুল চাচা আমার ঘরে প্রয়োজনীয় বাজারসহ খাবার পর্যন্ত পৌঁছে দিত। করোনা মানুষের পৃথিবীতে এক মানিয়ে নেয়া আতঙ্কের নাম। আজো মানুষ সে বিপন্ন সময়ের শরীর সাঁতরে সামনে হাঁটছে। কবে মানুষ এই অদৃশ্য শত্রু হতে মুক্ত হবে, কেউ জানে না। নুরুল চাচার প্রতি আমার অনেক ঋণ। তবে করোনাকালীন তাঁর সাহায্যের কথা কোনোদিন ভুলবো না। আর্থিক প্রয়োজনেও তাঁর কাছে সাহায্য পেয়েছি। এমন নয় যে তাঁর অঢেল অর্থ রয়েছে, তবুও প্রয়োজনে কোনোদিন আমাকে নিরাশ করেন নি। আমার চোখে দেখা একজন মানবিক মানুষ তিনি। আমার বাবা নেই। নুরুল চাচার মায়ায় বাবার প্রতিসরণ দেখতে পাই। আপনা হতে টের পাই, উনি যেন আমার মাথার উপর সদা বাবার মত ছায়া ফেলেন।

কমলালেবুর মতো দিনের রোদ এসে চোখে-মুখে পড়ছে। ঝকঝকে আলোর প্লাবনে ভাসতে ভাসতে পরীর মতো ছোট্ট একটা মেয়ে নাক-মুখ ডুবিয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে, আর মায়ের হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছে। নুরুল চাচার কর্মস্থল রেস্তোরাঁটির জনারণ্য ছেড়ে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি জায়গায় কাঁচের দেয়ালের এপাশে বসে আমি ওপাশের মানুষ দেখছি। চুপচাপ বসে মানুষের গতিবিধি দেখতে সবসময় ভালো লাগে। কখনো কখনো আমার এমন হয় যে একদম কথা বলতে ভালো লাগে না, ভালো লাগে মানুষ দেখতে, মানুষের কথা শুনতে। তো, পরীর মতো মেয়েটা রাস্তা পার হয়ে এসে ঠিক আমার বরাবর কাঁচের দেয়ালের ওপাশে এসে দাঁড়ায়। নীল চোখজোড়া তাক করে মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। দেয়ালের এপাশে আমি ওপাশে নীল চোখের ছোট্ট মেয়েটি। সূর্যের নরম আলোয় মেয়েটি হীরের মত ঝলমল করছে। ওর মুখাবয়বজুড়ে ভেনিলা আইসক্রিম লেপ্টে আছে। বাইরে বেশ বাতাস, মেয়েটির সোনালি চুল উড়তে দেখে বুঝি। দেয়ালের কারণে বাতাসের স্পর্শ পাচ্ছিলাম না আমি। সাইকেলের অনর্গল ক্রিং ক্রিং শব্দ এসে কানে লাগে। বসার জায়গা থেকে উঠে সামনের দিকে মাথা ঝুঁকে দেখি একটা বাচ্চা ছেলে চার চাকার সাইকেল নিয়ে ছোট্ট মেয়েটির মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অনবরত হর্ণ বাজিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি সাইড ওয়াকে ওর পথের সামনে দাঁড়িয়ে তখনো মনোযোগ সহকারে নাক-মুখ ডুবিয়ে আইসক্রিম খেয়েই যাচ্ছে। আইসক্রিম মেয়েটির মনোযোগ এমনভাবে কেড়ে নিয়েছে যে চারপাশের চলমান কোন দৃশ্য ওর মনোসংযোগে কোনো ব্যাঘাত ঘটাতে পারছে না। অবশেষে মেয়েটির মা এসে হাত ধরে ওকে নিয়ে গেলে ছেলেটি সাইকেল চালিয়ে অবিরাম ছুটতে থাকে সামনের দিকে।

বাচ্চা দুটোর এমন মিষ্টি দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার চোখে যেন প্রেমময় ঘুম নামে। আমার দু’চোখের পাতায় বরিষ ধারার মতো স্মৃতির রেণু এসে ঠোঁট বুলাতে থাকে। ছোট্ট মেয়েটির আইসক্রিম খাওয়ার মতো সেদিন আমিও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মানবজমিন উপন্যাসের পাতায় ডুবে এলোমেলো পথ হাঁটছিলাম। ছোট্ট ছেলেটির মতো তমালের অনবরত টিং টিং সাইকেলের শব্দ বইয়ের পাতা হতে আমার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। গ্রামের রাস্তাটি এতই সরু ছিল যে আমি জায়গা ছেড়ে না দিলে ও সামনে যেতে পারবে না। ঘন্টি বাজাতে বাজাতে ক্লান্ত হয়ে তমাল আলতো করে আমার চুলের বেণি ধরে টান মারে। ঘাড় ফিরিয়ে দেখি ও আমার এত কাছে যে ওর ব্যাকুল নিঃশ্বাস এসে আমার কানের লতিতে লাগছে। আমরা দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, দিগন্তে ভুরভুর করছে হলুদ আলো। আউলবাউল বাতাস বইছিল জোরে। কাঁচা রাস্তার দু’ধারে শিমুল, কৃষ্ণচূড়া দুলছে। আমাদের দু’জনের মনের সমুদ্রে কথার ঢেউ গর্জন তুললেও ঠোঁটজোড়া পাথরের মত অবিচল হয়ে থাকে। নির্বিকার আমি ওকে পথ ছেড়ে দিই। তমাল আরো কিছু সময় নীরব দাঁড়িয়ে থাকে। হয়ত ওর ছোট বোনের হাতে আমার জন্য কয়েকদিন আগে পাঠানো চিঠির উত্তর প্রত্যাশা করছিল। ক্রমশ অন্ধকার ঘনিয়ে আসতে দেখে শিমুল- কৃষ্ণচূড়ার ছায়াঘেরা পথ ধরে সাইকেলের ঘন্টি বাজাতে বাজাতে তমাল নিরুদ্দেশের দিকে চলে যায়।

বাচ্চা ছেলেটার অনর্গল সাইকেলের ঘন্টি আজ কত কত বছর আগের কত কী যে মনে করিয়ে দিয়েছে। মানুষের জীবন আসলে একটি স্মৃতির বাক্স। রোজ টের পাই, স্মৃতিরা কতভাবে যে জীবনের অলিগলিতে ফুল হয়ে ফোটে, গন্ধ বিলায় নিভৃতে। স্মৃতির পিঠে চড়ে আরাম করে মানুষ পৌঁছে যায় শেষ গন্তব্যে। কিছুক্ষণ পর দেখি দেয়ালের ওপাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন সিগারেট খাচ্ছে। বাতাসে সে ছাই উড়ে এসে আমার পাশের দেয়ালে পড়ছে। একজনকে সিগারেটের ফিল্টারটা রাস্তায় ফেলতে দেখে আমি চোখ সরিয়ে নিই। আগের অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যটি আমাকে স্মৃতিকাতর করে তুললেও এ বিশ্রী দৃশ্যটি দেখতে ভালো লাগছিল না।

শরীরটা চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে নুরুল চাচার জন্য একইভাবে অপেক্ষা করছি। মানুষের কথার শব্দে মনে হয় রেস্তোরাঁর কাচের দেয়াল চুরচুর হয়ে ভেঙে যাবে। কথা কবে কে আবিষ্কার করেছে, জানি না। মানুষ যেন কথা ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। এরমধ্যে আমার পাশের টেবিলে এক দম্পতি বিবাদে লিপ্ত হয়, তাদের সন্তানকে বাথরুমে কে নিয়ে যাবে এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে। দু’জনের চোখ সন্তানের চেয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে বেশি উজ্জ্বল। আমার মাথা ভোমরার মত ভোঁ ভোঁ করতে থাকে। চোখ বুঁজে মন ভালো রাখার লোভে আমি এবার ভ্রমণ করতে চলে যাই স্তব্ধ, সুন্দর অনেক বছর আগের সে জায়গাটিতে, আমার ফেলে আসা গ্রামে। সবুজে আচ্ছাদিত গ্রামটির শরীরজুড়ে ছিল ফুল আর ফুল। গ্রামের সহজ মানুষগুলোর হৃদয় ছিল ফুলের মতো কোমল। ভুলতে পারি না সেদিনের কথা। স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পথে দেখি, আমার পিতামহ কাঁধের গামছা বিছিয়ে সূর্যমুখী ফুলের বাগানে বসে ধ্যান করছেন। উনি প্রায়শই তাঁর বয়সী কিছু সদস্যদের নিয়ে এমন ধ্যানে বসতেন। যাকে আমরা বলি এখন মেডিটেশন। তখন ধ্যান বলেই জানতাম। এ সময়টায় তাঁরা কেউ কারো সঙ্গে চোখাচোখিও করতেন না। তো, সেদিন কী মনে করে স্কুল হতে বাড়ি ফেরার বদলে আমিও তাঁদের সঙ্গে বসে পড়ি। দূর হতে তাঁদের কর্মকাণ্ড অনেকদিন ধরে দেখে দেখে আমার মুখস্থ ছিল। তাঁদের মত করে বসে চোখ বুঁজে রখার পরিবর্তে আমি চোখ মেলে সবাইকে দেখতে থাকি। কিছু সময় চোখ বুঁজি, আবার চোখ খুলি। এক পর্যায় এসে কখন যে আমিও তাঁদের মত চোখ বুঁজে পাহাড়ের মত স্থির হয়ে পড়ি, টের পর্যন্ত পেলাম না। এভাবে কতটা সময় কেটে গেছে মনে নেই। সূর্যের প্রখর উত্তাপ শীতল হয়ে পড়েছে। পিতামহের জোর ধাক্কায় চোখ খুলে মনে হলো, বিশাল ছায়াভরা গাছের নিচে নরম সবুজ ঘাসের বিছানায় ঠান্ডা বাতাসে ঘুমিয়ে পড়া আমি জেগে উঠেছি। সেদিন চুপ করে বসে থেকে আমি যে প্রশান্তি পেয়েছিলাম সারাক্ষণ কথা বলেও তা পাই নি আমি। এ রেস্তোরাঁয় বসে মানুষের কা কা চিৎকারে মনে হলো, এ যান্ত্রিক জীবনে বোধ হয় মানুষ চুপচাপ থাকার স্বাস্থ্যকর অভ্যাসটাই ভুলে গেছে। মানুষের মধ্যকার স্থিতি বিষয়টাই যেন হারিয়ে গেছে। ইটের দেয়ালের মাঝে বন্দী এ মানুষগুলো কী খোলা আকাশের নিচে যায়? গেলেও কী চোখ বুঁজে কিছুটা সময় নিজের সঙ্গে কাটায়? কিংবা ঠান্ডা বাতাসে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর সঙ্গে হেলেদুলে দোল খায়? প্রজাপতি কেমন করে গাছের আড়ালে সবুজে মিশে যায়? ওঁরা কী জানে কাঠবিড়ালি কেমন করে বুনোফল নিয়ে খেলে? না কী রেস্তোরাঁয় বিবাদে লিপ্ত ওই দম্পতির মত সারাক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে ধাক্কা খায়? কে জানে। প্রযুক্তির ভিড়ে মানুষের এমন হারিয়ে যাওয়া আমার কাছে বিস্ময়কর লাগে।

ইতোমধ্যে ক্ষুধা এবং পিপাসা দুটোই লাগছে আমার। ভিড় ঠেলে নুরুল চাচার কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম –

– আজ কী সময় হবে চিঠি লেখার জন্য?
– জ্বি, মা।
– আর থাকা তো সম্ভব হবে না।
– এখনই আসছি, মা।

চাচা তাঁর জায়গায় অন্য একজনকে রেখে আমাকে নিয়ে রেস্তোরাঁর উপর তলায় চলে এলেন। মাঝেমধ্যে এখানে বসে চাচার চিঠি লেখার সুবাদে পরিপাটি করে রাখা এ জায়গাটি আমি চিনি। দু’টো চেয়ার টেনে আমরা বসলাম। নুরুল চাচাকে বেশ ক্লান্ত এবং ঘামছেন দেখে ঠান্ডা পানিতে হাতমুখ ধুতে বাথরুমে পাঠিয়ে দিই। তাঁর একটা কিডনি কাজ করছে না, এরমধ্যে ডায়াবেটিসও আছে। এমতাবস্থায়, এ ভিনদেশে একাকী থাকেন। বড় মন কাঁদে তাঁর জন্য। রেশমা চাচির চিঠিটি হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছি। চাচির চিঠি পড়ে দেয়া, এবং চাচার চিঠি লিখে দেয়া আমার কাজ।

নুরুল চাচা এবং রেশমা চাচির বিয়ের ঘটনা সিনেমার গল্পের মত। মামার বাড়িতে বেড়ে উঠা এতিম রেশমা চাচি প্রেমে পড়েছিল রিক্সা ড্রাইভার নুরুল চাচার সঙ্গে। রেশমা তখন নবম শ্রেণীর ছাত্রী। নানান প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে পড়াশোনা করছেন। একদিন স্কুল শেষে গাড়ি-রিকশার হট্টগোল ঠেলে বাসায় ফেরার পথে অচেনা একটা ছেলে তাঁর উড়না টেনে নিয়ে যায়। আতঙ্কিত রেশমা চোখ ঘুরিয়ে দেখে ছেলেটি হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রেশমা ভয়ে দৌড়াতে থাকলে ছেলেটিও পিছু নেয়। একসময় ছেলেটি রেশমার সামনে পথ আগলে দাঁড়ায়। বাঁচাও, বাঁচাও বলে রেশমার আর্তচিৎকারে সেদিন গিজগিজ করা মানুষের ভীড় হতে কেউ তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসে নি, এগিয়ে এসেছিল নুরুল চাচা। ছেলেটির হাত থেকে রেশমা চাচিকে বাঁচাতে গিয়ে সেদিন ছুরিকাঘাতে নুরুল চাচার হাত অনেকখানি কেটে যায়। ফিনকি দিয়ে ছুটে আসা রক্তের ফোঁটায় রেশমা চাচির গাল-মুখ ভেসে যায়। ছেলেটি পালিয়ে যাওয়ার পর চাচা রাস্তার উপর পড়ে গোঙাতে থাকে। সে মুহূর্তে কিছু পরোপকারী লোকজন এসে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কাটা জায়গায় সেলাই করতে হয়। আগে চেনাজানা থাকলেও হাসপাতাল হতে তাঁদের প্রণয় শুরু হয়। এ খবর জানাজানি হলে মামার বাড়ির আশ্রয় হারিয়ে রেশমা চাচির আশ্রয় হয় নুরুল চাচার কাছে। অতঃপর, তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হোন। বিয়ের পর দু’জন সুখে শান্তিতে সংসার করছিল। টারজান ভিসার ফাঁদে পড়ে তাঁরা দু’জন আজ পৃথিবীর দু’প্রান্তে। প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে তাঁরা নিয়মিত ফোনে কথা বললেও বছরের বিশেষ দিনগুলোতে একে অপরের কাছে চিঠি লেখেন। একে অন্যের স্পর্শের জন্য এমন আকুলতা আগে কখনো আমার জানা হয় নি। চিঠির মতো জড়ো পদার্থকে স্পর্শ করে রেশমা চাচি কতটা আকুল হোন, তাঁর চিঠি পড়ে বুঝতে পারি। নুরুল চাচা পড়তে, লিখতে পারেন না। রেশমা চাচির ইচ্ছেতেই আমি চাচার চিঠি লিখে দিই।

চাচা ফ্রেশ হয়ে এলে আমি চাচির চিঠি পড়তে শুরু করি।

প্রিয়তম,
পত্রের শুরুতে আমার অন্তরের অন্তঃস্থল হতে ভালোবাসা নিও। তোমার শরীর কেমন আছে? তোমার শারীরিক, মানসিক অবস্থা ভেবে চিন্তা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তুমি শারীরিকভাবে আমার থেকে দূরে রয়েছ ঠিক, কিন্তু মানসিকভাবে সবসময় আমার সঙ্গেই লেপ্টে আছো। আমার নিঃশ্বাসের চঞ্চল বনে তুমি সদা বুলবুল হয়ে উড়ো। কান পেতে প্রতি সূর্যদয়ে ইথারে ভেসে আসা তোমার গান শুনে আমার দিনের শুরু হয়। ক্লান্ত দুপুরে পুকুরের শান্ত জলে স্নান করতে গিয়ে আমি তোমার মুখ দেখতে পাই। তোমার মুখ দেখতে দেখতে জলের পাখায় চড়ে আমি যেন উড়তে থাকি ধবধবে আকাশে। নিরিবিলি বিকেলের উতল হাওয়ায় শিমুল গাছের ডালে ফুলের রঙে তোমার চোখের তারা জ্বলতে থাকে আমার চোখে। আমি তখন তোমার নাম লিখে দিই হাওয়ার শরীরে, ফুলের রঙে। শীতল সন্ধ্যায় তোমার হাতে লাগানো শেফালি গাছ হতে যখন ঝুরঝুর করে সাদা ফুল ঝরতে থাকে তখন আমার দু-চোখ ভেঙে ঘুম নামে। রাতভর তোমার গায়ের ঘ্রাণ এসে লাগে আমার নাকে। ঘুমের ঘোরে দেখি তুমি আমায় রিক্সায় বসিয়ে টানছো দিগন্তের দিকে। তোমার বুকের গন্ধে দোল খেতে খেতে আমার পুলক জাগে। আমার ভাবনার চৌহদ্দিতে তুমি সর্বদা বিরাজমান সে প্রথম দিনের মতো। শিলা এবং নাবিল তোমার দোয়া এবং মমতায় ভালো আছে। ওদের পড়াশোনা ঠিকঠাক চলছে। একদম চিন্তা করবেনা। তোমার যত্ন, স্নেহের লয় আমাদের বুকে অহর্নিশি প্রতিধ্বনিত হয়। তুমি সবসময় আমাদের সঙ্গেই আছো। শরীরের যত্ন নিও। ডাক্তারের কাছে যেও। তোমার ফেরার অপেক্ষায় আমরা দিন গুনছি। ভালো থেকো।
ইতি, তোমার রেশমা।

পড়া শেষে চিঠিটি নুরুল চাচার হাতে দিই। চিঠিটা উনি বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেন একবার, আরেকবার চিঠির গায়ে হাত বুলাতে থাকেন। এ দৃশ্যটি পুনঃপুনঃ চলতে থাকে। এ সময় তাঁর ঠোঁটজোড়া থরথর কাঁপতে থাকে, উজ্জ্বল চোখজোড়া আনন্দে চিকচিক করে। এ স্বর্গীয় দৃশ্যটি আমার বহুদিনের চেনা।

দেয়ালঘড়িটির দিকে তাকিয়ে তাড়া দিই চিঠির উত্তর লেখার জন্য। অরিনকে স্কুল হতে আনতে যেতে হবে যে। স্কুল ছুটির পর যেতে একটু দেরি হলে মেয়েটা মনমরা হয়ে চারদিকে আমাকে খুঁজতে থাকবে।

– আজ কত তারিখ মা?
– মে মাসের তিন তারিখ।
– এ চিঠিটি জুন মাসের ষোল তারিখের মধ্যে পৌঁছাবে তো?
– হ্যাঁ, চাচা।

আমাদের কথোপকথনের মধ্যেই রেস্তোরাঁর ম্যানেজার হুংকার ছেড়ে চাচার নাম ধরে ডাকতে থাকে। অরিনকে স্কুল থেকে এনে বাসায় রেখে বিকেলে চিঠি লিখে দেব, এ বলে তাঁকে আশ্বস্ত করে কাজে ফিরে যেতে বললাম। বেরিয়ে আসার সময় দেখি তাঁর শরীর পুনরায় দরদর ঘামছে, কাঁপছে, চোখে পানি। তাঁর এহেন শোচনীয় অবস্থা দেখেও ম্যানেজারের গর্জন থামছে না। বাবার বয়সী একজন বয়োবৃদ্ধকে ছেলের বয়সী একজনকে এভাবে শাঁসাতে দেখে বুকটা ভারি হয়ে আসে। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় এ ভিনদেশে নুরুল চাচার মত মানুষগুলো কম অর্থের বিনিময়ে সবচেয়ে বেশি খেটেও মানুষের লেবাসধারী অমানুষগুলো হতে প্রতিনিয়ত লাঞ্চিত হয়। খুব ইচ্ছে হয়েছিল সুটেড বুটেড ভদ্র ম্যানেজার বেশধারী অভদ্র লোকটাকে দু’টো কথা বলি। আমার কথার জন্য যদি চাচার চাকরি চলে যায়? এ ভয়ে কিছু না বলে পিছিয়ে পড়ি। বুকের গহীনের দীর্ঘশ্বাস নীরবে নিঃসীম শূন্যে উড়িয়ে দিই।

আমার বাসা হতে এক বাড়ি পরে নুরুল চাচার বাসা। বাসার প্রবেশমুখে যেতেই ডিম ভাজার ঘ্রাণ নাকে লাগে। ভেতরে গিয়ে দেখি কাঁপা কাঁপা হাতে চাচা ডিম ভাজছেন। তাঁর শারীরিক অবস্থা আমার কাছে পূর্বের মতোই মনে হলো। মাথায় হাত দিয়ে দেখি জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। আমি ঘাবড়ে গিয়ে এম্বুলেন্স ডাকতে চাইলাম, উনি বাঁধা দিলেন। চিঠির উত্তর লেখার জন্য তাড়া দিলেন। আপনার শরীর খুব খারাপ, ডাক্তার দেখানো জরুরি, যতই অনুনয় করে বললাম, শুনলেন না। চিঠি লেখা ছাড়া যেন জগতে তাঁর আর কোন কাজ বাকি নেই। আমি কাগজ কলম নিয়ে বসলাম। দূরন্ত বাতাসে জানালার পর্দা দুলছে। চাচার বিছানার পাশে রাখা বেলি ফুলের টব হতে ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে ঘরময়। চাচা বলছেন, আমি লিখছি।

প্রিয়তমা রেশমা,
তোমার চিঠি একরাশ উষ্ণতা নিয়ে এলো। ভালোবাসতে পারা এবং ভালোবাসা পাওয়া বড় ভাগ্যের বিষয়। আমি একজন ভাগ্যবান মানুষ, তোমাকে ভালোবেসেছি, এবং তোমার ভালোবাসা পেয়েছি। এ জীবনে আর কোনো দুঃখ নেই। পৃথিবীর পথে পথে কত মুখ দেখলাম, তোমার মুখের মত অন্য কোন মুখ আর আমার চোখের মণিতে স্থায়িত্ব পায়নি। তুমি আমার জীবনের ফুল। তোমাকে ভাবলেই বুকের ভেতর আমাদের প্রিয় বেলি ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। তোমার সমুদ্রসম হৃদয়ের ভালোবাসায় হাজার মাইল দূরে থেকেও ভালো আছি। জেনে খুশি হবে যে, আজকাল আমি আর অন্ধকারে ভয় পাই না। অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলে আমি একান্তে তোমার হাত ধরে হাঁটি, গল্প করি। আমাদের বাগানে প্রস্ফুটিত শিলা ও নাবিল, ওদের সুন্দর জীবনের স্বপ্নে বিভোর আমি তীরহীন নীল জলরাশিতে রাতদিন সাঁতরেও ক্লান্ত বোধ করি না। আমাদের জীবনের কোনো ক্ষত যেন ওদেরকে কভু স্পর্শ না করে। আমার বুকের দেয়ালে দিনরাত্রি তোমাদের ছবি আঁকি। অনেক বছর পেরিয়েছে তোমাদের দেখিনা। বাচ্চা দুটোর স্পর্শের জন্য কী যে তৃষ্ণা এ বুকে, বলে কিংবা লিখে ভাষায় বুঝাতে পারবোনা। এখানে ফুলে রঙ লেগেছে, বসন্ত হাওয়া বইছে। মধু ফুলে মৌমাছি উড়ছে, ফুলগুলো হেলেদুলে বাতাসে দুলছে। এমন দিনে ইচ্ছে করে তোমার সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে ঘুড়ি উড়াতে। যেদিন আমাদের দেখা হবে, আমার আপাদমস্তকজুড়ে তোমাদের শুধু খুঁজে পাবে। প্রার্থনায় রেখো যেন খুব দ্রুত ফিরে আসতে পারি তোমাদের কাছে। শিলার ডাক্তারি পড়া শেষ হলেই আমি চলে আসবো। তোমাদের নিঃসঙ্গ করে আর দূরে যাব না। আমার ছায়ায় তুমি দুলবে, আমি মুগ্ধ হয়ে তোমাকে দেখবো। আমি নিয়তিতে বিশ্বাস করি। নিয়তি যেমন আমাদেরকে বেঁধে দিয়েছে, তেমনি নিয়তিতে থাকলে আবার দেখাও হবে তাড়াতাড়ি। আমার সকল অনুভূতিজুড়ে তুমি, আমার জীবনের ভালোবাসায় তুমি। জেনো, দূরে থেকেও তোমাদের ছায়ায় আমি মিশে আছি।  শিলা, নাবিলকে বুকে জড়িয়ে ভালো থেকো, আনন্দে থেকো সবসময়।
ইতি, তোমার ছায়াসঙ্গী।

চিঠি লেখা শেষ করে কিছু সময় চুপচাপ বসে থাকি৷ বেলি ফুলের টবের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, ফুলের সুবাস যদি ব্লটিং পেপারের মত চাচার সমস্ত হাহাকার শুষে নিয়ে যেতো। বুকের উপর যেন একটা ভারি পাথর চেপে বসেছে। নুরুল চাচার কান্নার শব্দে সম্বিৎ ফিরে পাই। উনি চিঠির ভাঁজে ভাঁজে বেলি ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিচ্ছেন, আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তাঁর শরীরের তাপ আগের চেয়েও বেড়েছে। হাত ধরে তাঁকে বিছানায় শুইয়ে কিছু সময় মাথায় জলপট্টি দিলাম। সামান্য খাবার খাইয়ে জ্বরনাশক ওষুধ খাওয়ালাম। উনি চোখ বুঁজলে আরো কিছু সময় মাথার পাশে বসে কপালে, চুলে হাত বুলিয়ে তাঁর ঘর হতে বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তায় নামতেই টের পাই, আমার শরীর ফুঁড়ে যেন আমার বাবার গন্ধ বের হচ্ছে। বাড়ির সামনের বোবা গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে নুরুল চাচার মতো আমিও অঝোরে কাঁদলাম। চোখ মুছে দেখি, সবুজ পাতার ফাঁকফোকর গলে একটা গাঢ় রঙের লাল আভা আমার গায়ে এসে পড়েছে। জমিনের সবুজ আর আকাশের লাল রঙের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে আমার দেশ এবং পতাকার কথা। আমি, নুরুল চাচা, আমরা দেশ ছেড়ে জীবনের প্রয়োজনে যত দূরেই থাকি না কেনো দেশ সদা আমাদের বুকের গহীনে নীরবে শুয়ে থাকে পরম আদরে।

রাত তখন দশটা বাজে। বারান্দার গ্রিল ধরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি। এম্বুলেন্সের গগন বিদারী সাইরেনের শব্দ শুনি। এ শব্দে সবসময় ভয়ে আমার বুক কেঁপে ওঠে। বাইরের দিকে মাথা বের করে দেখি, এম্বুলেন্স নুরুল চাচার বাসার সামনে গিয়ে থেমেছে। আমার হাত-পা অবশ হয়ে আসে। তড়িঘড়ি রুমে এসে চাচার মোবাইল নম্বরে কল করি। তাঁর রুমমেট ফোন ধরে জানালেন, ‘নুরুল ভাই শ্বাসকষ্টের জন্য কথা বলতে পারছেন না। তাঁকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে।’ এই খবরটি যেন আমার গলা চেপে ধরেছে, আমি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে ঘামতে থাকি। আমার পাথর চোখে তখন পলক পড়ছিল না, জলও আসছিল না।

গোটারাত চোখের পাতা এক করতে পারলামনা। বুকটা পুড়ে যেতে থাকে। সকালে মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে হাসপাতালে ছুটে যাই। হাসপাতালের শান্ত আর নির্জন কক্ষে ঢুকে দেখি, দুধ সাদা কাপড়ে আপাদমস্তক জড়িয়ে নিঃসঙ্গ নুরুল চাচা অনিঃশেষ ঘুমের ভেতর তলিয়ে আছেন। যেন পৃথিবীর কাছে তাঁর আর কোনো প্রত্যাশা নেই, নেই কোন আকাঙ্খা। অথচ, কয়েকঘন্টা আগেও এ মানুষটি পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল। মহাকালের বুকে, প্রকৃতির কাছে মানুষ কত অসহায়, কত ক্ষুদ্র। মানুষের স্বপ্নগুলো এক তুচ্ছ ধূলিকণার মতো পৃথিবীর বাতাসে উড়তে থাকে অনন্তকাল ধরে।

শেষবারের মতো চাচার বুকের কাছে ঝুঁকে দেখি, অখন্ড স্তব্ধতায় তাঁর বুকের উপর রোদ এসে যেন ঋষির মতো ধ্যান করছে, বাতাস এসে কপালে চুমু খাচ্ছে। প্রকৃতি তাঁকে অপার মমতায় কোলে তুলে নিয়েছে।

হাসপাতাল হতে বেরিয়ে নুরুল চাচার দেয়া হলুদ এনভেলপটি বুকের সঙ্গে ধরে, তাঁর মতো করে হাত বুলাতে বুলাতে পোস্ট অফিসের পথে হাঁটতে থাকি। বৃষ্টি ঝরছে না কোথাও, তবুও আমি একটা অন্যরকম চিঠি হাতে হাঁটছি আর ভিজে যাচ্ছি। আমার মাথার উপর দিয়ে চক্রাকারে একঝাঁক পাখি উড়ে যায়। ওদের কিচিরমিচির শব্দে আমি যেন স্পষ্ট শুনতে পাই, বাড়ি যাব, বাড়ি যাব, বাড়ি যাব…। ইট কংক্রিটের পথ ধরে সকলে ছুটছে, আমিও ছুটছি সামনের দিকে। কেউ কারো দিকে তাকায় না। এ শহরের কোথাও যেন আর স্নেহের ছোঁয়া নেই, ছায়া নেই। সূর্যটা ঠিক মাথার উপরে। রোদের কাঁচা হলুদ রঙ ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। এমন উজ্জ্বল দিনে জমিনে পড়া আমার ছায়াটা আমার কাছে ধূসর ঠেকে।


পলি শাহীনা। সাহিত্যিক। প্রধানত ছোটগল্পকার। জন্ম ৪ জুন, নোয়াখালী। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ তৈরি হয় ছোটবেলায়। স্কুলে পড়ার সময় লেখালেখির সূচনা। দেশ-বিদেশের পত্রপত্রিকা ও অনলাইন সাহিত্যম্যাগাজিনে লিখছেন। প্রকাশিত বই : গভীর জলের কান্না (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৬); হৃৎকথন (স্মৃতিগদ্য, ২০১৯); ধূসর নির্জনতা (ছোটগল্প, ২০২১); হৃদয় এক অমীমাংসিত জলছবি (ছোটগল্প, ২০২৩); বৃত্তের বাইরে (ছোটগল্প, ২০২৪), না জীবন না মৃত্যু (ছোটগল্প, ২০২৬)। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বাস করছেন। যুক্ত আছেন ‘সাহিত্য একাডেমি নিউইয়র্ক’-এর সঙ্গে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *