সমাজ

অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ : সিলেটের নারীশিক্ষার অগ্রদূত

শেয়ার করুন:

গত ১৬ জুলাই ছিল সিলেটের নারী শিক্ষার অগ্রদূত, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবী অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয় সেই মহীয়সী নারীকে, যিনি নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছিলেন নারী শিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণে।

বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ ছিলেন এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি বিশ্বাস করতেন, “শিক্ষাই নারী জাতির মুক্তি ও অগ্রগতির একমাত্র পথ।” রাষ্ট্রক্ষমতা, রাজনৈতিক পদ বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার মোহ কখনোই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাঁর জীবন ছিল আদর্শ, ত্যাগ ও শিক্ষাসেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন হোসনে আরা আহমদ। আইনজীবী আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী ও শিক্ষানুরাগী মুহিবুন্নেসা চৌধুরীর কন্যা হিসেবে তিনি এমন এক সময়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন, যখন সমাজে মুসলিম নারীদের শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, এমসি কলেজ এবং পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেন—যা সে সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল এক অসাধারণ অর্জন।

১৯৪৬ সালে তাঁর বিয়ে হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. শামসুদ্দীন আহমদের সঙ্গে। কিন্তু ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে জাতির ভবিষ্যৎকে বড় করে দেখেছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকার সিলেটের সরকারি মহিলা কলেজ বন্ধ করে দিলে শিক্ষানুরাগীদের আহ্বানে তিনি সংসার ও পরিবার ঢাকায় রেখে সিলেটে ফিরে আসেন। কোলে ছিল এক কন্যা ও এক শিশু পুত্র। আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রতিকূলতা কিংবা ব্যক্তিগত কষ্ট তাঁকে তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও সরাতে পারেনি।

সেই বছরই তিনি সিলেট মহিলা কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং পরে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে ভাড়া করা একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে শুরু হওয়া কলেজটি ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম স্বনামধন্য নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তাঁর উদ্যোগে কলেজের জন্য নিজস্ব ক্যাম্পাস, ছাত্রীনিবাস, বিজ্ঞান বিভাগ, আধুনিক অবকাঠামো ও শিক্ষার পরিবেশ গড়ে ওঠে। ফলে শুধু সিলেট নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পরিবারও নিরাপদ পরিবেশে কন্যাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান।

অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদ শুধু একজন প্রশাসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর অভিভাবক। আর্থিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা সামাজিক বাধা—যে-কোনো পরিস্থিতিতে তিনি নীরবে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁর স্নেহ, শৃঙ্খলা ও মানবিক নেতৃত্ব অসংখ্য নারীর জীবন বদলে দিয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনেও বয়ে আনে গভীর শোক। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন তাঁর স্বামী ডা. শামসুদ্দীন আহমদ। কিন্তু ব্যক্তিগত এই শোক তাঁকে ভেঙে দিতে পারেনি; বরং তিনি সেই বেদনাকেই শক্তিতে রূপান্তর করে শিক্ষা বিস্তারের সংগ্রামে আরও দৃঢ়ভাবে আত্মনিয়োগ করেন। এক স্মৃতিচারণে তিনি বলেছিলেন, “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনার পরদিনই আমি কর্মস্থলে ফিরে যাই। এই কবরের পাশ দিয়ে প্রতিদিন হেঁটেই আমি শক্তি সঞ্চয় করেছি।”

দেশ-বিদেশে তাঁর অবদান ছিল সমানভাবে স্বীকৃত। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, হংকং, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে শিক্ষা সফর করেন এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনে অংশ নেন। নারী শিক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননাগুলোর একটি “তমগা-ই-কায়েদে আজম” লাভ করেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিল, শিক্ষা বোর্ড এবং অসংখ্য সামাজিক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রাজনীতিতে যোগদানের জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব পেলেও তিনি সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর আদর্শ, আর সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম শিক্ষা।

১৯৮৩ সালে অবসর গ্রহণের পরও শিক্ষা ও সমাজসেবায় সক্রিয় ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালের ১৬ জুলাই, ৯১ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিদের সান্নিধ্যে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই মহীয়সী নারীকে। সিলেটে নারী শিক্ষার বিস্তার, নারীর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং একটি প্রজন্মকে আলোকিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর কর্ম, ত্যাগ ও আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে।

মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা—তিনি যেন অধ্যক্ষ হোসনে আরা আহমদকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। তাঁর স্মৃতি, আদর্শ ও অবদান চিরকাল জাতির পথচলার প্রেরণা হয়ে থাকুক। 


আশরাফুল ইসলাম আরিফ 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *