সাহিত্য

ব্লকেইড : অহিংস প্রতিরোধের পূর্বাপর ।। আশরাফুল ইসলাম আরিফ

শেয়ার করুন:

সম্প্রতি আবারও আলোচনায় এসেছে রিচার্ড টেইলর রচিত ‘ব্লকেইড’ বইটি। কীভাবে একটি অহিংস উপায় অবলম্বন করে অন্যায়ের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল কতিপয় মানবতাবাদী বিশ্বনাগরিকের উদ্যোগে, সেই বীরত্বব্যঞ্জিত গল্পটিই বলা হয়েছে এই বইতে। এই বইয়ের পূর্ণ শিরোনাম ‘ব্লকেইড : অ্যা গাইড টু ননভায়োলেন্ট ইন্টার্ভেনশন’।

প্রথমেই এই বইয়ের চিত্তাকর্ষক যে-অংশটি সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর কাছে গরিমার উপলক্ষ হয়ে এসেছে, সেই অংশটির কথা বলা যাক। ক্রমশ। গল্পটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাম্প্রতিক উজ্জীবন, জড়িয়ে আছে যেমন মহান মুক্তির এক অবিস্মরণীয় লড়াই, আছে এক বিশ্বনাগরিকা বাংলাদেশী সুলতানা আলমের পরিবার ও অবদান, আছে তাঁর উত্তরপ্রজন্মের আন্তর্জাতিক ফুটবলকৃতিত্ব।

‘ব্লকেইড’ বইটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এবার এক অনন্য গর্বের উপলক্ষ ঘিরে এই আলোচনার শুরু। সুলতানা আলমের নাতিদের অসাধারণ ফুটবলকৃতিত্ব যেন নতুন করে আলো ফেলে বইটির মানবিক ইতিহাসের ওপর। তাদের সাফল্য শুধু একটি নির্দিষ্ট পরিবারের নয়, পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য সন্দেহাতীতভাবে এ এক গৌরবময় অর্জন।


সুলতানা আলমের কীর্তিমান নাতিদের তালিকাটি দীর্ঘ। কুইন সুলিভান, রোনান সুলিভান, ডেকলান সুলিভান ও ক্যাভান সুলিভান। এই চারজন। এদের প্রতিভা ও পরিশ্রমের বলে ইতোমধ্যেই ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলেছে এরা প্রত্যেকেই। বিশেষ করে রোনান সুলিভান ও ডেকলান সুলিভান অনূর্ধ্ব-২০ বাংলাদেশ দলের হয়ে সাফ গেমসে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাদের এই অর্জন যেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্পকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

‘ব্লকেইড’ বইটির লেখক রিচার্ড টেলর ছিলেন ফিলাডেলফিয়ার কোয়েকার গ্রুপের এক নিবেদিতপ্রাণ মানবতাবাদী নেতা। তিনি আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর আদর্শ ও কাজ আজও অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে। তাঁর সহধর্মিণী ফিলিস টেলর এখনও সেই মানবিক পথচলাকে ধরে রেখেছেন অক্লান্ত নিষ্ঠায়।

গত বছরের ফিলাডেলফিয়া বইমেলায় তাঁর উপস্থিতি ছিল এক গভীর আবেগঘন মুহূর্ত। তাঁর কণ্ঠে স্মৃতিচারণা ও অভিজ্ঞতার বর্ণনা মেলায় সমবেত সবাইকে স্পর্শ করেছিল হৃদয়ের গভীরে।

অনেকের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও বইটি তখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে প্রফেসর ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদের আন্তরিক উদ্যোগে ফিলিস টেলর সরাসরি প্রকাশকের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুনর্মুদ্রণের ব্যবস্থা করান। প্রকাশকের শর্ত ছিল অন্তত ৫০ কপি অর্ডার করতে হবে। এতসংখ্যক বই বিলি-বিক্রি কী করে হবে? এমন পরিস্থিতিতে প্রফেসর ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ দ্বিধাহীনভাবে এগিয়ে আসেন। পরবর্তীকালে তিনি বইগুলো সংগ্রহ করে কমিউনিটির অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের মধ্যে বিতরণ করেন, যা ছিল এক অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিবান্ধব অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।

বইটির মূল মর্ম হলো, ১৯৭১ সালে পূর্ববাংলায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নৃশংস গণহত্যার সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সেই অন্যায় নিধনকাণ্ডে সমর্থনের বিরুদ্ধে কিছু সাহসী আমেরিকান নাগরিক ও বাঙালি একত্রিত হয়ে কীভাবে অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন।

‘ব্লকেইড’ বইটিতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে এই আন্দোলনকারীরা ক্যানো ও কায়াক নিয়ে ‘নন-ভায়োলেন্ট ফ্লিট’ তৈরি করে পূর্ব উপকূলের বন্দরগুলোতে পাকিস্তানি জাহাজ চলাচল প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং নীতিগত পরিবর্তন আনা।

এই বইটি লিখেছেন রিচার্ড কে. টেইলর, যিনি নিজেও এই আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ফলে বইটিতে ঘটনাগুলো অত্যন্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ বর্ণনার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

‘ব্লকেইড’ শুধু একটি বই নয়—এটি মানবতা, সাহস, নৈতিকতা ও বিবেকের এক জীবন্ত দলিল। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীর যেখানেই হোক, কিছু সৎ, সাহসী ও নিষ্ঠাবান মানুষের হাত ধরেই ইতিহাস নতুন করে রচিত হয়।


আশরাফুল ইসলাম আরিফ

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *