গল্প সাহিত্য

গুলবাহারের ঋতুচক্র / ০৫ || মৌসুমী বিলকিস

শেয়ার করুন:

শীতের শব্দমালা


ছেলেটি পাশে এসে দাঁড়াল। মোবাইলে একমনে টেক্সট করছে। গুলবাহার লম্বা করে শ্বাস নিল। মিষ্টি গন্ধ এসে লাগল নাকে। ঘুরে তাকাল সে। সাদা শার্ট, নীল ডেনিম। ছেলেটিকে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে। নিজের মনেই বলে উঠল গুলবাহার,

: বাহ!

ছেলেটি ঘুরে তাকালো তার দিকে,

: সরি।

একটু সরে দাঁড়াল ছেলেটি এবং আবার হ্যান্ডসেটে মন দিল। গুলবাহার খুঁটিয়ে দেখল ছেলেটিকে। ভাবল, আজ দিন ভালো যাবে। এখনো কোনো বাড়ি সার্ভে করা হয়নি। তার আগেই মিষ্টি গন্ধ। যতটা সম্ভব ছেলেটির পাশ দিয়ে হাঁটে গুলবাহার। লম্বা শ্বাস নেয়। আবারো মিষ্টি গন্ধ। নিজেকে বড় হালকা লাগে। মন ও শরীরের ভার কমে যায়। সে যেন উড়ে উড়েই রাস্তাটি পার হয়ে যায়।

ছেলেটি যেখানে ছিল দাঁড়িয়েই থাকে। উচ্ছে, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, সিম, টমেটো। নলেন গুড় আর পাটালির অজস্র দোকান। একটা বাজারের মধ্যে ঢুকে পড়ে সে। শীতের পসরা দেখতে দেখতে হাঁটে। নাকে লেগে থাকে ছেলেটির গন্ধ। বাজার পেরিয়ে সোজা রাস্তায় হেঁটে যে বাড়িটা তার পছন্দ হয় তার সামনে ছোট্ট মরশুমি ফুলের বাগান। একটা বারান্দা। বারান্দায় অর্কিড। রং বেরঙের ফুল। বাগান পেরিয়ে বারান্দায় উঠে আসে গুলবাহার। ভালো করে দেখে গাছগুলো। সময় নষ্ট করলে চলবে না। কলিং বেলের ওপর আঙুল সবে সে নিয়ে গেছে। ভেতর থেকে শোনা যায়,

: একদম হাত দেবে না।

গুলবাহার চমকে হাত সরিয়ে নেয়। মেয়ে কণ্ঠ কথা বলেই চলে,

: তোমাকে না বলেছি আমার জিনিসপত্রে হাত দেবে না? তোমার সবকিছুর প্রাইভেসি থাকবে আর আমার থাকবে না? কী ক’রে তুমি…

পুরুষকণ্ঠ শোনা যায়।

: বড্ড বাড়াবাড়ি করছ। অনেক সহ্য করেছি। আর…

: আর হুমকি দিও না।

: চুপ করবে? পাড়ার লোক সব বাড়ির বাইরে জমে যাবে।

: শুনুক, তোমার নোংরামি লোকে শুনুক।

গুলবাহার প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও আর দাঁড়ায় না। বারান্দা থেকে নেমে বাগান পেরিয়ে দ্রুত রাস্তায় আসে। রাস্তা থেকেও ঝগড়া শোনা যায়। কত শান্ত এবং সুন্দর বাড়িটাতেও অশান্তির মেঘ ছেয়ে আছে। মন খারাপ হয়ে যায়। চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে ছেলেটির গন্ধ পাওয়ার চেষ্টা করে। গন্ধটা পায় আর তা নিয়েই হাঁটতে থাকে। চাবিওয়ালা গোল লোহার তারের মধ্যে ঝুলে থাকা চাবিগুলোতে ঠোকাঠুকির শব্দ করতে করতে তার পাশ দিয়ে চলে যায়।

রাস্তার একটি খোলা ট্যাপে অনবরত জল পড়ে যাচ্ছে। আজ সকালের দিকে কুয়াশা কুয়াশা ছিল। এখন চড়া রোদ। মুখ পুড়ে যাচ্ছে প্রায়। শীত এখনো তেমন পড়েনি। কেমন আধাআধি হয়ে আছে শীত আর গরম। একটি ফ্ল্যাট বাড়িতে ঢুকে পড়ল সে। সিকিওরিটি নেই। বাধা দেওয়ার কেউ নেই। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এল। শুনতে পেল কোনো একটা ফ্ল্যাটের মধ্যে কুকুরের ঘেউ ঘেউ। ঠিক কোন ফ্ল্যাটে বুঝতে পারল না। ইতস্তত করে একটা ফ্ল্যাটের দরজায় বেল টিপল।

দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে বেরিয়ে এলো একটা বিশাল কুকুর আর তার দু’পা তুলে রাখল গুলবাহারের দুই কাঁধে। ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটল যে কিছু ভাবার সময়ই পেল না সে। ভয়ে একেবারে জমে গেল। কয়েক সেকেন্ড কিছুই ভাবতে পারল না। মুখ স্থির রেখে চোখ ঘুরিয়ে ভেতরের দিকে দেখার চেষ্টা করল কুকুরটাকে কেউ সামলাতে আসছে কি না। আর তক্ষুনি কুকুরটা জিভ দিয়ে তার মুখ চেটে দিল। চোখ বন্ধ করে মুখটা পিছন দিকে যতটা সম্ভব সরানোর চেষ্টা করল সে। ভেতর থেকে এক মহিলা,

: কী হল টম, কে এসেছে?

বলতে বলতে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখে প্রশ্ন নিয়ে গম্ভীর গলায় তিনি কুকুরটাকে নিরস্ত করতে চাইলেন,

: কাম ইন টম। সবার সঙ্গে এরকম করতে নেই।

কুকুরটা সঙ্গে সঙ্গে গুলবাহারকে ছেড়ে মহিলার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে তার দিকে জিভ বের করে তাকিয়ে থাকল। গুলবাহার কিছুক্ষণ বুঝতেই পারল না কী করবে। মহিলা খুব নিঃস্পৃহ গলায় জানতে চায়লেন,

: বেল বাজালেন কেন বলুন?

গুলবাহার কিছুটা ধাতস্থ হল। মুখে কুকুরের লালা চ্যাটচ্যাট করছে। কী বলতে হবে কিছুই মনে পড়ল না তার। সে মরিয়া হয়ে তবু কথা বলল,

: মানে ম্যাম, আজ এমন একটা জিনিস আপনার জন্য নিয়ে এসেছি যেটা মাখলে সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশন বেড়ে যায়। দামও বেশি নয়। এই দেখুন…

গুলবাহার ব্যাগ থেকে পারফিউমের বোতল বের করে। বোতলটা মেয়েদের কোমর থেকে নীচের অংশের আদলে তৈরি। মহিলার মুখ গম্ভীর থেকে কিছু নমনীয় হয়ে আসে। ফিসফিস করে বলেন,

: সত্যি বলছ?

গুলবাহার এতটা আশা করেনি। বরং কুকুরের চক্করে পড়ে ডেমনস্‌ট্রেট করার ফর্মাল কথাবার্তা সে ভুলেই গিয়েছিল। মহিলাকে দেখেও মনে হয়েছিল খুব রাগী। এত সহজে পাথর গলবে বোঝেনি। মহিলা আবার ফিসফিস করলেন,

: তুমি কাউকে বলবে না তো?

গুলবাহার ‘না’ সূচক মাথা নাড়ে। মহিলা আরো গলা নামিয়ে বলেন,

: আমার স্বামী আমার সঙ্গে বিছানায় আসতেই চায় না। রাতদিন অল্পবয়সী মেয়েগুলোর সঙ্গে থাকে। মডেল কনসালট্যান্ট, বুঝলে না? আমার সেক্সুয়াল রিলেশন বলতে টম একটু সাপোর্ট দেয়। মানুষকে বিশ্বাস নেই বাবা।

গুলবাহার অবাক। কিন্তু কোনো কৌতূহল প্রকাশ করে না। কুকুরটি তখন মহিলার পা চেটে দিচ্ছে। কোনারক বা খাজুরাহোর মন্দিরে পশ্বাচারের নিদর্শন আছে বলে শুনেছে সে। তার ওই মন্দিরগুলোয় বেড়াতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তার মতো মানুষের পক্ষে বেড়ানোর কথা ভাবাও চরম বিলাসিতা। প্রাচীন ভারতীয় কামশাস্ত্রগুলির কথা শুনেছে গুলবাহার। তাতে প্রধানা মহিষীর সঙ্গে বিজয়ী অশ্বমেধের ঘোড়ার সঙ্গমের কথা নাকি লেখা আছে। কোনোটাই খতিয়ে দেখেনি সে, দেখার প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু তাই বলে কুকুর? মহিলা আরো ঘন হয়ে আসেন,

: কুকুরের সঙ্গে সবসময় পোষায় বলো? দেখি তোমার পারফিউম মেখে, বর যদি ফিরে…

মহিলা ঠোঁট চেপে কী যেন ভেবে নিলেন।

: আচ্ছা, দুটো বোতলই দাও। তুমি যদি আর না-আসো তো…

গুলবাহার মৃদু হাসি মুখে দুটো বোতল বের করে দেয়। মহিলা দাম চুকিয়ে দিতে দিতে আর একবার কথা বলেন,

: তুমি এত ছোট, তোমার সামনে ঠিক…। তোমার সেক্সুয়াল অভিজ্ঞতা হয়েছে বলেও মনে হচ্ছে না। আমার কথা কারো সঙ্গে আলোচনা কোরো না, প্লিজ।  

মহিলার চোখে-মুখে অনুরোধ লেগে। গুলবাহার ঘাড় নেড়ে মহিলাকে আশ্বস্ত করে। মহিলাকে বিদায় জানিয়ে তাড়াতাড়ি রাস্তায় নেমে আসে। প্রথমেই রাস্তার ট্যাপ কলটার কাছে আসে। মুখে বারবার জলের ঝাপটা দেয়। ব্যাগ থেকে ফেস ওয়াশের ছোট্ট একটা বোতল বের করে হাতে-মুখে সাবান দেয়। ব্যাগটা জল বাঁচিয়ে মাটিতে নামানো। মুখে জোরে জোরে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। কিছুতেই চ্যাটচেটে ভাবটা তার মুখ থেকে যাচ্ছে না যেন। আবার ঝাপটা দেয়।

মুখে আঘাত করে স্লো মোশনে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে জল। মহিলার গায়ে দু’পা তুলে উঠে পড়ে কুকুরটি। মহিলা নগ্ন। তার সারা শরীর চাটে কুকুর। স্তনের বোঁটা লেহন করে। মহিলা হাত দিয়ে কুকুরটিকে আদর করেন। গুলবাহারের মুখ স্পর্শ করে ছড়িয়ে যাওয়া জল মাটিতে এসে পড়ে।

আবারো মুখে ঝাপটা দেয় গুলবাহার। আবারো তার মুখ স্পর্শ করে জল স্লো মোশনে ছড়িয়ে যায় চারদিকে। কুকুর ও মহিলা সঙ্গমরত। মহিলা শব্দ করছেন, সুখের। দীর্ঘ আদর চলতে থাকে।

: এই মেয়ে, এবার কলটা ছাড়ো।

কথা শুনে চমকে চোখ খোলে গুলবাহার। ছড়িয়ে যাওয়া জল এতক্ষণে মাটিতে পড়ে। এক মহিলা বালতি নিয়ে জল নিতে এসেছেন। মহিলার শাড়ি ধরে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একটি বাচ্চা তাকে দেখছে। গুলবাহার তাড়াতাড়ি কল থেকে সরে যায়। মহিলা বালতি বসান ট্যাপের মুখে। প্লাস্টিক বালতিতে শব্দ ক’রে জল পড়ে। রুমাল বের ক’রে মুখ মোছে গুলবাহার। মহিলা বালতি ভর্তি ক’রে নিয়ে চলে যান। বাচ্চাটাও হেঁটে যায় তার পিছন পিছন। প্রায় সন্ধে হব হব করছে।

রাস্তায় খুব বেশি লোকজন নেই। এদিকটা একটু বেশি নির্জন। সে দ্রুত হাঁটা দেয় বড় রাস্তার দিকে। অফিসে ফেরার আগে আরো কিছু কাস্টমার সার্ভে করতে হবে। আচ্ছা, মহিলার কুকুরও কী তাকে বিট্রে করতে চায়? অন্য মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গা চেটে দিচ্ছে!

এতক্ষণে মহিলার কথার একটা অর্থ সে দাঁড় করায়, ‘সবার সঙ্গে এরকম করতে নেই’, কুকুরটাকে বলেছিলেন মহিলা। কুকুরটার ওপর কী অধিকারবোধ তৈরি হয়েছে মহিলার? নিজের রসিকতায় নিজেই মনে মনে হাসে। এমন কেউ নেই যার সঙ্গে বিষয়টা শেয়ার করা যাবে। বোনকে তো বলাই যাবে না। মাকে বলা যেত কিন্তু কুকুর শুনলে বেজায় আঁতকে উঠবেন।

মাকে তো এই প্রোডাক্টের গুণাগুণ সম্পর্কেও কিছু বলা যায়নি। অবশ্য সে পারফিউম বিক্রি করছে জানেন মা। জানেন এটা সাধারণ পারফিউম। প্রোডাক্ট সম্পর্কে তাদের যা বলা হয়েছে আদতে তা হয় কি না কে জানে। যদি সত্যি সত্যি না হয় সেই মহিলা তো হতাশায় মরে যাবেন। কোনোদিন হাতের মুঠোয় পেলে গুলবাহারকে গুঁড়ো করে ফেলবেন, অন্তত তাঁর প্রথম দিকের গম্ভীর মুখ দেখে তাই মনে হয়েছে। তাঁর প্রতি তাঁর স্বামীর যদি আগ্রহ না-থাকে তো গুলবাহার কী করতে পারে?

ভাবতে ভাবতে অনেকটা হেঁটে ফেলেছে সে। রাস্তার পাশের একটা কয়েকতলার ফ্ল্যাটবাড়িতে ঢুকে পড়ে গুলবাহার। প্রায় সবকটা ফ্ল্যাট ভিজিট করে। সব ফ্ল্যাটেই মধ্যবয়স্ক মহিলারা। সেজেগুজে বসে বসে টেলি ধারাবাহিক দেখছেন। সম্ভবত সবাই অপেক্ষা করছেন, স্বামী ছেলে-মেয়েরা কখন কাজ থেকে ফিরবে। এদের প্রত্যেকেই একাধিক পারফিউমের বোতল কিনলেন।

একজন মহিলা তো ষাটের ওপরে বলে মনে হল। ছোট ছোট চুল হালকা ব্রাউন রঙে রাঙানো, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, পরিপাটি করে শাড়ি পরা। মহিলা ‘সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশন’ শব্দ দু’টি শুনে তাকে ভেতরে ডেকে নিলেন। দরজা দিয়ে মুখ বার করে চারপাশ দেখে নিলেন। দরজা বন্ধ করলেন। দামি সোফায় বসে গুলবাহার দেখল, দেয়ালে টাঙানো বেশ কিছু ছবি। অল্পবয়সী প্রচুর ছেলেদের মাঝখানে মহিলাকে চিহ্নিত করা যাচ্ছে। আরো কিছু ছবি টিনএজ মেয়েদের সঙ্গে। দেখেই বোঝা যায় বিত্তবান ঘরের ছেলে-মেয়ে এরা। মহিলা তার মুখোমুখি সোফায় বসেন।

: আমি সেক্স ট্রেনার। ছেলে-মেয়েদের যৌনতা শেখাই।

কথা শুনে ছবি থেকে চোখ সরিয়ে তাঁর দিকে মনোযোগ দিল গুলবাহার।

: এরা ছাড়াও অবশ্য নানান বয়সের মানুষ তাদের সেক্স রিলেটেড সমস্যা বা সেক্স বিষয়ক কোনোকিছু ডিসকাস করতে আসে। যে যেমন চায় তেমন টেকনিক তাদের শিখিয়ে দিই। কীভাবে আরো উত্তেজনা বাড়ানো যায়, কীভাবে স্টে করা যায় অনেকক্ষণ, কীভাবে এড়াতে হয় নানান সেক্স ডিজিজ, ইত্যাদি শেখাই।

এমন পেশার কথা গুলবাহার কখনো শোনেনি বা পড়েনি। অবাক হয়ে শুনতে থাকে সে।

: এই পেশার জন্য আমার লাইসেন্স আছে। ওয়ার্ল্ড হেলথ প্রোটেকশন ফান্ড থেকে পেয়েছি। ওরা রীতিমতো সমস্ত পদ্ধতি টেস্ট করে আমাকে লাইসেন্স দিয়েছে। তবে কী জানো তো আমাদের দেশে প্রকাশ্যে এসব আলোচনা করা যায় না। অথচ জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেক্স। এত লুকোছাপা করলে মানুষের জীবন কী করে স্বাভাবিক হবে বলো তো!

একটি ছোট ফোল্ডার গুলবাহারের দিকে এগিয়ে দেন তিনি। ভেবে পায় না সে, এতকিছু মহিলা তাকে বলছেন কেন। ফোল্ডারটি ভাঁজ খুলে দেখতে থাকে। বিষয়টি কী, কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে সব আছে। ফ্রন্ট পেজে একটা সুন্দর ফটোগ্রাফ।

এক মেয়ের মুখ অফ হোয়াইট নেট দিয়ে আবৃত। মেয়েটির মুখ ওপরের দিকে তোলা। চোখ বন্ধ করে আছে সে। মুখের লেফট প্রোফাইল। স্ট্রং এজ লাইট। এজ লাইটটা একটা লাইনের মতো কপাল থেকে নাক, ঠোঁটের ওপর দিয়ে থুতনি ও গলার দিকে নেমে গেছে। কোনো প্রোফেশনাল ফটোগ্রাফারকে দিয়ে তোলানো বোঝাই যায়। মুখে হালকা ফিল লাইট। অসম্ভব সুখী একটা মুখ। সব মিলিয়ে লম্বাটে ফোল্ডারটি খুব সুন্দর। ফোল্ডারটি ব্যাগে ঢুকিয়ে উঠে পড়ে গুলবাহার। এই অবসরে চলে যাওয়া উচিত। প্রচুর সময় নষ্ট হচ্ছে। মহিলা কথা বললেন,

: উঠছ কেন? তোমার প্রোডাক্ট কিনব বলেই-না তোমাকে ভেতরে ডাকলাম।

ছ’টা বোতল কিনলেন মহিলা।

: অনেক কাস্টমার আসে তো। তাদের অনেককে দেওয়া যাবে। তোমার পরিচিত বা বন্ধুবান্ধবদের পাঠাতে পারো আমার কাছে। তোমার জন্য অবশ্য ফ্রি।

এতক্ষণে বুঝল গুলবাহার। তাঁর পেশার সঙ্গে তার প্রোডাক্টের যোগাযোগ আছে বলেই এতক্ষণ সময় দিলেন মহিলা। ফ্রি হলেও একজন অপরিচিত মহিলার কাছে যৌনতা শিখতে আসবে, এখনো এতটা সে ভাবতে পারছে না। হেসে নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে। মহিলা দরজায় দাঁড়িয়ে,

: যে-কোনো সময় আসতে পারো। একটা কল করলেই হবে। ফোল্ডারে নম্বর আছে।

মহিলা বেশ ভদ্র। কথার ডেলিভারি ও কণ্ঠস্বরও আকর্ষণীয়। গুলবাহারের একটা প্রশ্ন মনে এসেছিল, এই অদ্ভুত পেশার কথা মাথায় এল কী করে? কিন্তু প্রথম সাক্ষাতেই এরকম প্রশ্ন শোভনীয় হবে না ভেবে করতে পারেনি। অবশ্য উনি যেরকম খোলামেলা জিজ্ঞেস করাই যেত।

এইসব ভাবতে ভাবতে সে আর-একটা ফ্ল্যাটে বেল বাজাল। দরজা খুললেন চোখে রিমলেস চশমা সৌম্যকান্তি এক প্রৌঢ়, হাতে ধরা বইয়ের পৃষ্ঠা আঙুল ঢুকিয়ে চিহ্নিত করা। বই পড়তে পড়তে দরজা খুললেন বোঝা যায়। গুলবাহার অপ্রস্তুত। এই প্রোডাক্ট সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সে কোনো পুরুষকে ডেমনস্‌ট্রেট করেনি। তবু সামনে যখন বান্দা হাজির পালিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কিছু একটা তো বলতেই হবে। কথাবার্তা বলে যদি তার প্রোডাক্ট বিক্রি হয় তো খারাপ কি।

ভদ্রলোকের চোখের দিকে না-তাকিয়ে মরিয়া হয়ে প্রোডাক্টের গুণাগুণ বলতে থাকে। নিজের ভেতর একটা অস্বস্তি সে টের পায়। ভদ্রলোক মন দিয়ে শোনেন। গুলবাহারের কথা শেষ হলে ধীরে ধীরে বলতে থাকেন,

: আমার তো এমনিই… বুঝতেই পারছ, তোমার পারফিউম দরকার হবে না। ‘তুমি’ করেই বলছি। তুমি আমার ছাত্রীদের সমবয়স্ক।  

গুলবাহার মাথা একদিকে কাত করে সম্মতি দেয়। কিন্তু কিছুতেই ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকাতে পারে না। সে চোখ পিট পিট করে একবার দেয়ালের দিকে, একবার নিজের অস্থির হাতের দিকে, একবার মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে।

: তাছাড়া কলেজ ছুটি। আমার প্রিয় ছাত্রীরা নেই।

গুলবাহার নমস্কার জানিয়ে চলে যাতে চায়। অধ্যাপক বোঝেন তার অস্বস্তি।

: লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। তুমি ভেতরে আসতে পারো।

গুলবাহার মাথা নেড়ে অসম্মতি জানায়।

: আমি কিন্তু কাউকে এক্সপ্লয়েট করি না। বরং বলতে পারো ওরাই আমাকে এক্সপ্লয়েট করে। বয়ফ্রেন্ডদের নিয়ে এসে এখানে থাকা, খাওয়া, রাত কাটানো…। ওদের পরীক্ষার খাতা আমার কাছে এলে নম্বর বেশি দিই, বুঝলে? ওদের বয়ফ্রেন্ডদেরও দিই। কারো কারো রিসার্চ পেপার লিখেও দিই। ছাত্রীদের ফিল্ড স্টাডি করার দরকার হলে বাইরে নিয়ে যাই। কয়েকদিন একসঙ্গে থাকি। তবে এমনিতেই ওরা ভালো লেখে। আমার ছাত্র-ছাত্রী তো!

গুলবাহার আর দেরি করতে চায় না। নমস্কার ক’রে সরে পড়তে চায়।

: এতক্ষণ সময় দিলে যখন, দাও তোমার একটা পারফিউম।

অধ্যাপক একটা বোতল নিয়ে দাম মিটিয়ে দিলেন। কলেজে পড়ার সময় অধ্যাপকদের সঙ্গে ছাত্রীদের সম্পর্ক নিয়ে অনেক কানাকানি শুনেছে গুলবাহার। এমনকি কোনো সৌম্যদর্শন অধ্যাপকদের নিয়ে নিজেদের মধ্যে রসিকতাও করেছে। কিন্তু এতটা সে জানত না। হায়ার স্টাডি করার সুযোগ হয়নি বলেই হয়তো। তার মানে সব ছাত্রী বা সব অধ্যাপক এরকম তা তো নয়।

অনেক ছাত্রকেও বিশেষ চোখে দেখেন অধ্যাপকরা। লবি ঠিক রাখতে ছাত্র রাজনীতি করা ছেলেদের যথেষ্ট সাহায্য করেন কোনো কোনো অধ্যাপক। রাজনীতি করা ছেলেমেয়েগুলো কলেজে পড়তে এসে পড়াশোনা ছাড়া আর সবকিছু করে। কোনো অধ্যাপকের কল্যাণে পরীক্ষায় ঠিক উৎরে যায়। পড়াশোনা শেষ হলে লবির জোরে এদের কেউ কেউ কলেজে পড়ানোর সুযোগও পেয়ে যায়। এই তো হল আমাদের কলেজগুলোর হাল হকিকত।

ছেলেটি মোড়ক হাতে নিয়েই পারফিউমের বোতলটি ভেতর থেকে বের করে ফেলল।

: টেস্ট করা যাক।

আর একজন ছেলে ঘরে ব’সে আছে। তার গায়ে পারফিউম স্প্রে করছে ছেলেটি।

: আপনি একটু বাইরে ওয়েট করুন, প্লিজ।

বলেই দরজা বন্ধ করে দিল ছেলেটি। দু’জন ছেলেই হ্যান্ডসাম। রোজ নিয়ম করে এক্সারসাইজ করে বোঝা যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে গুলবাহারের অস্বস্তি হতে লাগল। কাজ হয়নি বলে টাকা না-দিলে মুশকিলে প’ড়ে যাবে। তার ওপর তাকে অপদস্থ হতে হবে কি না কে জানে। সত্যিই তো সে পারফিউমের গুণ যাচাই করে নিয়ে আসেনি। তার গ্রুপ লিডার তাদের যেভাবে এই প্রোডাক্ট সম্পর্কে শিখিয়ে দিয়েছে সেভাবেই সে ডেমনস্‌ট্রেট করেছে।

তার কেমন ভয় ভয় করছে। ছেলে দু’জন ভদ্রসভ্য বলেই মনে হচ্ছে।  কিন্তু হঠাৎ করে তার ওপর যদি চড়াও হয় বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। টাকা দেয়নি বলে চলে যেতেও পারছে না। এমন মুশকিলে সে জীবনে পড়েনি। ঘরের ভেতর থেকে নানারকম শব্দ ভেসে আসছে। পারফিউম কাজ করেছে বুঝতে পেরেও তার অস্বস্তি কমল না। গে-দের সম্পর্কে শুনেছে সে। কিন্তু এভাবে তাদের মুখোমুখি হতে হবে কল্পনাও করেনি। তার নিজের কাছে যথেষ্ট টাকা থাকলে সে এখান থেকে এক্ষুনি কেটে পড়ত। কোম্পানিকে দিয়ে দিতো একটা পারফিউমের দাম।

পরিস্থিতির ওপর বিরক্ত হয়ে সিঁড়ির ওপর ব’সে পড়ে। পা’দুটো টনটন করছে। একটা অবসাদ কাজ করছে ভেতরে ভেতরে। সাপ্তাহিক অফ পেতে এখনো কয়েক দিন বাকি। দরজাটা সামান্য খুলে গেল। যে ছেলেটি বোতল নিয়েছিল সে একটা তোয়ালে কোমরে জড়িয়ে খালি গায়ে এসে দাঁড়াল এমনভাবে ঘরের ভেতরটা যেন দেখা না-যায়। গুলবাহার তাকে দেখেই উঠে দাঁড়াল।

: সরি, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করালাম।

ছেলেটি দুঃখ প্রকাশ করে টাকা দিয়ে দিল। হাসি মুখে টাকাটা নিল সে। ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে চলল অফিসের দিকে। হেব্বি সেক্সি! যে কোনো মেয়ে অ্যাট্রাক্টেড হবে। বেচারা মেয়েগুলো কী করে জানবে ছেলেটি সমকামী।

এইসব অভিজ্ঞতার শরিক হতে হতে শীতকাল পার করে ফেলে গুলবাহার। অবাক হয়ে ভাবে মানুষগুলি কেমন অকপটে নিজেদের মেলে ধরল তার কাছে। কেন এমন হল? উত্তর জানা নেই। শুধু জানে সে, এবারে শীত পড়ল না তেমন। কলকাতার আবহাওয়া যেন কেমন গুলিয়ে গেছে। যথারীতি কোনো শীতের পোশাকও কেনা হল না তার। ভুটিয়ারা গরম জামাকাপড় বেঁধেছেদে নিজের দেশে ফিরে গেল।

গুলবাহারের ঋতুচক্র গল্পপ্রবাহ

মৌসুমী বিলকিস। কবি, কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রপরিচালক। জন্ম মুর্শিদাবাদে। কলকাতায় বসবাস। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ইন্দো-ইতালীয় ফিল্মস্কুল ‘রূপকলা কেন্দ্র’ থেকে চলচ্চিত্র পরিচালনা বিষয়ে পোস্টগ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : ‘এবং আমার চুলগুলি ফণা তুলছে’ (কবিতা, ২০১৭); ‘একাকী কয়েকটি জীবন ও অন্যরা’ (গল্পগ্রন্থ, ২০১৭); ‘হলদে শাড়িটি এবং অন্যান্য অণুগল্প’ (২০১৭); ‘বোরখার প্রান্ত উড়ে যায়’ (গল্পগ্রন্থ, ২০২৬, আসছে) ‘একা এবং একরাত্রি’ (উপন্যাস, প্রকাশিতব্য)। পরিচালিত চলচ্চিত্র : ‘কবি’ (তথ্যচিত্র, ২০০৪); ‘শবনম’ (শর্ট ফিকশন, ২০০৪); ‘সবুজের অভিযান’ (তথ্যচিত্র, ২০০৫); ‘আবাদ’ (ডকুফিকশন, ২০১১)। নির্মীয়মাণ চলচ্চিত্র : ‘সাউন্ড অফ কসমিক সেলফ’ (তথ্যচিত্র), ‘ওয়াকিং থ্রু দ্য ফায়ার’ (তথ্যচিত্র), ‘বাখ ইন দ্য আফটারনুন’ (ফিকশন) ইত্যাদি। সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, অনীক দত্ত সহ অনেক প্রথিতযশা পরিচালকের সঙ্গে। বিভিন্ন দৈনিক, সাহিত্যপত্রিকা ও ওয়েবজিনে নিয়মিত লেখেন।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *