
২. কলমের কবিতা কিবোর্ডের কবিতা
মস্তিষ্কের ভেতর সবসময় একটা কবিতা লেখা হতে থাকে। আমরা টের পাই না। অফিসে বসে, রাস্তায় হাঁটতে, ভাতের প্লেটের সামনে, রাত তিনটায় ঘুম ভেঙে গেলে—শব্দরা নিঃশব্দে সার বাঁধে। কারো কাছে আসে ছবি হয়ে, কারো কাছে আসে গন্ধ হয়ে, কারো কাছে আসে একটা নামহীন কষ্ট হয়ে। কিন্তু কবিতা তো কাগজে না নামা পর্যন্ত কবিতা হয় না। আর সেখানেই এসে যায় দ্বিতীয় যুদ্ধ—হাতে কলম, নাকি কিবোর্ড?
মস্তিষ্কের কবিতা প্রকৃত অর্থে অদৃশ্য খসড়া—মস্তিষ্ক ভীষণ বেহিসাবি। ওর কোনো খাতা নেই, ডিলিট বাটন নেই। একটা লাইন জন্ম নেয়, তারপর নিজেই নিজেকে কেটে দেয়। আবার নতুন করে গড়ে। কখনো একটা বাক্য এক সপ্তাহ ধরে পাক খায়। ‘তুমি চলে গেলে’—এই তিনটে শব্দের পরে কী বসবে, মস্তিষ্ক ঠিক করতে পারে না। বৃষ্টি? নীরবতা? আরেকটা আমি? সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত লাইনটা ঝুলে থাকে। যেন শূন্যে ভাসমান। এই কারণেই অনেক কবিতা কখনো লেখা হয় না। ওরা মস্তিষ্কেই মরে যায়। কারণ আমরা সাহস করে কলম ধরতে পারি না। মনে হয়—এটা ভালো হবে না। অথচ সবচেয়ে সৎ কবিতাগুলোই তো অগোছালো অবস্থায় জন্মায়।
কলম ধরলে শরীরও লিখতে শুরু করে। কালির দাগ, কাগজের ঘষা, আঙুলে কালি লেগে যাওয়া—এগুলো সব কবিতার অংশ। কলমের সুবিধা হলো ও তাড়া দেয় না। অটোকারেক্ট নেই। একটা শব্দ ভুল লিখলে কেটে দেওয়া যায়। কাটার দাগটাও থেকে যায়। সেই কাটা দাগটাই পরে কবিতার সত্যতা হয়ে ওঠে। ‘আমি এখানে থেমেছিলাম, ভেবেছিলাম’—প্রমাণ থেকে যায়। কবি অনুপম মুখোপাধ্যায়ের কবিতা মনে পড়ছে। একটা পর্বে এই কাটিকুটি ওঁর কবিতায় মান্যতা পেয়েছিল। তখন খুব অভিনব ও কৌতূহলপূর্ণ মনে হয়েছিল ওঁর এই কাজ। সে-কারণে আলোচনা সমালোচনা ছুঁয়েছিল অনুপমের ওই পর্বের কবিতা। আজ এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে এল কথাটা।
কলম ধীর। তাই ভাবনাও কী ধীর হয়? একটা লাইন লিখে থেমে জানালা দিয়ে বাইরে তাকানো যায়। আমপাতার নড়া দেখা যায়। সেই ফাঁকে নতুন দুটো লাইন মস্তিষ্কে এসে জমে। এইটা কী অসুবিধা? হয়তো নয়, বরং সুবিধাই। কিন্তু এতকিছুর পরেও যখন লেখাটি কবিতা হয়ে ওঠে না—তখন নিজের হাতের লেখাই নিজে পড়তে ইচ্ছে করে না হয়তো। তখন বুঝি, কিছু কবিতা শুধু লেখার জন্যই লেখা, পড়ার জন্য না।
কিবোর্ড অন্যরকম পশু। এখানে চিন্তা আর টাইপের মধ্যে কোনো ফাঁক নেই। মস্তিষ্কে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে হাজির। তাই কিবোর্ডে লেখা কবিতা বেশি হয়। দ্রুত হয়। রাগ, অভিমান, আনন্দ—যা আসে, সঙ্গে নামে। কিবোর্ডে ডিলিট আছে। তাই আমরা নির্মম হতে পারি। একটা স্তবক ভালো না লাগলে পুরোটা মুছে দিই। কলমে যেটা করতে গেলে বুক কাঁপত। আবার কিবোর্ডে কপি-পেস্ট আছে। একটা ভালো লাইনকে দশবার ব্যবহার করা যায়। ফলে কবিতা কখনো কখনো নিজেকেই নিজে রিসাইকেল করে। কিবোর্ডের সবচেয়ে বড় মায়া হলো আলো। রাত দুটোয় স্ক্রিনের নীল আলোয় বসে লিখলে মনে হয় আমার আর কবিতা ছাড়া দুনিয়ায় আর কিছু নেই। বাইরের অন্ধকার আর ভেতরের অন্ধকার তখন এক হয়ে যায়।
তাহলে কোনটা আসল? আসলে কোনোটাই না। আবার দুটোই। কলম মানে শরীর। কিবোর্ড মানে গতি। কলম মানে পুরনো স্বজন—ধীর, খুঁতখুঁতে, হয়তো বিশ্বস্ত। কিবোর্ড মানে নতুন প্রেম—দ্রুত, ঝলমলে, হয়তো মাঝে মাঝে ফাঁকি দেয়। একজন কবি সকালে কলমে চার লাইন লিখে, রাতে কিবোর্ডে চল্লিশ লাইন মুছে দেয়। এটাই নিয়ম। “মস্তিষ্কের কবিতা হলো কাঁচা ধান। কলম হলো ঢেঁকি। আস্তে আস্তে ভাঙে। কিবোর্ড হলো মেশিন। দ্রুত গুঁড়ো করে। চাল কিন্তু একই।”
উপরে কোট করা বাক্য কয়টি আমার ফেসবুক টাইমলাইনে পোস্ট করার পর দু-চারজন সহমত পোষণ করেছেন। তাতে আমার ভাবনা হয়েছে হয়তো অনেকটাই ঠিক লিখেছি। পরে একটা সময় কবি-প্রাবন্ধিক শামীম সাঈদ কমেন্টে দ্বিমত পোষণ করেছেন এভাবে—“কবিতার ক্ষেত্রে কলমও ঢেঁকি নয়, কিবোর্ডও অত দ্রুত ভাঙে না।” শামীম সাঈদের অভিমত পড়ে মনে হয়েছে শামীমই সঠিক।
আগে তর্ক ছিল, কলম ভালো না কিবোর্ড ভালো। এখন ২০২৬ সালে এসে তর্কটা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে কারণ বাস্তবতা আমাদের বাধ্য করেছে। শেষমেশ কিবোর্ডের কাছেই যেতে হয়। কেন? আজ আর কোনো সম্পাদক হাতে লেখা খাতা চায় না। কবিতা কম্পোজ করতে হবে। ওয়ার্ডফাইলে সাজাতে হবে। তারপর ইমেইল করে পাঠাতে হবে। খামে চিঠি পাঠানোর দিন শেষ। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করতে গেলে, মুখে বলে পোস্ট হয় না। টাইপ করতেই হয়। অর্থাৎ ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ৪ লাইনের কবিতাটাও আগে কিবোর্ড ছুঁয়েছে।
খাতা হারায়, বৃষ্টিতে ভেজে। কিন্তু নোটস অ্যাপে থাকা লাইনটা থেকে যায়। ব্যাকআপের জন্য হলেও কিবোর্ড লাগে। ফলে আজকের কবির জীবনচক্রটা এমন, মস্তিষ্ক থেকে কলমে খসড়া এবং পরে কিবোর্ডে ফাইনাল ও স্ক্রিনে প্রকাশ। কলম দিয়ে শুরু হতে পারে। কিন্তু শেষটা কিবোর্ড ছাড়া হয় না। তাহলে কলমের কী দাম রইল? দাম আছে। এবং সেটা অনেক বড় দাম। কলম হলো আঁতুড়ঘর। যেখানে কবিতা কাঁদে, হাঁটে, পড়ে যায়। কিবোর্ড হলো প্রকাশের দরজা। যেটা দিয়ে কবিতা দুনিয়ায় বের হয়। কলমে লিখলে কাটাকাটির দাগ থাকে। সেই দাগই কবিতার সততা। কিবোর্ডে লিখলে গতি থাকে। সেই গতিই কবিতাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়। একটাকে বাদ দিলে আরেকটা খোঁড়া। মস্তিষ্ক থেকে নামানো বীজ আপনি কলমের নার্সারিতে চারা ফুটিয়ে যতই যত্ন করুন, কৃষকের ফার্মে পৌঁছাতে গেলে হাইওয়ে লাগবেই। আর সেই হাইওয়ের নাম কিবোর্ড।
ব্যস্ত জীবনে কবির মস্তিষ্কের ভেতরেও হাজারটা কবিতা মরে পড়ে থাকে। ওদের বাঁচানোর একটাই উপায়—হাত বাড়ানো। সেটা কলম হোক বা কিবোর্ড। কাগজ হোক বা নোটস অ্যাপ। শুধু নামিয়ে দিতে হবে। কারণ কবিতা কাগজে না এলে শুধুই ভাবনা হয়ে থাকে। আর ভাবনা একসময় পচে যায়। যেমন বাসি-লাশ পচে। তাই বলি, প্রিয় পাঠক, আপনিও রাতে ঘুমানোর আগে একটা লাইন লিখতে চেষ্টা করুন। হাত কাঁপলে কলম দিয়ে। আঙুল কাঁপলে কিবোর্ড দিয়ে। কে জানে, ওই একটা লাইনই একদিন আমার ‘রাজকুমারী’ হয়ে উঠবে। মস্তিষ্ক দেবে আগুন। কলম বা কিবোর্ড দেবে নিঃশ্বাস। আর কবি দেবেন সাহস। তাহলেই কবিতা বাঁচবে।
স্ক্রল করে দেখা ধারাবাহিক

মাসুদার রহমান। কবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।




সুস্নাত দাস
August 14, 2026লেখাটি পড়লাম। বেশ সাবলীল এবং যৌক্তিক। তবে দ্বিমত করারও পরিসর আছে।
সুস্নাত দাস
মুসা মোহাম্মদ
August 14, 2026খুব ভালো লেখা। পড়লাম, সমৃদ্ধ হলাম। তবে কবি মাসুদার রহমান সম্পর্কে আমার সবিনয় কিছু জিজ্ঞাসা আছে। যেমন- তাঁকে কখনো কেনো সাহিত্য সভায় আমন্ত্রণ করেও তাঁর উপস্থিতি পাওয়া যায় না। কেনো? কবি কী জানাবেন?