প্রখ্যাত কানাডীয় লেখক ইয়ান মারটেলের জন্ম স্পেনের সালামাঙ্কায়, ১৯৬৩ সালের ২৫ জুন। আলাস্কা, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কোস্টারিকা, ফ্রান্স, অন্টারিও, মেক্সিকো এসব জায়গায় তার শৈশব কেটেছে, বড় হয়েও ভ্রমণের নেশা তার কাটেনি। ভারত, ইরান, তুরস্কে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। পড়াশোনা করেছেন দর্শন বিষয়ে। তার লেখায়, ঐতিহ্য ও দর্শন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার গল্পসংগ্রহ ‘দ্য ফ্যাক্টস বিহাইন্ড দ্য হেলসিংকি রোকামাশিয়স’, ১৯৯৬ সালে প্রথম উপন্যাস ‘সেলফ’। ‘লাইফ অফ পাই’ উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কার পেয়েছেন ২০০২ সালে। আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার এই উপন্যাসটি কমপক্ষে ৫০ দেশে অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। সারাবিশ্বে বিক্রি হয়েছে ১২ মিলিয়নের চেয়েও বেশি কপি। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর বেস্টসেলার তালিকায় উপন্যাসটি বছরভর অবস্থান করেছিল। পরে উপন্যাসটি নিয়ে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়, সেই চলচ্চিত্রটি সেরা পরিচলক সহ চারটি বিভাগে অস্কার লাভ করে। ‘লাইফ অফ পাই’ উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে তিনি ভারতের বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের উপাসনালয় আর চিড়িয়াখানাগুলিতে গিয়েছেন, দীর্ঘ সময় ধরে নানারকমের ধর্মীয় গ্রন্থ ও লোককাহিনি পাঠ করেছেন। জীবনাভিজ্ঞতার সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্য আর দর্শনের ব্যবহার উপন্যাসটিকে সারাবিশ্বের পাঠকের কাছে পরিচিত করে।
ইয়ান মারটেলের এই ছোটো সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন আনা মেটকাফ, ২০০৭ সালের ১৩ অক্টোবর ফাইন্যানসিয়াল টাইমস-এ অল্পকথার আলাপ বিভাগে সেটি ছাপা হয়।

আনা : আপনার পাঠক কারা?
ইয়ান মারটেল : যারা খুব অলস আর অদ্ভুত ধরণের কৌতূহলী।
আনা : সর্বশেষ কোন বইটি পড়ে গভীর আনন্দে হেসে উঠেছিলেন?
ইয়ান মারটেল : জোনাথন স্যাফ্রোন ফোয়েরের ‘এভ্রিথিং ইজ ইলুমিনেটেড’ বইটি দারুণ লেগেছিল। উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতেও চরিত্রদের দিয়ে যে অবিশ্বাস্য রকমের রসিকতা করানো যায় সেই ক্ষমতা দেখে হেসে উঠেছিলাম। বইটি সত্যিই অসাধারণ।
আনা : এখন কোন বইগুলিকে হাতের কাছে রেখেছেন?
ইয়ান মারটেল : বার্বি সেলিখারের ‘ভিজ্যুয়াল আর্ট অ্যান্ড দ্য হলোকস্ট’, আর হারপার লী-র ‘টু কিল অ্যা মকিংবার্ড’।
আনা : আপনার সংগ্রহের বইগুলোর কতখানি পড়েছেন?
ইয়ান মারটেল : এখন আমার ঘরে যে-পরিমাণ বইয়ের সংগ্রহ আছে তার মাত্র ত্রিশ শতাংশ পড়তে পেরেছি। একবার পড়া হয়ে গেলে সে-বই আর নিজের কাছে রাখি না, সঙ্গে সঙ্গে অন্য কাউকে দিয়ে দিই।
আনা : কোন বইটি আপনার জীবনকে অনেকখানি বদলে দিয়েছে?
ইয়ান মারটেল : ‘ডিভাইন কমেডি’; এই একটি বই-ই আমাকে দেখিয়ে দিয়েছে—শব্দ দিয়ে কী না করা সম্ভব!
আনা : আপনি কি কখনও অন্য কোনও লেখকের শৈলী অনুকরণ করতে চেয়েছেন?
ইয়ান মারটেল : হ্যাঁ, একমাত্র কাফকাকে। কাফকা-র শৈলীকে বুঝতে, আত্মীকৃত করতে আমার বহু বছর চলে গেছে।

আনা : কোন বইগুলোকে মনে হয়েছিল—যদি নিজে লিখতে পারতেন?
ইয়ান মারটেল : ইয়োকো মিশিমা-র ‘দ্য সেইলর হু ফেল ফ্রম গ্রেস উইদ দ্য সী’, ন্যুট হ্যামসুনের ‘হাঙ্গার’ এবং জে. এম. কোয়েটজি-র ‘ডিসগ্রেস’, এ-রকম বেশকিছু বই আছে যেগুলিকে আমি নিজে লিখতে চাই।
আনা : কোথায় সবচেয়ে ভালো লিখতে পারেন?
ইয়ান মারটেল : বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছোট্ট কক্ষটিতে যখন কিছু লিখি, মনে হয় খুব গুছিয়ে লিখতে পারি।
আনা : প্রতিদিন কত শব্দ লেখেন?
ইয়ান মারটেল : কমপক্ষে আধাপৃষ্ঠা। আমি খুবই ধীরগতির লেখক। যা লিখি, তাকে বারবার পড়ি, বারবার লিখি।
আনা : ডিনার পার্টিতে কোন লেখকের পাশের আসনে বসতে চান?
ইয়ান মারটেল : আর কারও নয়, লেভ তলস্তয়ের পাশে।
আনা : একা হলে কোন লেখকদের কথা ভাবেন?
ইয়ান মারটেল : শুধু জোসেফ কনরাড আর কাফকা-র কথা মনে পড়ে…যখন খুব একা থাকি।
আনা : কখন ভীত হয়ে পড়েন?
ইয়ান মারটেল : দুর্ঘটনায় কোনও গাড়িকে দুমড়ে মুচড়ে যেতে দেখলে।

আনা : কখন খুব সুখী ছিলেন?
ইয়ান মারটেল : যখন বুকার পেয়েছিলাম!
আনা : কখন নিজেকে মুক্ত মানুষ ভাবতে পারেন?
ইয়ান মারটেল : যদি কখনও দীর্ঘ ভ্রমণে যাই, কেবল তখনই নিজেকে কাছে পাওয়া যায়। মুক্ত লাগে।
আনা : মা-বাবার কাছ থেকে পাওয়া সেরা উপদেশ কোনটি?
ইয়ান মারটেল : সুখের সন্ধান করো—এই কথাটি তারা বলতেন।
আনা : কী আপনাকে ক্ষুব্ধ করে তোলে?
ইয়ান মারটেল : নৈরাশ্যবাদ আর নিষ্ঠুরতা আমি সহ্য করতে পারি না।
আনা : লেখক হওয়ার মানে কী?
ইয়ান মারটেল : যে-কথাটি তোমার বলার ছিল, আলো নেভার আগেই তাকে খুঁজে পেতে হবে!

এমদাদ রহমান। কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক


