গল্প সাহিত্য

কোনো ট্রেন ফিরে আসে না || রিমি রুম্মান

শেয়ার করুন:

আমরা ছোটবেলায় দাদাবাড়ি যেতাম ট্রেনে। শহর থেকে গ্রামে।

ভিড় ঠেলে ওঠার পর আব্বা চারপাশে চোখ বোলাতেন। অনুসন্ধানি দৃষ্টি। কোথাও আমাদের বসানোর জন‍্য একটু জায়গা পাওয়া যায় কিনা। তারপর কাউকে বিনয়ের সঙ্গে বলতেন, ‘ভাই, আমার মেয়েটাকে একটু বসার জায়গা দেবেন? ছোট মানুষ ‘।

ছোট হতে পারি, কিন্তু আমার আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রবল। বিরক্ত হতাম। লজ্জিতও। কেনো যে আব্বা এইভাবে মানুষকে অনুরোধ করেন! কিন্তু আব্বাকে কিছু বলার সাহস হতো না।

যাকে অনুরোধ করতেন, তিনি হয়ত সামান্য সরে জায়গা করে দিতেন। এতটুকু জায়গায় কোনোমতে বসতাম। ট্রেন পরবর্তী স্টেশনে ব্রেক করলে সবাই একদিকে হেলে পড়তো। ঠিক তখনই আমার আরাম করে বসার জায়গা হয়ে যেত। আমি হাঁটু মুড়ে জানালার দিকে ঘুরে বসতাম। বাইরের দৃশ্য দেখতাম।

বাইরে তখন পেছনে ছুটত ফসলের খেত, রাখালের গরু, বাঁশঝাড়, ছোট ছোট গ্রাম, স্বচ্ছ নদী, জলে হুটোপুটি করা কিশোরের দল। তারা হাত নেড়ে যাত্রীবাহী ট্রেনকে সম্ভাষণ জানাত। তীব্র হাওয়ায় এলোমেলো হতো আমার চুল। বেপরোয়া চুল সরাতে সরাতে দৃশ‍্যগুলো অদৃশ্য হয়ে যেত।

তখন বুঝিনি, মানুষের জীবনও যে এমন।
কিছু দৃশ্য চোখের সামনে আসে। একটু থাকে। তারপর চুপচাপ পেছনে সরে যায়।

গত সপ্তাহে আমার অতিথিদের নিয়ে নিউইয়র্কের সাবওয়েতে উঠেছিলাম। ৭ নম্বর ট্রেন। ওরা গল্প করছিল। আমি বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। চোখের সামনে অপসৃয়মান হচ্ছিল উঁচু উঁচু ভবন। বিলবোর্ড। কংক্রিটের দেয়াল। দূরের মহাসড়ক। অগণন ছুটে চলা গাড়ি।

আন্ডারগ্রাউন্ডে ঢুকে ট্রেন থামে। দরজা খোলে। মানুষ নামে। নতুন মানুষ ওঠে। কেউ কারও দিকে তাকায় না। সবাই ছুটে নিজ নিজ গন্তব্যে।

আমরা নেমে দাঁড়িয়ে থাকি। ট্রেন চলে যায়। লাল আলোটা ধীরে ধীরে ছোট হয়। তারপর অন্ধকারে মিশে যায়।

আমি দাঁড়িয়ে থাকি সেই প্ল্যাটফর্মে, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কোথাও যাওয়ার জন্য ট্রেনে ওঠে। আর মনে হয়, একদিন যে মানুষটা ট্রেনের ভিড়ে আমার জন্য একটুখানি জায়গা খুঁজে বেড়াতেন, যাতে এই ভিড়ের পৃথিবীতে আমি একটু আরামে থাকি, তিনি এখন এমন এক জায়গায় চলে গেছেন, যেখানে চাইলেও তাঁর জন্য কোনো জায়গা করে দিতে পারব না।

আহা রে আমার আব্বাটা!
কোথায়, কত দূরে যে চলে গেছেন—
যেখান থেকে কোনো ট্রেন কোনোদিন ফিরে আসে না।


রিমি রুম্মান
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *