সমাজ

ডেলাওয়ার ভ্যালিতে ড. কাজী খালিদ আশরাফ সম্মাননা || আশরাফুল ইসলাম আরিফ

শেয়ার করুন:

—স্থাপত্য ও নগরচিন্তায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময়

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বাংলাদেশি স্থপতি, নগরবিদ, স্থাপত্য ইতিহাসবিদ, গবেষক ও লেখক ড. কাজী খালিদ আশরাফকে সম্মাননা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার ভ্যালির বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটি। বাংলাদেশের স্থাপত্য, নগরায়ণ, ঐতিহ্য, ভূদৃশ্য ও বসতি নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গত ২৩ আগস্ট রোববার পেনসিলভেনিয়ার ড্রেক্সেল হিলের শপ্তক কালচারাল সেন্টারে এ সংবর্ধনা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে ডেলাওয়ার ভ্যালির বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, ড. কাজী খালিদ আশরাফের দীর্ঘদিনের সহকর্মী, বন্ধু ও শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ এবং বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অংশ নেন। বাংলাদেশের স্থাপত্য ও নগরচিন্তার ভবিষ্যৎ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ, দ্রুত নগরায়ণের চ্যালেঞ্জ, পরিবেশ এবং তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে অনুষ্ঠানে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল ড. কাজী খালিদ আশরাফের বক্তব্য ও উপস্থাপনা। তিনি তাঁর দীর্ঘ পেশাগত ও একাডেমিক অভিজ্ঞতা, স্থাপত্যচিন্তা এবং বাংলাদেশকে ঘিরে তাঁর গবেষণা ও পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পরে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় পর্বে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের নগরায়ণ, স্থাপত্যের বর্তমান ধারা, পরিবেশ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনা নিয়ে তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।

মতবিনিময় পর্বে ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা অংশ নেন। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় বাংলাদেশের মতো নদী ও জলাভূমিনির্ভর বদ্বীপ দেশে ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় পানি, পরিবেশ ও জনবসতির সমন্বিত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি।

অনুষ্ঠান শেষে একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. কাজী খালিদ আশরাফ ও মিসেস হাসিনা চৌধুরী নিলু এ আয়োজনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা ও আনন্দ প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, ডেলাওয়ার ভ্যালির প্রবাসী বাংলাদেশিদের এমন আন্তরিক ভালোবাসা ও সম্মান তাঁদের আবেগাপ্লুত করেছে। এতটা আন্তরিক ও উষ্ণ আয়োজনের জন্য তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না বলেও উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের তরুণ স্থপতিদের উদ্দেশে ড. কাজী খালিদ আশরাফ বলেন, গতানুগতিক চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তরুণদের আরও চিন্তাশীল, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী হতে হবে। দেশ, দেশের বাইরে এবং সমসাময়িক বিশ্বের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে হবে। নতুন ধারণা ও সৃজনশীল চিন্তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থাপত্য এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণে তরুণ স্থপতিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

স্থাপত্যচর্চায় দীর্ঘ একাডেমিক পথ

ড. কাজী খালিদ আশরাফ বাংলাদেশের স্থাপত্য ও নগরচিন্তার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক অবদানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে মাস্টার্স এবং ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি প্রায় ২৫ বছর ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া ও টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন। দীর্ঘ একাডেমিক ও পেশাগত জীবনের পর ২০১৫ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা ও গবেষণার কাজে আরও সক্রিয় হন। বর্তমানে তিনি ঢাকার বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপ অ্যান্ড সেটেলমেন্টসের ডিরেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ, পরিবহন, উন্মুক্ত স্থান ও জনবসতি নিয়ে গবেষণা ও পরিকল্পনার কাজ হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও মোংলাসহ বিভিন্ন শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাঁর প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে। ঢাকা মহানগরের পরিবহন, পরিবেশ ও উন্মুক্ত স্থান নিয়েও তাঁর গবেষণা ও নকশাচিন্তা রয়েছে।

 

গবেষণা ও লেখালেখিতে আন্তর্জাতিক পরিচিতি

স্থাপত্যের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার স্থাপত্য ইতিহাস, আধুনিক স্থাপত্য, নগরায়ণ ও স্থাপত্যতত্ত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা ও লেখালেখি করছেন ড. আশরাফ। বাংলাদেশের কিংবদন্তি স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এবং বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই কানকে নিয়েও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা রয়েছে।

তাঁর লেখা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল, বই, গবেষণাপত্র ও বিশ্বকোষে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর নিয়মিত লেখক হিসেবেও পরিচিত। পদ্মা নদী ও বাংলাদেশের বদ্বীপ গঠনে এর ভূমিকা নিয়ে তাঁর বই The Great Padma: The Epic River That Made the Bengal Delta পাঠক ও গবেষকদের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত।

১৯৯৭ সালে জেমস বেলুয়াডের সঙ্গে নিউইয়র্কে তিনি An Architecture of Independence: The Making of Modern South Asia শীর্ষক একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এতে বালকৃষ্ণ দোশি, অচ্যুত কানভিন্দে, চার্লস কোরিয়া ও মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যকর্ম তুলে ধরা হয়। প্রদর্শনীটি পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি শহরে প্রদর্শিত হয়।

স্থাপত্য-গবেষণা ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২০০৮ সালে তিনি International Committee of Architectural Critics-এর পুরস্কার লাভ করেন। ২০২৬ সালে তাঁর The Mother Tongue of Architecture বইটিও একই প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি আগা খান অ্যাওয়ার্ডের মাস্টার জুরি কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্থাপত্যের বাইরেও শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। শিক্ষাজীবনে ১৯৭৮ সালে জনপ্রিয় কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’-এর যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন তিনি। তাঁর কার্টুন যুক্তরাষ্ট্রের The Philadelphia Inquirer ও The New York Times-সহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

‘পানি ও ভবিষ্যতের শহর’ নিয়ে নতুন ভাবনা

বর্তমানে ড. কাজী খালিদ আশরাফের স্থাপত্যচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পানি ও ভবিষ্যতের শহর। নদী, খাল, জলাভূমি ও বদ্বীপকেন্দ্রিক বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় পানিকে শুধু সংকট হিসেবে নয়, সম্ভাবনা ও সম্পদ হিসেবে বিবেচনার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি কাজ করছেন।

বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, পরিবেশগত সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ভবিষ্যৎ শহর কেমন হওয়া উচিত—এ নিয়ে তাঁর গবেষণা ও নকশাচিন্তা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনাকে পরিবেশ, ভূদৃশ্য এবং মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সমন্বিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ

আয়োজকদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের স্থাপত্য ও নগরচিন্তাকে তুলে ধরা একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানো ডেলাওয়ার ভ্যালির বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির জন্য গর্বের বিষয়। একই সঙ্গে এ ধরনের আয়োজন প্রবাসের নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক ছিলেন ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ। সহযোগিতায় ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ডেলাওয়ার ভ্যালি, বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটি ফোরাম পেনসিলভানিয়া এবং ফিলাডেলফিয়া পত্রিকা। বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি ডেলাওয়ার ভ্যালির বাংলাদেশি কমিউনিটিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবেও উঠে আসে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে কমিউনিটির সুপরিচিত প্রকৌশলী সালাউদ্দিন আহমেদ তারেক এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী কাদের কিবরিয়ার পরিবেশনায় দুটি গান পরিবেশিত হয়। তাঁদের সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। সমাপনী পর্বে ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত অতিথি ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে একাডেমিক ও পেশাগত জীবন কাটানোর পরও বাংলাদেশের স্থাপত্য, নগরায়ণ ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা ড. কাজী খালিদ আশরাফের কর্মযাত্রা অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে তাঁর এই মতবিনিময় শুধু একটি সম্মাননা অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগর, স্থাপত্য ও সৃজনশীল চিন্তা নিয়ে প্রবাসী সমাজের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *