সাহিত্য

ফুটির মা’র গল্প । আহমদ সায়েম

শেয়ার করুন:

রাত তখন ঠিক ৩টা ১৩। মোবাইলের স্ক্রিনে হালকা নীল আলো জ্বলছিল। একটা নোটিফিকেশন এলো—
“Target Locked.”

রবিন প্রথমে ভেবেছিল, এটা হয়তো কোনো গেমের আপডেট। কিন্তু সে তো অনেকদিন হলো গেম খেলে না।

সে লেখালেখিই করে।
ডেলাওয়্যার নদীর কাছাকাছি একটা শহর—ফিলাডেলফিয়া। শহরের এক কোণে ভাড়া করা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসে সে লেখে। জানালার বাইরে দূরের ব্রিজের আলো, আর তার নিচে কালো নদীর জল। মাঝেমধ্যে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হয়—এই পৃথিবীর যত নীরবতা আছে, তার একটা অংশ হয়তো এই পানির ভেতরে জমে থাকে।

সেই নীরবতার ভেতরেই সে লেখে— প্রযুক্তি নিয়ে, নজরদারি নিয়ে, মানুষের ভঙ্গুরতা নিয়ে।

কিছুদিন আগে সে একটা লেখা দিয়েছিল অনলাইনে। শিরোনাম ছিল— ডিজিটাল ট্রিগারের যুগ।

লেখাটায় সে লিখেছিল—

“এখন কাউকে খুঁজে বের করতে হয় না।
হত্যা করতে হলে দরজায় কড়া নাড়তে হয় না।
ভুল মানুষ মরার সম্ভাবনাও কম।
একটা সিগন্যাল, একটা কোড, একটা ড্রোন—
সব শেষ।”

এই কথাটাই ছিল লেখাটার মূল ভাবনা।

লেখাটা কয়জন পড়েছে— সে জানে না। তার ধারণা, খুব বেশি মানুষ পড়ে না তার লেখা। মোটকথা, লেখাটা ভাইরাল হয়নি।

তবু কেউ একজন লেখাটা পড়েছিল— আজকের এই নোটিফিকেশন দেখে তার সেটাই মনে হলো।

পরদিন সকাল।

রবিনের অফিসে যেতে হয় না। সে একটা কনটেন্ট কোম্পানির জন্য কাজ করে। লগ-ইন, এন্ট্রি, কাজ আপলোড, লগ-আউট—এইসবই তার অফিস।

মানুষের সঙ্গে খুব একটা দেখা করার প্রয়োজন পড়ে না। কোনো কণ্ঠ শোনা হয় না। শুধু টাস্ক নম্বর।
মাঝেমধ্যে রবিন ভাবে— সে কি সত্যিই একজন মানুষ, নাকি একটা ফাংশন?
এই প্রশ্নটা তার মাথায় আসে আরেকটা স্মৃতি থেকে।

ছোটবেলায় মা কিংবা ফুফু যখন মুখে তুলে ভাত খাওয়াতেন, তখন দ্রুত খাওয়ার জন্য একটা ভয় দেখানো হতো—
ফুটির মা আইব। যে বাচ্চারা ভাত খায় না, ফুটির মা তাদের ধরে নিয়ে যায়।

এই কথা শুনলেই আমরা ভয় পেতাম। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করতাম।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো— রবিন কোনোদিন ফুটির মাকে দেখেনি।
তবু তিনি কাজ করতেন।
একটা অদৃশ্য ভয়। একটা অদৃশ্য চরিত্র। একটা ফাংশন।
আজ রবিনের মাঝে মাঝে মনে হয়— সে নিজেও হয়তো তেমনই এক ফাংশন হয়ে গেছে।

সেদিন লগ-ইন করতে গিয়ে সে দেখল— পাসওয়ার্ড কাজ করছে না।
ইমেইলে একটি মেসেজ।
“Your access has been suspended due to policy violation.”

কোন পলিসি? কোন ভায়োলেশন?
কেউ কিছু জানাল না।
এখন অনেক বড় বড় কাজও কাউকে কিছু না জানিয়ে হয়ে যায়।

ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে এসে বলে— “এই তোমাদের বউমা।”
মেয়ে বিয়ে করে ছেলে নিয়ে এসে বলে— “মা, বাবা—ওকে আমি বিয়ে করেছি।”

মতের অমিল হলে এক দেশের সরকার আরেক দেশের নেতাকে মেরে ফেলছে।
সবকিছু যেন এখন ডালভাতের মতো সহজ।

দুপুরে দরজায় কড়া নাড়ল না কেউ। বরং জানালার বাইরে, একটা অদ্ভুত ভনভন শব্দ।
রবিন পর্দা সরাল।

ছোট্ট একটা ড্রোন।
চোখের মতো একটা কালো লেন্স, তার দিকে তাকিয়ে আছে।
তার বুকের ভেতর কেমন যেন একটা শব্দ উঠল।

হঠাৎ তার মনে হলো— তার লেখার কথাগুলো যেন বাস্তবে চরিত্র পেয়ে গেছে।
সে লেখাটা লিখেছিল একটা ধারণা থেকে। দেশের একেবারে ব্যক্তিগত একটা ঝামেলার কথা মনে রেখে লিখেছিল।

কিন্তু সামনে ড্রোনটা দেখে তার মাথায় নানা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল—
কেউ কি আমার লেখা পড়ছে? না কি আমাকে ফলো করছে? না কি আমার ধারণাটাকেই পরীক্ষা করতে এসেছে?

এইসব ভাবতে ভাবতে সে স্থির হয়ে বসে রইল।

মোবাইলে আবার নোটিফিকেশন এলো।
“Final Warning.
Cease dissemination of destabilizing narratives.”

রবিন হেসে ফেলল।
তার গল্প, তার শব্দ— এত শক্তি রাখে?
সে ল্যাপটপ খুলল। ড্রোনটা এখনো জানালার সামনে স্থির।

তার ভেতরে হয়তো বিস্ফোরক আছে। হয়তো শুধু ক্যামেরা। হয়তো দুটোই।
সে লিখতে শুরু করল।

“আমি জানি,
আমি যা করি—যা লিখি—সবই তোমরা দেখছ।

আমি এটাও জানি, তোমরা দূরে বসে একটা বোতাম টিপলেই সব শেষ করে দিতে পারো।
কিন্তু একটা কথা মনে রেখো— মানুষ তার ভুল নিয়েই মানুষ।

তোমার কাছে আমার কথা ভুল মনে হতে পারে। আমার কাছেও তোমার কাজ ভুল মনে হতে পারে।
তার জন্য কি একজন আরেকজনকে মেরে ফেলবে?

মতের অমিল তো আসলে একটা সুযোগ।
সেখান থেকেই নতুন ধারণা জন্মায়। সেখান থেকেই গবেষণা এগোয়। চোখ লাল না করেও হাজার কাজ করা যায়।

আমি যেমন— কোনো মানুষের সঙ্গে দেখা না করেই তাদের কাজের সমাধান দিয়ে যাচ্ছি।
তাদের সব মতের সঙ্গে কি আমার মত মেলে?
মেলে না।

কিন্তু সেই ভিন্ন মতই আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
যদি পৃথিবীর সবাই আমার মতো হতো— তাহলে আর কারও প্রয়োজন থাকত না।

আমার বাবা আমার মতো না। আমার ভাই-বোন আমার মতো না। বন্ধুরাও না।
তবু আমরা একসাথে থাকি।

কারণ কিছু মিল আছে— আর অনেক অমিল।
এই অমিলটাই মানুষকে মানুষ করে।

একজন মানুষকে মুছে ফেলা সহজ।
কিন্তু তার প্রশ্ন, তার মত, তার ভালো লাগা—

এসব কি মুছে ফেলা যায়?”

তার আঙুল কাঁপছিল না।
অদ্ভুতভাবে শান্ত ছিল সে।

সে লাইভে গেল।
স্ক্রিনে নিজের মুখ ভেসে উঠল— চোখে ক্লান্তি, তবু এক ধরনের স্থিরতা।

সে বলল—

“যদি আজ আমি না থাকি,
তবে বুঝে নিও—

প্রযুক্তি কখনো নিরপেক্ষ না।
এটা যার হাতে থাকে, তার নৈতিকতার ছায়া নিয়েই বাঁচে।

আমাদের ভয় পেতে নেই।
আমরা আমাদের মত বলব। আমরা লিখব। লিখতেই হবে।”

ড্রোনের লেন্সের ভেতর
এক মুহূর্তের জন্য লাল আলো জ্বলে উঠল।

রবিন চোখ বন্ধ করল না।

. . .

 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *