রাজনীতি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

শেয়ার করুন:

—বাংলাদেশে ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
—২৫৫ ভোটে বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল
—অলি আহমদ পেলেন ৮৮ ভোট
—সংসদীয় ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি বিএনপির মহাসচিব

ঢাকা : দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে ২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর এই নির্বাচিত হওয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিনন্দনের ঢল নেমেছে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তাঁকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য ভোট প্রদান করেন।

১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। গত ৩৫ বছরে সাতজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও তাঁদের কেউই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হননি; ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের সংসদীয় ও সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

 

ভোটের হিসাবে বড় ব্যবধান

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দেন। ফলাফলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পান ২৫৫ ভোট এবং অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান দাঁড়ায় ১৬৭ ভোট।

সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে মির্জা ফখরুলের জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় ভোটের ফলাফল নিয়ে আগে থেকেই রাজনৈতিক মহলে এক ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছিল।

তবে এবারের নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভিন্ন কারণে। দীর্ঘ বিরতির পর রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিপরীতে বিরোধী জোট একজন প্রার্থী দিয়েছে, যার ফলে সংসদীয় ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি হয়।

 

রাষ্ট্রপতি পদে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন। দলের মহাসচিব হিসেবে তিনি আন্দোলন, নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর নির্বাচিত হওয়া শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় নয়, বরং বিএনপির রাজনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। দলীয় নেতৃত্ব থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে তাঁর উত্তরণ দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

 

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের প্রধান। যদিও সংসদীয় ব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব।

সরকার গঠন, সংসদ কার্যক্রম, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা রয়েছে। ফলে নতুন রাষ্ট্রপতির অভিজ্ঞতা ও দায়িত্ব পালনের ধরন আগামী দিনে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।

৩৫ বছর পর কেন এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ

১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি পদে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়নি। এতদিন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এবার বিরোধী জোটের প্রার্থী অংশ নেওয়ায় সংসদীয় ভোটে প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ তৈরি হয়।

এ কারণে এবারের নির্বাচন শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নয়, বরং বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা, সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার এবং রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

 

অভিনন্দন ও প্রত্যাশা

নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রায় সকল মহল থেকে সকল মাধ্যমে আন্তরিক অভিনন্দন জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশা প্রকাশ করেছেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা, জাতীয় ঐক্য এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন।

 

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা।

রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার সক্ষমতা আগামী দিনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও সরকারের মধ্যে সাংবিধানিক দায়িত্বের সমন্বয়ও তাঁর দায়িত্ব পালনের একটি বড় দিক হবে।

গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করার পর সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল—বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়।


ডেস্ক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *