বিজ্ঞান

দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই আলোকবর্তিকা || আশরাফুল ইসলাম আরিফ

শেয়ার করুন:

—মহাবিশ্বের রহস্য থেকে বিশেষ শিশুর অধিকার নিয়ে কর্মযোগী দুই কৃতী সহোদর 
—ভাই জামাল নজরুল ইসলাম, বোন সুলতানা সারওয়াত আরা জামান
—বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে বিরল এক ভাই-বোনের কৃতিত্ব
—দুই ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, দুই ভিন্ন শাস্ত্র, অথচ দুজনের শেষ অ্যাকাডেমিক পরিচয় ‘এমেরিটাস অধ্যাপক’

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই—একই পরিবারের দুই সন্তান দেশের দুই শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে এমন স্থায়ী অবদান রেখেছেন, যা তাঁদের ব্যক্তিগত সাফল্যের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে।

ভাইয়ের গবেষণার বিষয় ছিল মহাবিশ্ব, মহাকর্ষ, আপেক্ষিকতাবাদ, কৃষ্ণগহ্বর ও কসমোলজি। বোনের কর্মজীবনের কেন্দ্রে ছিল মনোবিজ্ঞান, বিশেষ শিক্ষা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকার ও পুনর্বাসন। একজন তাকিয়েছেন মহাকাশের অসীমতার দিকে, অন্যজন হাত বাড়িয়েছেন সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত শিশুদের দিকে। অথচ তাঁদের জীবনের শেষ একাডেমিক পরিচয় এসে মিলেছে একই জায়গায়—এমেরিটাস অধ্যাপক।

তাঁরা হলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও কসমোলজিস্ট অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম এবং মনোবিজ্ঞানী, বিশেষ শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী অধ্যাপক সুলতানা সারওয়াত আরা জামান।

দুই ভাই-বোনের এই অনন্য যাত্রা বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়।

 

মহাবিশ্বের রহস্যের অনুসন্ধানে জামাল নজরুল ইসলাম

অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম ছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন গণিতভিত্তিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও কসমোলজিস্ট। তাঁর একাডেমিক জীবন বিস্তৃত হয়েছিল কেমব্রিজ থেকে প্রিন্সটন, ক্যালটেক, ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন ও লন্ডনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। তিনি কেমব্রিজের Institute of Theoretical Astronomy-তে কাজ করেছেন এবং Institute for Advanced Study, Princeton-এও Visiting Member হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তাঁর জীবনের একটি বড় সিদ্ধান্ত ছিল দেশে ফিরে আসা। ১৯৮৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে যোগ দেন এবং ১৯৮৯ সালে Research Centre for Mathematical and Physical Sciences (RCMPS)-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি গবেষণা ও গবেষক তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। ২০০৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের Professor Emeritus হন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে তাঁর অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রটি তাঁর নামেই—Jamal Nazrul Islam Research Center for Mathematical and Physical Sciences। বিশ্ববিদ্যালয় নিজেও তাঁকে গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান, আপেক্ষিকতাবাদ, মহাকর্ষ, কসমোলজি ও কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি। মহাবিশ্বের উৎপত্তি, বিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে তাঁর কাজ তাঁকে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে পরিচিত করে।

১৯৮৩ সালে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Ultimate Fate of the Universe মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর চিন্তাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়।

বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ৫০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একাধিক গ্রন্থের লেখক। তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো ছিলেন এবং পেয়েছেন একুশে পদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার।

সবচেয়ে বড় কথা, তিনি শুধু নিজে গবেষণা করেননি; বাংলাদেশে উন্নত তাত্ত্বিক গবেষণার পরিবেশ তৈরির জন্যও কাজ করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রটি আজ তাঁর সেই স্বপ্নের একটি দৃশ্যমান উত্তরাধিকার।

 

সমাজের প্রান্তিক শিশুদের জন্য সুলতানা সারওয়াত আরার লড়াই

অন্যদিকে অধ্যাপক সুলতানা সারওয়াত আরা জামানের কর্মজীবনের কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মনোবিজ্ঞানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ও এমএ সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের Emory University-তে যান এবং পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Professor Emeritus করা হয়।

তবে তাঁর অবদান কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ বা গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, বিকাশ ও অধিকার নিয়ে তিনি জীবনের বড় অংশ কাজ করেছেন।

১৯৭২ সালে তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও নারীদের জন্য Deepshikha Vidyalaya প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Bangladesh Protibandhi Foundation। শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা থাকা শিশুদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বিশেষ শিক্ষাকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একাডেমিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Institute of Education and Research-এ Special Education বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বিশেষ শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করেছে।

তাঁর কাজের মূল দর্শন ছিল—প্রতিবন্ধিতা কোনো শিশুর সম্ভাবনার শেষ কথা নয়; যথাযথ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে তারাও সমাজে মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর দীর্ঘ সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বেগম রোকেয়া পুরস্কারসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন।

একজনের প্রশ্ন মহাবিশ্বের শেষ নিয়ে, অন্যজনের প্রশ্ন মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে

জামাল নজরুল ইসলাম ও সুলতানা সারওয়াত আরা জামানের জীবনকর্ম পাশাপাশি রাখলে একটি অসাধারণ বৈপরীত্য চোখে পড়ে।

একজনের অনুসন্ধান ছিল মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্য নিয়ে—মহাকর্ষ কীভাবে কাজ করে, মহাবিশ্বের গঠন কী, তার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে।

অন্যজনের অনুসন্ধান ছিল মানুষের সম্ভাবনা নিয়ে—বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একটি শিশু কেন সমাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে থাকবে, শিক্ষা ও সুযোগ থেকে কেন বঞ্চিত হবে, এবং কীভাবে তাকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলা যায়।

অর্থাৎ একজনের দৃষ্টি ছিল আকাশের অসীমতার দিকে, অন্যজনের দৃষ্টি ছিল মানবিক মর্যাদার দিকে।

একজন মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন; অন্যজন চেষ্টা করেছেন সমাজের তৈরি অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে।

 

দুই বিশ্ববিদ্যালয়, দুই শাস্ত্র—একই উত্তরাধিকার

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠান, দুটি আলাদা একাডেমিক পরিবেশ। তাঁদের কাজের বিষয়ও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবু দুজনের পথের শেষ ঠিকানা হয়েছে একই সম্মানজনক অবস্থান—Professor Emeritus।

অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম ১৫ মার্চ ২০১৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা কেন্দ্র এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজ নতুন প্রজন্মের গবেষকদের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।

অধ্যাপক সুলতানা সারওয়াত আরা জামান ২৩ মার্চ ২০২০ সালে ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত Bangladesh Protibandhi Foundation এবং বিশেষ শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর প্রবর্তিত চিন্তাধারা আজও তাঁর উত্তরাধিকার বহন করছে।

 

বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়

একই পরিবারের দুই সন্তান—একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কসমোলজিস্ট, অন্যজন বিশেষ শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের পথিকৃৎ; একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক, অন্যজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক।

তাঁদের কৃতিত্বকে শুধু ভাই-বোনের সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটি আসলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও মানবিক সমাজচিন্তার দুই ভিন্ন ধারার ইতিহাস।

জামাল নজরুল ইসলাম আমাদের শিখিয়েছেন—বাংলাদেশের মাটিতেও মহাবিশ্বের গভীরতম প্রশ্ন নিয়ে বিশ্বমানের গবেষণা করা সম্ভব।

সুলতানা সারওয়াত আরা জামান দেখিয়েছেন—সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত শিশুকেও শিক্ষা, অধিকার ও মর্যাদার আলোয় নিয়ে আসা সম্ভব।

দুই ভিন্ন পথ, দুই ভিন্ন জগৎ, দুই ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়—কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক: জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো।

সেই কারণেই জামাল নজরুল ইসলাম ও সুলতানা সারওয়াত আরা জামান শুধু একজন ভাই ও একজন বোন নন। তাঁরা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে দুই উজ্জ্বল নাম—একজন মহাবিশ্বের রহস্যের অনুসন্ধানী, অন্যজন মানবিক সম্ভাবনার নির্মাতা।


আশরাফুল ইসলাম আরিফ প্রণীত অন্যান্য রচনা 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *