সমাজ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু ফিলিস টেলর আর নেই

শেয়ার করুন:
  • ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের অস্ত্রবাহী জাহাজ ঠেকাতে ‘Blockade’ আন্দোলনে নেতৃত্ব; বাংলাদেশের বই ও সংস্কৃতির প্রতিও ছিল গভীর অনুরাগ

ফিলাডেলফিয়া প্রতিনিধি

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু, শান্তিকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সমাজসেবী ফিলিস টেলর আর নেই। গত ৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৮৪ বছর বয়সে ফিলাডেলফিয়ার অদূরে উইন্ডমুরের KeystoneCare Hospice-এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে হারাল ফিলাডেলফিয়া।

ফিলিস টেলর শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিলেন না; জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি শান্তি, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। নাগরিক অধিকার, কারাবন্দিদের স্বাস্থ্য ও অধিকার, হসপিস সেবা, অভিবাসী ও শরণার্থীদের সহায়তাসহ বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে ফিলিস টেলরের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে ১৯৭১ সালের ‘Blockade’ আন্দোলনের জন্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন চরম পর্যায়ে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে পাকিস্তানের জন্য অস্ত্র পরিবহনের বিরুদ্ধে একদল মার্কিন শান্তিকর্মী ও বাংলাদেশি অ্যাক্টিভিস্ট অহিংস আন্দোলন গড়ে তোলেন। ফিলিস টেলর ও তাঁর স্বামী রিচার্ড টেলর ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক।

১৯৭১ সালে ফিলাডেলফিয়া, বাল্টিমোর ও আশপাশের এলাকার বাংলাদেশি এবং মার্কিন শান্তিকর্মীরা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কাছে অস্ত্র সরবরাহের প্রতিবাদে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। একপর্যায়ে ছোট ছোট ক্যানো ও ডিঙি নৌকা নিয়ে তাঁরা পাকিস্তানের জন্য অস্ত্রবাহী জাহাজের চলাচল ঠেকানোর চেষ্টা করেন। বাল্টিমোর বন্দরে পাকিস্তানের একটি জাহাজকে ঘিরে তাঁদের নৌ-অবরোধ সে সময় ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে।

এই আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশি প্রবাসী, শান্তিকর্মী, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের কর্মীরাও যুক্ত ছিলেন। আন্দোলনকারীদের অনেকে গ্রেপ্তার হন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে এই অহিংস প্রতিবাদ বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরির প্রচেষ্টার একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।

‘Blockade’ ইতিহাস সংরক্ষণে ভূমিকা

১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের ঘটনা পরবর্তীতে প্রামাণ্যচিত্র ‘Blockade’-এর মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়। বাংলাদেশি-আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা সৈয়দ আরিফ ইউসুফ এই প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এতে রিচার্ড টেলর, ফিলিস টেলর এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশি অ্যাক্টিভিস্টসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ তুলে ধরা হয়েছে।

ফিলিস টেলরের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও আন্তরিকতা।

২০২৫ সালের নিউইয়র্ক বাংলা আন্তর্জাতিক বইমেলার প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি উপস্থিত থেকে বাংলাদেশি লেখক, পাঠক ও আয়োজকদের উৎসাহিত করেন। একই বছর ফিলাডেলফিয়া বইমেলার প্রধান অতিথি হিসেবেও তিনি অংশ নেন। বাংলাদেশি কমিউনিটির সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর উপস্থিতি ও উৎসাহ অনেকের কাছে ছিল বিশেষ অনুপ্রেরণার।

শুধু অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকাই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত বই সংগ্রহেও তিনি ব্যক্তিগত আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। গত বছর ‘Blockade’ বইটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছিল না এবং বইটি ‘Out of Print’ হয়ে গিয়েছিল। তখন বাংলাদেশি কমিউনিটির পক্ষ থেকে বইটি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলে ফিলিস টেলর নিজেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসেন। তিনি ৫০টি বইয়ের অর্ডার দেন এবং বইটি প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেন। এমনকি ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা প্রকাশকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে বইগুলো সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পক্ষে পরিচালিত ‘Blockade’ আন্দোলনের স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর এই ব্যক্তিগত উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মানবিক কর্মকাণ্ডেও অনন্য

ফিলিস টেলরের মানবিক কর্মকাণ্ড ছিল বহুমাত্রিক। তিনি পেশাগত জীবনে নার্স হিসেবে কাজ করেছেন এবং দীর্ঘ সময় হসপিস সেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফিলাডেলফিয়ার কারাগার ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রিফ কাউন্সেলিংয়ের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। অভিবাসী ও শরণার্থীদের সহায়তাকারী বিভিন্ন উদ্যোগেও তিনি কাজ করেছেন।

তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন ফিলিস। তাঁর স্বামী রিচার্ড টেলর ২০২৪ সালে মারা যান। ফিলাডেলফিয়ার Germantown এলাকার সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের বসবাস ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক ছিল।

স্মরণসভা রোববার

ফিলিস টেলরের জীবন ও কর্ম স্মরণে আগামী রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ফিলাডেলফিয়ার Germantown Friends Meeting, 47 W. Coulter St., Philadelphia, PA 19144-এ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠান চলবে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। দরজা খুলবে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে।

পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু, সহকর্মী, শান্তিকর্মী এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা স্মরণসভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানে ফিলিস টেলরের সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ থাকবে। পরে তাঁর জীবনের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ও ছবি প্রদর্শনেরও ব্যবস্থা থাকবে।

যারা সরাসরি উপস্থিত হতে পারবেন না, তাঁদের জন্য Zoom-এর মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে যাঁরা নিজেদের অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করেছিলেন, ফিলিস টেলর তাঁদের অন্যতম। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নয়; পরবর্তী জীবনেও তিনি বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ধরে রেখেছিলেন।

তাই ফিলিস টেলরের বিদায় শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, ফিলাডেলফিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও এক আবেগঘন মুহূর্ত। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো এই মার্কিন বন্ধুর স্মৃতি তাঁর মানবিক কাজ এবং বাংলাদেশের প্রতি তাঁর দীর্ঘদিনের ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *