নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করা বিশিষ্ট চিকিৎসক, গবেষক ও উন্নয়নকর্মী ডা. খায়রুল ইসলাম আর নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শুক্রবার ভোরে রাজধানীর কন্টিনেন্টাল হাসপাতালে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস কো-অর্ডিনেটর প্লাবন গঙ্গোপাধ্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ভোর ৬টার দিকে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ বারডেমের মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে। তাঁর একমাত্র ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছেন। শনিবার বাদ আসর রাজধানীর গুলশান আজাদ মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাফন সম্পন্ন হবে।
ডা. খায়রুল ইসলামের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, পানি, স্যানিটেশন ও উন্নয়ন খাতের জন্যও বড় ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয় হিসেবে নয়, বরং মানুষের স্বাস্থ্য, মর্যাদা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন।
চিকিৎসক থেকে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের অগ্রসেনা
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন ডা. খায়রুল ইসলাম। পরে তিনি জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান—নিপসম এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। তিনি লেখক ও গবেষক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ে দেশে-বিদেশে তাঁর একাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে।
ওয়াটারএইডে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক হওয়ার আগে তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর তাঁকে ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই দায়িত্বে থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি—WASH—খাতকে আরও কার্যকর ও টেকসই করার জন্য তিনি নীতি নির্ধারণ, গবেষণা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনকে দেখেছেন উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে
বাংলাদেশে পানি ও স্যানিটেশন খাতে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও নিরাপদভাবে পরিচালিত স্যানিটেশন এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে সবার কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—এ বিষয়টি ডা. খায়রুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের ২০২৩-২০২৮ কান্ট্রি প্রোগ্রাম স্ট্র্যাটেজি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক WASH পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় ভালো হলেও নিরাপদে পরিচালিত স্যানিটেশন এবং সবার কাছে পাইপলাইনের মাধ্যমে উন্নত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরও অনেক কাজ বাকি। ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা—বিশেষ করে এসডিজি-৬—অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পানি সংকট নিয়েও ছিলেন সোচ্চার
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার বিষয়টিকে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে দেখতেন। লবণাক্ততা, বন্যা, নদীভাঙন, নগরায়ণ ও পানি সংকটের মতো সমস্যাগুলো ভবিষ্যতে WASH খাতের ওপর আরও চাপ তৈরি করবে—এ বাস্তবতা মোকাবিলায় টেকসই ও জলবায়ু-সহিষ্ণু ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
ওয়াটারএইডের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি শুধু টয়লেট নির্মাণ বা পানির অবকাঠামো তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবহারযোগ্যতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দিয়েছেন।
পাবলিক স্যানিটেশন নিয়েও তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। ২০২৩ সালের এক দক্ষিণ এশীয় আলোচনায় তিনি পানি ও স্যানিটেশন খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় সচেতনতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
সহকর্মীদের কাছে ছিলেন শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক
ডা. খায়রুল ইসলামের মৃত্যুর পর ওয়াটারএইড বাংলাদেশসহ জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতের সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ওয়াটারএইডের পক্ষ থেকে তাঁকে জনস্বাস্থ্য ও WASH খাতের একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা, পথপ্রদর্শক ও পরামর্শদাতা হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে।
সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে তাঁর নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও সহজ-সরল ব্যবহারের কথা। দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য তরুণ পেশাজীবী তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন এবং জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নকাজে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
অবসরের আগেই থেমে গেল পথচলা
দীর্ঘ কর্মজীবনের পর চলতি আগস্ট মাসেই ওয়াটারএইডের দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব থেকে অবসর নেওয়ার কথা ছিল ডা. খায়রুল ইসলামের। কিন্তু অবসরের সেই সময় আসার আগেই থেমে গেল তাঁর কর্মময় জীবন।
নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর যে দীর্ঘ সংগ্রাম—তা বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে থাকবে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করার যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি কাজ করেছেন, তাঁর চলে যাওয়ার পর সেই কাজকে এগিয়ে নেওয়াই হবে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।
জনস্বাস্থ্য খাতের এই নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক, গবেষক ও উন্নয়নকর্মীর মৃত্যুতে দেশের পানি, স্যানিটেশন ও উন্নয়ন অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
লেখক ও সম্পাদক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা



