- ৩৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ‘গোপনীয়তা’ কেন—সরকারের কাছে ১০ প্রশ্ন
ঢাকা : প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ ঘিরে স্বচ্ছতা, পরিবেশগত প্রভাব, পানি প্রবাহ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও আন্তর্জাতিক পানি বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন-সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য-উপাত্ত জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদ, পানি বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা।
শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ: কতিপয় প্রশ্ন ও প্রস্তাব’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব প্রশ্ন ও দাবি উঠে আসে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার। স্বাগত বক্তব্য দেন বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ। সভা সঞ্চালনা করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির।

মূল প্রবন্ধে ১০ প্রশ্ন
সভায় যৌথভাবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্ব ও সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান। তাঁদের উপস্থাপনায় পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের তথ্য, পানি প্রবাহ, ভাটি অঞ্চলের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, পলি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং প্রকল্প ব্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম প্রকল্পটি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে জনগণের পক্ষ থেকে ১০টি প্রশ্ন তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—প্রকল্প নিয়ে এত গোপনীয়তা কেন, ব্যারেজ কি শুধু বর্ষার পানি শীতকালে ব্যবহারের জন্য, ভাটি এলাকার ওপর সম্ভাব্য অভিঘাত কোথায় আলোচিত হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান কী, পুরোনো তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রকল্প প্রণয়ন কেন এবং বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত ব্যয়বহুল প্রকল্প কতটা উপযোগী।
অধ্যাপক খালেকুজ্জামান বলেন, প্রকল্পের সমীক্ষা ২০১০ সাল পর্যন্ত পানিপ্রবাহের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে; পরবর্তী সময়ের তথ্য এতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষণ করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে ব্যারেজের পানি ব্যবস্থাপনা ও ভাটির অঞ্চলের পানিপ্রাপ্তি নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন।

‘এত গোপনীয়তা কেন?’
সভায় বাপার সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে আপত্তি থাকতেই হবে এমন নয়, কিন্তু জনগণের অর্থে এত বড় প্রকল্পে তথ্য গোপন রাখার সুযোগ নেই। প্রকল্পের সব তথ্য জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে।
বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির জানান, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের লিখিতভাবে জানানো হলেও প্রত্যাশিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি।

প্রকল্পের পক্ষে-বিপক্ষে ভিন্নমত
সভায় পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মালিক এ ফিদা খান বলেন, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না হওয়ার কারণেই একপেশে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি সম্পূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কাছে প্রকাশের দাবি জানান।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর পদ্মা ব্যারেজের পলি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, গঙ্গা-পদ্মা অত্যন্ত পলিবাহী নদী হওয়ায় ব্যারেজ নির্মাণের পর বিপুল পলি আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং তা অপসারণ করা কঠিন ও ব্যয়বহুল হতে পারে।
অন্যদিকে কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম খান প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিলের বদলে উত্থাপিত পরিবেশগত ও কারিগরি আপত্তিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন। তিনি মনে করেন, প্রকল্পটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, খাদ্য উৎপাদনের জন্য সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়েছে। তবে পদ্মা ব্যারেজের ক্ষেত্রে পরিবেশগত আপত্তির পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং সম্ভাব্য বিকল্পও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন বাপার সহসভাপতি খুশি কবীর, ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক আহাদ চৌধুরী, গবেষক ও সাংবাদিক শেখ রোকন এবং পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মালিক এ ফিদা খান। এছাড়া প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ এস এম মাহবুবুর রহমান প্রকল্পের পক্ষে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

৩৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প
সরকার চলতি বছরের মে মাসে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় অনুমোদন করে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং প্রকল্পটি ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পদ্মার ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট কমবে, কয়েকটি নদীতে পানিপ্রবাহ ফিরবে এবং কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সুন্দরবন অঞ্চলের লবণাক্ততা কমানোর সম্ভাবনার কথাও প্রকল্পের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সভায় আলোচকরা মনে করেন, এত বড় ও দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব, পানি প্রবাহের হালনাগাদ তথ্য, পলি ব্যবস্থাপনা, ভাটি অঞ্চলের সম্ভাব্য ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারেজ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে দেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীবন-জীবিকা এবং ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন সম্পর্কিত বিষয়ও জড়িত। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



