সমাজ

চার ফোবানা : ঐক্যের স্বপ্ন যখন বিভেদের মঞ্চ

শেয়ার করুন:

ফোবানা কার—সংগঠনের, নাকি কয়েকজন নেতার?
চার দশক পর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি সমাজ

ফোবানা। একটি নাম। একটি ইতিহাস। একটি স্বপ্ন। আর সেই নামেই আজ একাধিক সম্মেলন!

ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা—ফোবানা। প্রায় চার দশক আগে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সংগঠনকে একটি ঐক্যের ছাতার নিচে আনার প্রত্যাশা নিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই ফোবানাই যেন বিভক্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

লেবার ডে উইকেন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, ফ্লোরিডার কিসিমি ও টরন্টোয় একই সময়ে একাধিক পক্ষ ‘৪০তম ফোবানা সম্মেলন’ আয়োজন করছে। প্রত্যেক পক্ষেরই দাবি—তারাই আসল, বৈধ কিংবা ঐতিহ্যবাহী ফোবানা।

সাধারণ প্রবাসীর প্রশ্ন তাই খুব স্বাভাবিক—চারটি ফোবানার মধ্যে আসল কোনটি?

আরও বড় প্রশ্ন—ফোবানা যদি ঐক্যের জন্যই হয়ে থাকে, তাহলে আজ এই বিভক্তি কেন?

 

ফোবানা কি এখন ‘নেতা হওয়ার কারখানা’?

প্রবাসী সমাজে ফোবানাকে ঘিরে যে আলোচনা, তার একটি বড় অংশ এখন আর সংস্কৃতি, শিক্ষা কিংবা কমিউনিটি উন্নয়ন নিয়ে নয়। আলোচনার কেন্দ্রে থাকে কে সভাপতি, কে চেয়ারম্যান, কার কমিটিতে কতজন, কোন পক্ষের সঙ্গে কে—এসব।

এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।

একটি সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন যখন নেতৃত্বের পদকে সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাবের প্রধান সিঁড়ি বানিয়ে ফেলে, তখন সংগঠনের উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়। নেতৃত্ব তখন সেবার দায়িত্ব না হয়ে ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।

ফোবানাকে ঘিরে প্রবাসীদের একটি অংশের হতাশা সম্ভবত এখানেই। তাদের প্রশ্ন—ফোবানায় নেতৃত্ব পাওয়ার প্রতিযোগিতা এত প্রবল, কিন্তু ফোবানার মাধ্যমে প্রবাসী সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কাজের প্রতিযোগিতা কোথায়?

 

সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য, সম্মেলনের আগে বিভক্তি

ফোবানা সম্মেলনের আগে প্রায়ই ঐক্যের কথা শোনা যায়। সংবাদ সম্মেলনে আসে মিলেমিশে কাজ করার প্রত্যয়। বলা হয়, বিভেদ ভুলে সবাই এক প্ল্যাটফর্মে আসবেন।

কিন্তু সম্মেলনের তারিখ যত এগিয়ে আসে, অনেক সময় সেই আশাবাদী বক্তব্যের বদলে শুরু হয় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক এবং একে অপরকে অস্বীকার করার প্রবণতা।

 

শেষ পর্যন্ত?

ঐক্যের ঘোষণা থাকে সংবাদ সম্মেলনে, আর বিভক্তি থাকে সম্মেলনের মঞ্চে। এটি শুধু হাস্যকর নয়—একটি প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত হতাশাজনক।

কারণ প্রবাসে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম যখন বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সমাজকে জানার জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকায়, তখন তারা যদি দেখে বড়রা নিজেরাই একটি নামের মালিকানা নিয়ে লড়াই করছেন, তাহলে তাদের কাছে কী বার্তা যায়?

 

রাজনীতি ঢুকলে সংস্কৃতি কোথায় দাঁড়ায়?

ফোবানা আনুষ্ঠানিকভাবে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের ছায়া প্রবাসী সংগঠনগুলোতেও যে পড়ে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখানে প্রশ্ন কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—প্রবাসের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন কেন দেশের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিচ্ছবি হবে?

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে প্রবাসীদের নিজস্ব মত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই রাজনৈতিক মত যদি সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃত্ব, কমিটি, সম্মেলন ও সাংগঠনিক বৈধতার প্রশ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তাহলে ফোবানার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ফোবানার মঞ্চে শিল্পীর গান, তরুণের স্বপ্ন, গবেষকের বক্তব্য এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতির কথা শোনার কথা। সেখানে দলীয় রাজনীতির ছায়া যত বড় হবে, সাংস্কৃতিক ঐক্যের জায়গা তত ছোট হবে।

 

‘কে কত বড় অনুষ্ঠান করল’—এটাই কি সাফল্য?

ফোবানা সম্মেলন মানেই বড় মঞ্চ, আলোকসজ্জা, তারকা শিল্পী, হাজার হাজার মানুষের সমাগম—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন করতেই হবে—একটি সম্মেলনের সাফল্য কি দর্শকের সংখ্যা দিয়ে মাপা হবে, নাকি সম্মেলনের পর কমিউনিটির জন্য কী রেখে গেল তা দিয়ে?

একটি সম্মেলনে ১০ হাজার মানুষ এলো—এটি অবশ্যই সাফল্য। কিন্তু সেই আয়োজনের পর যদি তরুণদের জন্য কোনো স্থায়ী কর্মসূচি না থাকে, শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বৃত্তি না থাকে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি নিয়ে কোনো গবেষণা বা আর্কাইভ তৈরি না হয়, নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষার সঙ্গে যুক্ত করার কোনো প্রকল্প না থাকে—তাহলে সেই সাফল্য কতটা স্থায়ী?

ফোবানার মঞ্চে করতালি হয়তো এক রাতের। কিন্তু একটি ভালো উদ্যোগের প্রভাব থাকতে পারে এক প্রজন্মজুড়ে।

 

শিল্পী আসবেন, অনুষ্ঠান হবে—কিন্তু সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ?

বিদেশ থেকে শিল্পী আনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা—এসবের প্রয়োজন আছে। প্রবাসে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ধরে রাখতে এগুলোর গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।

কিন্তু সংস্কৃতি শুধু গান-বাজনা নয়। সংস্কৃতি মানে ভাষা। সংস্কৃতি মানে ইতিহাস। সংস্কৃতি মানে সাহিত্য। সংস্কৃতি মানে মূল্যবোধ। সংস্কৃতি মানে নতুন প্রজন্মের পরিচয়।

 

প্রশ্ন হলো, ফোবানার দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক পরিকল্পনা কোথায়?

প্রবাসে বেড়ে ওঠা একটি বাংলাদেশি শিশু যাতে ২০ বছর পরও বলতে পারে—‘আমি বাংলা জানি, আমি বাংলাদেশের ইতিহাস জানি, আমি আমার সংস্কৃতিকে ভালোবাসি’—তার জন্য কী করা হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর একটি তিন দিনের সম্মেলনের মঞ্চে পাওয়া যাবে না।

 

ফোবানার সবচেয়ে বড় সম্পদ মঞ্চ নয়—বিশ্বাস

ফোবানার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত অর্থের নয়, শিল্পীর নয়, হলের নয়। বিশ্বাসের।

সাধারণ মানুষ যদি না জানে কোনটি আসল, কোনটি বৈধ, কোনটি ঐতিহ্যের ধারক—তাহলে সংগঠনের নাম যত বড়ই হোক, তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল হতে থাকে।

আর একটি সংগঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার গঠনতন্ত্র নয়—মানুষের আস্থা। এই আস্থা একবার নষ্ট হলে নতুন ব্যানার, নতুন ওয়েবসাইট, নতুন সংবাদ সম্মেলন দিয়ে তা ফেরানো যায় না।

 

এখন প্রয়োজন ‘ফোবানা যুদ্ধ’ নয়, ফোবানা সংলাপ

চারটি পক্ষ যদি সত্যিই ফোবানাকে ভালোবাসে, তাহলে তাদের সামনে একটি পথ খোলা আছে।

বসুন।

কথা বলুন।

পুরনো বিরোধের হিসাব বন্ধ করুন।

স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতায় একটি জাতীয়/উত্তর আমেরিকাভিত্তিক সংলাপ আয়োজন করুন। সংগঠনের ইতিহাস, সদস্যপদ, গঠনতন্ত্র, ট্রেডমার্ক, নির্বাচনব্যবস্থা, আর্থিক স্বচ্ছতা—সবকিছু নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হোক।

প্রয়োজনে নতুন কাঠামো তৈরি হোক। প্রয়োজনে নেতৃত্বের মেয়াদ নির্ধারণ করা হোক। প্রয়োজনে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হোক। প্রয়োজনে আর্থিক হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হোক।

কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার—ফোবানা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হওয়ার কথা নয়। এটি কোনো শহর, কোনো পরিবার, কোনো গোষ্ঠী বা কোনো ব্যক্তিগত নেতৃত্বের স্থায়ী মঞ্চও হওয়ার কথা নয়।

ফোবানা উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি সমাজের একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান—অন্তত তার জন্মের উদ্দেশ্য তাই ছিল।

 

শেষ কথা

চার দশক আগে যারা ফোবানা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারা নিশ্চয়ই কল্পনা করেননি যে একদিন একই সময়ে একাধিক শহরে একই নামের সম্মেলন হবে এবং সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন করতে হবে—‘আসল ফোবানা কোনটি?’

আজ তাই ফোবানার নেতাদের কাছে প্রশ্নটি খুব কঠিন হলেও জরুরি—আপনারা কি ফোবানার জন্য লড়ছেন, নাকি ফোবানার নেতৃত্বের জন্য?

আর প্রবাসী সমাজের প্রশ্ন আরও সহজ—আমাদের সন্তানদের জন্য আপনারা কী রেখে যাচ্ছেন? আরও একটি বিভক্ত সম্মেলন? আরও একটি নতুন কমিটি? আরও একটি সংবাদ সম্মেলন? নাকি এমন একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, যার দিকে তাকিয়ে আগামী প্রজন্ম বলতে পারবে—‘এটাই আমাদের ফোবানা।’

ফোবানার সামনে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। বিভেদের মঞ্চে আরও একটি সম্মেলন আয়োজন করা সহজ; কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ঐক্য ফিরিয়ে আনা—সেটিই হবে সত্যিকারের নেতৃত্বের পরীক্ষা।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *