শরতের স্বপ্নরা
গুলবাহার একটা শাড়ি নিজের গায়ের ওপর ফেলে দেখাল। আকাশি রঙে ভরে গেল তার শরীর। নিঃসঙ্গ মহিলা দেখলেন গুলবাহারের মুখেও নীল আভা। হাসি মুখে সোফা ছেড়ে উঠে এলেন তিনি। জড়িয়ে ধরলেন গুলবাহারকে। খুশি হল সে। এর আগে যতবারই সে প্রোডাক্ট নিয়ে এসেছে কিনেছেন মহিলা। এবারেও কিনবেন, জানে গুলবাহার।
মহিলা জড়িয়ে ধ’রে অনুভব করলেন গুলবাহারের স্তন। পিঠে হাত রাখলেন। মহিলা খুব আন্তরিক, ভাবে গুলবাহার। আগেও এভাবেই জড়িয়ে ধরেছেন তিনি। প্রত্যেকবারই দেখা হলে সামান্য সময় জড়িয়ে ধরেন। এত কম সময়ের জন্য যে কিছু মনে করার অবকাশ নেই। আজও তাই হল। নাকি নিজের সুবিধার জন্য এরকম হতে দিচ্ছে সে?
হতেও পারে। অবচেতনে অনেককিছুই হয়। সব বোঝা মুশকিল। মহিলা শাড়িটি নিলেন আর অসম্ভব তৃপ্ত দেখালো তার মুখ। মহিলা তাকে অপেক্ষা করতে বলে দু’কাপ চা আনলেন। সঙ্গে নানারকম স্ন্যাক্স। গুলবাহারের পাশে সোফায় বসলেন মহিলা। চা খেতে খেতে, কথা বলতে বলতে ধীরে ধীরে গুলবাহারের দিকে স’রে আসছেন মহিলা। খুব কাছে সরে এলেন। গুলবাহার সচেতন হয়। মহিলা কাপ নামিয়ে রেখে ডান হাতের তালু দিয়ে গুলবাহারের মুখ নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেন। অপলক দেখতে থাকেন। কিছুক্ষণ গুলবাহার কোনো কথাই বলতে পারে না, কিংকর্তব্যবিমুঢ়। কয়েক সেকেন্ডমাত্র। মহিলা তার মুখের কাছে নিজের মুখ নিয়ে আসতে থাকেন। মহিলার হাত সরিয়ে দিয়ে গুলবাহার উঠে দাঁড়ায়। খুব শান্ত সে।
: সরি, আয়াম স্ট্রেট। আর যদি সমকামীই হতাম আমার সম্মতি নেওয়া উচিত ছিল নাকি? প্লিজ ডোন্ট এক্সপ্লয়েট মি।
গুলবাহার ব্যাগটা মেঝে থেকে তুলে নেয়। ঝুলিয়ে নেয় কাঁধে।
: আসি।
মহিলাও উঠে দাঁড়িয়েছেন। অপ্রস্তুত ও বিষণ্ণ।
: মাই অ্যাপোলজি। উইল নট হ্যাপেন এগেন। প্লিজ ডু ভিজিট।
মহিলার চোখের পাতা কাঁপে। বিষণ্ণ হাসে গুলবাহার। সিঁড়ি ধরে নামতে থাকে। সস্তা স্যান্ডেলের শব্দ ওঠে ফটাস্ ফটাস্। মহিলা সেদিকে তাকিয়ে ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন, একাকিনী। শুধু তার সিঁদুর জ্বলজ্বল করে। গুলবাহারের জুতোর শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। সিঁড়ির আলোটা আরো হলুদ হয়ে ওঠে। গুলবাহার রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।
মহিলার জন্য খুব খারাপ লাগতে থাকে। কার কীভাবে কেন যে মন খারাপ হয় বুঝে ওঠা কঠিন। নিজের মন খারাপের কারণ অনেক সময় বোঝা যায় না। গলি ধরে হাঁটতে থাকে সে। এখনো বিকেলের আলো। আকাশ যদিও ধোঁয়াটে। এই সময় মামাবাড়ির আকাশের কথা মনে পড়ে। ঘন নীল আর নীলের মধ্যে ভেসে আছে অসম্ভব সাদা মেঘেরা। সেখানে সবকিছুই এখন অন্যরকম। রাস্তায় শিউলি ফুল পড়ে ভর্তি হয়ে আছে। ভোরের দিকে শীত শীত ভাব। আ! ভারি সুন্দর। কলকাতায় কিছুই বোঝা যায় না। শুধু গরম আর বর্ষা ছাড়া যেন কোনো ঋতু নেই। আর হপ্তা দুয়েকের জন্য একটু শীত। ব্যাস। মাকে নিয়ে যেতে হবে মামাবাড়ি। কিছুদিন ওখানেই রেখে আসতে হবে। সবসময় কেমন বিষণ্ণ হয়ে থাকে।
প্যাচপেচে গরম। তার মধ্যেই পাড়ার পর পাড়া চষে ফেলতে হচ্ছে। চুলের গোড়াগুলো ঘামে ভিজে উঠেছে। কেমন বিদ্ধস্ত সেনানীর মতো লাগছে তাকে। তবু লোকের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলতে হবে। প্রোডাক্ট সম্পর্কে লোককে বোঝাতে হবে। লোকে খারাপ ব্যবহার করলেও ধৈর্য ধরে তার মোকাবিলা করতে হবে। ফুটপাথে এক মহিলা একা একা বসে। নিজের মনে কী বকবক করছে। মাথায় জট পাকানো চুল। সে কি পাগল এবং খুব একাকী?
সেই মহিলার কথা মনে প’ড়ে গেল তার। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তার মুখ। জ্বলজ্বলে সিঁদুর। মন খারাপ হয়ে গেল গুলবাহারের। একজন ঠিকঠাক সঙ্গীও তো তার জুটে যেতে পারত। কেন যে জীবনের অনেককিছুই ভুলভাল।
একটা গলির ভেতর ঢুকে পড়ে গুলবাহার। গলিটা কেমন যেন অদ্ভুত। সবকিছু কেমন বেশিরকম রঙিন। ঘরবাড়ি, দরজা-জানলায় বেশ চড়া রং। এক্ষুনি যেন রং করা শেষ হয়েছে। কোথাও একটু ধুলোর চিহ্ন নেই। দু’পাশে উঁচু উঁচু বাড়ি। গলিটায় মগ্ন হয়ে পড়ল সে। গলিটা বহু দূর অবধি গিয়ে যেন আকাশের সঙ্গে মিশে গেছে। গলির পাশে একটা চাপা লাল রঙের বাড়ি। বাড়ির সামনের দোতলায় গাঢ় হলুদ রঙের বারান্দায় এক মহিলা বসে আছেন চোখ বুজে। তিনি পরে আছেন আকাশি নীল সিফন শাড়ি।
দেখতে দেখতে কোথা থেকে একদঙ্গল মেয়ে বেরিয়ে এল। তারা প্রত্যেকেই নীল সিফন শাড়ি পরেছে। বসে থাকা মহিলার মতোই, আকাশি নীল সিফন। দল বেঁধে যাচ্ছে অথচ কথা নেই, হইচই নেই। গুলবাহারের পাশ দিয়ে তারা যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে হেঁটে গেল। তাদের কাঁধ ছাপিয়ে যাওয়া চুলগুলো হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ছে। গুলবাহার স্পষ্ট শুনতে পেল একটা সুর। নাকে এসে লাগল সুন্দর গন্ধ।
আর তক্ষুনি একটা নীল হালকা ওড়না উড়ে এসে গুলবাহারের মুখ ঢেকে দিল। ফুরফুরে একটা আনন্দ হল তার। ওড়নাটা মুখ থেকে সরাতে চাইল। পারল না। প্রথমে খুশি মনে চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর ওড়নাটা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। শ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল। ছটফট করল সে কিছুক্ষণ। একবার বাঁ-দিকে একবার ডান দিকে মুখ ঘুরিয়ে ওড়নাটা মুখ থেকে সরানোর চেষ্টা করল। পারল না। ফিনফিনে ওড়নার ভেতর থেকে ওপরের দিকে চোখ গেল তার।
বারান্দার মহিলা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন। তার মুখ ক্ষণিকের জন্য মায়ের মুখের মতো লাগল। ভালো করে দেখল গুলবাহার। না, মা নয়। মহিলা এমনভাবে তাকিয়ে যেন ওড়নায় ঢাকা তার মুখ সুন্দর দেখাচ্ছে। মহিলা পলকহীন দেখছেন তাকে। গুলবাহার আবার চেষ্টা করল ওড়না সরাতে। পারল না। এবার সত্যিই বেশিরকম কষ্ট হতে লাগল তার। ছটফট করছে।
ধড়ফড় করে উঠে বসল বিছানায়। ঘুম পুরো কেটে গেছে। বালিশের ঢাকটিতে মুখ ঢাকা পড়েছিল। আলো জ্বালাল। জলের বোতল থেকে ঢকঢক করে জল খেল। ঘামে ভিজে গেছে শরীর। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল। ঘুম পাচ্ছে না। পাশের ঘরে মা ও বোন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ডায়েরি আর কলম নিয়ে বসল সে। লিখছে, ‘মায়ের শাড়িগুলো পুরোনো ও পট্টি লাগানো। বোনের পোশাকগুলিও। আমি কী পারব সব সামলে নিতে?’ ডায়েরি বন্ধ করে টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখল।
আবার চুপচাপ বসে থাকল কিছুক্ষণ। অনেকদিন পর নিজের মুখ ভালো করে দেখতে ইচ্ছে হল। বাড়ির একমাত্র আয়নাটা সে খুঁজল। নেই। ঠিক পাশের ঘরে নিয়ে গেছে বোন। সন্তর্পণে দরজা খুলে ঢুকল পাশের ঘরে। হাতড়ে হাতড়ে টেবিল ল্যাম্প জ্বালাল। টেবিলেই পেয়ে গেল আয়নাটা। সারাক্ষণ আয়নায় মুখ দেখা কাজ বোনের। পড়তে পড়তেও আয়না ধরবে মুখের সামনে। টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে দিল।
: কী যে করিস রাত জেগে!
ঘুমঘুম গলায় বলে উঠলেন মা। গুলবাহার চমকে হাত পিছনে নিয়ে গিয়ে আড়াল করল আয়না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল অন্ধকারে। পাশ ফেরার শব্দ হল। মা মৃদু নাক ডাকছেন। গুলবাহার ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে গেল। আয়নায় মুখ দেখে অবাক হয়ে গেল সে। আই মেকআপ নীল, কপালের টিপ নীল, বড় ঝোলা দুলের স্টোন নীল, লিপস্টিক নীল। নিজের কানে হাত দিল সে। না, দুল নেই। আঙুল দিয়ে ঠোঁট ঘঁষল। আঙুলে নীল রং লাগেনি তো। কপালে হাত দিল। টিপ তো নেই। অবাক হয়ে আয়নায় মুখ দেখল আবার। সে হাসছে না। নীল রঙে সেজে থাকা তার প্রতিবিম্ব হাসছে।
(চলবে)
‘গুলবাহারের ঋতুচক্র’ গল্পপ্রবাহ

মৌসুমী বিলকিস।
কবি, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রপরিচালক। জন্ম মুর্শিদাবাদে। কলকাতায় বসবাস। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্মস্কুল ‘রূপকলা কেন্দ্র’ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে’ (কবিতা, ২০১৭); ‘একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যরা’ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭); ‘হলদে শাড়িটি এবং অন্যান্য অণুগল্প’ (২০১৭); ‘বোরখার প্রান্ত উড়ে যায়’ (গল্পগ্রন্থ, ২০২৬, আসছে) ‘একা এবং একরাত্রি’ (উপন্যাস, প্রকাশিতব্য)। পরিচালিত চলচ্চিত্র : ‘কবি’ (তথ্যচিত্র, ২০০৪); ‘শবনম’ (শর্ট ফিকশন, ২০০৪); ‘সবুজের অভিযান’ (তথ্যচিত্র, ২০০৫); ‘আবাদ’ (ডকুফিকশন, ২০১১)। নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্র : ‘সাউন্ড অফ কসমিক সেলফ’ (তথ্যচিত্র), ‘ওয়াকিং থ্রু দ্য ফায়ার’ (তথ্যচিত্র), ‘বাখ ইন দ্য আফটারনুন’ (ফিকশন) ইত্যাদি। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অনীক দত্ত সহ অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। বিভিন্ন দৈনিক, সাহিত্যপত্রিকা ও ওয়েবজিনে নিয়মিত লেখেন।



