—১৬ বছরের কাভানের যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলে ডাক—ম্যানচেস্টার সিটির পথে—ফুটবলে সুলিভান পরিবারের অনন্য যাত্রা
ফিলাডেলফিয়া প্রতিনিধি
একই পরিবারের চার ভাই—দুজন বাংলাদেশের জার্সিতে, দুজন যুক্তরাষ্ট্রের জার্সিতে। চার ভাইয়েরই ফুটবল ক্যারিয়ারের শিকড় ফিলাডেলফিয়ার বিখ্যাত Philadelphia Union Academy-তে। সুলিভান পরিবারের এই ব্যতিক্রমী ফুটবলযাত্রা এখন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশের ফুটবলপ্রেমীদেরই নজর কেড়েছে।
পরিবারের সবচেয়ে আলোচিত নাম এখন ১৬ বছর বয়সী কাভান সুলিভান। ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের এই তরুণ মিডফিল্ডার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ জাতীয় ফুটবল দল—USMNT-তে ডাক পেয়েছেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর আন্তর্জাতিক উইন্ডোর জন্য ঘোষিত ২৮ সদস্যের দলে তাঁর নাম রয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে এটি তাঁর প্রথম ডাক।
জাতীয় দলের হয়ে এখনো তাঁর অভিষেক হয়নি। তবে আসন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নামলে কাভান যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম কম বয়সী সিনিয়র আন্তর্জাতিক ফুটবলার হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়তে পারেন। সর্বকনিষ্ঠ USMNT অভিষেকের রেকর্ড এখনো ফ্রেডি আদুর—২০০৬ সালে ১৬ বছর ৭ মাস ২০ দিন বয়সে তিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন। কাভানের বয়স এখন ১৬ বছর।

চার ভাই, দুই দেশের জাতীয় দল
সুলিভান পরিবারের চার ভাইয়ের ফুটবলযাত্রা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বড় ভাই কুইন সুলিভান যুক্তরাষ্ট্রের যুব ও সিনিয়র ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত এবং ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলেছেন। তাঁর ছোট ভাই রোনান সুলিভান ও ডেকলান সুলিভান বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। আর ১৬ বছর বয়সী কাভান এবার যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র জাতীয় দলের দরজায় পৌঁছে গেছেন।
রোনান ও ডেকলান যমজ ভাই। তাঁদের মায়ের পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তাঁরা বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পান। ২০২৬ সালের SAFF অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের চূড়ান্ত ২৩ সদস্যের দলেও দুজন জায়গা করে নেন।
বাংলাদেশের হয়ে রোনান-ডেকলানের যাত্রা আরও স্মরণীয় হয়ে ওঠে SAFF অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে। বাংলাদেশের হয়ে দুই ভাইয়ের পারফরম্যান্স নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

মাত্র ১৪ বছর বয়সেই পেশাদার ফুটবলে
কাভান সুলিভানের উত্থান শুরু হয় খুব অল্প বয়সে। ২০২৪ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন তাঁকে প্রথম দলে চুক্তিবদ্ধ করে। চুক্তিটি ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তখনই তিনি MLS-এর ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী পেশাদার চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের একজন হিসেবে আলোচনায় আসেন।
ইউনিয়ন একাডেমিতে কাভানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। বয়সভিত্তিক বিভিন্ন দল পেরিয়ে তিনি দ্রুত প্রথম দলে উঠে আসেন। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমবারের মতো CONCACAF অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং টুর্নামেন্টের Golden Ball অর্জন করেন।
২০২৬ মৌসুমে তাঁর পারফরম্যান্স আরও নজর কাড়ে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে ২৩ ম্যাচে তাঁর গোল ৬টি এবং অ্যাসিস্ট ১১টি বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ
কাভানের ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় অধ্যায় ইতোমধ্যে সামনে রয়েছে। তাঁর পেশাদার চুক্তির কাঠামোর অংশ হিসেবে ১৮ বছর বয়সে Manchester City-তে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কাভান নিজেও ম্যানচেস্টার সিটিতে ভবিষ্যৎ যাত্রার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন।
তবে ১৬ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়ের ভবিষ্যৎ বাজারমূল্য কত হবে—এটি এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বাংলাদেশি ফুটবলভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাভানের বর্তমান বাজারমূল্য ১০ মিলিয়ন ডলার বলে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ফুটবল ডেটাবেসে তাঁর মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, একটি সাম্প্রতিক ডেটাবেসে তাঁর মূল্য €৪.৭ মিলিয়ন এবং অন্য একটি মডেলে €১১.৮ মিলিয়ন দেখানো হয়েছে। ফলে ১০ মিলিয়ন ডলারের অঙ্কটিকে নিশ্চিত বা আনুষ্ঠানিক বাজারমূল্য হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়ার পর তাঁর মূল্য কত হতে পারে—তা নির্ভর করবে মূলত নিয়মিত প্রথম দলে খেলা, গোল-অ্যাসিস্ট, জাতীয় দলের পারফরম্যান্স, ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। তাই ভবিষ্যৎ মূল্য নিয়ে এখনকার যেকোনো অঙ্ক মূলত অনুমাননির্ভর।

জাতীয় দলে কাভানের নতুন অধ্যায়
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলে কাভানের ডাক এসেছে এমন একটি সময়ে, যখন দেশটির ফুটবলে নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার প্রক্রিয়া চলছে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর আন্তর্জাতিক উইন্ডোতে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ রয়েছে পেরু, চিলি, মেক্সিকো ও কানাডার বিপক্ষে।
এই দলে কাভানসহ বেশ কয়েকজন তরুণ খেলোয়াড় প্রথমবারের মতো সিনিয়র পর্যায়ে সুযোগ পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো স্পষ্ট করেছেন, এই দলটি ভবিষ্যতের জন্য খেলোয়াড় মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ; বর্তমান স্কোয়াডকে ২০৩০ বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দল হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
কাভানের সামনে তাই এখন বড় সুযোগ—MLS-এর সাফল্যকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিয়ে যাওয়া।

ফিলাডেলফিয়া থেকে দুই দেশের ফুটবলে
সুলিভান পরিবারের গল্প শুধু কাভানকে ঘিরে নয়। এটি একই পরিবারের চার ভাইয়ের চারটি ভিন্ন ফুটবলপথের গল্প—যার একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে, অন্যটি বাংলাদেশে।
কুইন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল অঙ্গনে পরিচিত নাম। রোনান ও ডেকলান বাংলাদেশের যুব জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন। আর কাভান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সিনিয়র জাতীয় দলের অপেক্ষায়।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, চার ভাইয়ের ফুটবল বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি Philadelphia Union Academy। একই একাডেমি থেকে উঠে এসে দুই দেশের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার এই গল্প শুধু পারিবারিক সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন সম্ভাবনার কথাও সামনে নিয়ে এসেছে।
১৬ বছরের কাভানের সামনে এখন আরও বড় মঞ্চ। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের জার্সি, ম্যানচেস্টার সিটির ভবিষ্যৎ, MLS-এ ধারাবাহিক পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ারের পরবর্তী কয়েক বছর হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেই ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল হবে, তার উত্তর দেবে মাঠের পারফরম্যান্সই।



