- নিউইয়র্কের ঘটনা ফিলাডেলফিয়ার চালকদের জন্যও সতর্কবার্তা
ফিলাডেলফিয়া প্রতিনিধি
নিউইয়র্ক সিটিতে মাত্র তিন মাসের মধ্যে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তিন ট্যাক্সিচালকের মৃত্যু নতুন করে আলোচনায় এনেছে চালকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, মানসিক চাপ এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টি। ট্যাক্সি শ্রমিকদের সংগঠন নিউইয়র্ক ট্যাক্সি ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্স (NYTWA) বলছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই; চালকদের কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিয়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের ওয়েস্ট ভিলেজ এলাকায় ৫৩ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক জগজিৎ সিংকে তার ট্যাক্সির ভেতর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তিনি প্রায় দুই দশক ধরে নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালাচ্ছিলেন। যাত্রী নামিয়ে ৭ম অ্যাভিনিউ ও চার্লস স্ট্রিটের কাছে গাড়ি থামানোর পর তার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে সহকর্মীরা গাড়িটির অবস্থান শনাক্ত করে সেখানে গিয়ে তাকে অচেতন অবস্থায় দেখতে পান। জরুরি বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলেই তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জগজিৎ সিং স্ত্রী সারবজিত কৌর ও ১০ বছর বয়সী যমজ দুই ছেলে রেখে গেছেন। ১৫ সেপ্টেম্বর পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীরা ওয়েস্ট ভিলেজে তাকে স্মরণ করে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ওই স্মরণসভায় নিউইয়র্ক সিটি ট্যাক্সি অ্যান্ড লিমুজিন কমিশনের কমিশনার মিডোরি ভালদিভিয়াও উপস্থিত ছিলেন।

একই ধরনের আরও দুই মৃত্যু
জগজিৎ সিংয়ের মৃত্যুর আগে জুলাই ও আগস্ট মাসেও দুই ট্যাক্সিচালক তাদের গাড়ির ভেতর মারা যান।
জুলাই মাসে ৭৩ বছর বয়সী গুসতাভ বার্ট্রান্ড আদজেলি ইয়াও, যিনি রিচার্ড কুলিবালি নামেও পরিচিত ছিলেন, হারলেমে তার ট্যাক্সির ভেতর মারা যান। নিউইয়র্কের প্রধান মেডিকেল পরীক্ষকের কার্যালয় তার মৃত্যুকে প্রাকৃতিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ওই সময় নিউইয়র্কে তীব্র তাপপ্রবাহও চলছিল।
এরপর আগস্টে খলিফা সিওয়া নামের আরেক চালককে ম্যানহাটনের হেনরি হাডসন পার্কওয়ের কাছে তার ট্যাক্সির ভেতর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন এবং তার হাতে ইনসুলিন পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, নিউইয়র্কে অল্প সময়ের মধ্যে তিনজন চালক কর্মরত অবস্থায় গাড়ির ভেতর মারা গেলেন। তিনটি মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি কোনো হামলার যোগসূত্র পাওয়া যায়নি; তবে ট্যাক্সি শ্রমিকদের সংগঠন দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কাজের চাপ এবং স্বাস্থ্যসেবার প্রতি পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারার বিষয়টি সামনে এনেছে।

‘গাড়ি চালানোর জন্য কাজ, কাজ করার জন্য জীবন নয়’
NYTWA-এর নির্বাহী পরিচালক ভৈরবী দেশাইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক চালক ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ সামাল দিতে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাচ্ছেন। একই সময়ে ট্রিপের সংখ্যা ও প্রতি ট্রিপের আয় কমে যাওয়ায় চালকদের আরও বেশি সময় রাস্তায় থাকতে হচ্ছে—এমন দাবি করেছে সংগঠনটি।
ইউনিয়নের মতে, এর ফলে অনেক চালকের চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, ওষুধ গ্রহণ, বিশ্রাম নেওয়া কিংবা নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় যত্ন নেওয়ার সময় কমে যাচ্ছে। সংগঠনটি চালকদের স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো এবং শিল্পের অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছে।
নিউইয়র্কের ট্যাক্সি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষমাণ এলাকায় নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যাতে চালকেরা কর্মস্থলের কাছেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন।

ফিলাডেলফিয়ার চালকদের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
নিউইয়র্কের ঘটনাগুলো ফিলাডেলফিয়ার ট্যাক্সিচালকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে পারে। কারণ ট্যাক্সি চালানো শুধু গাড়ি চালানোর পেশা নয়—দীর্ঘ সময় বসে থাকা, যানজট, অনিয়মিত খাবার, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থাকার মতো বিষয়ও এ পেশার সঙ্গে জড়িত।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোও ট্যাক্সি ও রাইড-হেইলিং চালকদের কাজের ক্ষেত্রে যানজট ও খারাপ আবহাওয়ার কারণে চাপ এবং দীর্ঘ বা অনিয়মিত কর্মঘণ্টার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।
ফিলাডেলফিয়াতেও ট্যাক্সিচালকদের স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অতীতে আলোচনা হয়েছে। ২০১৪ সালের এক প্রতিবেদনে ফিলাডেলফিয়ার ট্যাক্সিচালকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, কম আয়, কাজের চাপ এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যার কথা উঠে এসেছিল।
তবে নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক তিনটি মৃত্যুর সঙ্গে ফিলাডেলফিয়ার চালকদের পরিস্থিতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ নেই। বরং এই ঘটনাগুলোকে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখে স্থানীয় পর্যায়ে চালকদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

ট্যাক্সি ইউনিয়নের করণীয় কী?
নিউইয়র্কের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—চালকেরা অসুস্থ হলে বা দীর্ঘ সময় কাজ করলে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ইউনিয়ন, কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কী ব্যবস্থা থাকা উচিত?
ফিলাডেলফিয়ার ট্যাক্সি সংগঠনগুলো চাইলে বিষয়টি নিয়ে চালকদের সঙ্গে মতবিনিময় করে কয়েকটি বিষয়ে আলোচনা করতে পারে—
* চালকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতা কর্মসূচি;
* দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা;
* চালকদের জন্য জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা;
* নিয়মিত বিরতি ও বিশ্রামের বিষয়ে সচেতনতা;
* চালকদের মানসিক চাপ ও আর্থিক চাপ নিয়ে আলোচনা;
* অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি না চালানোর বিষয়ে সচেতনতা;
* জরুরি পরিস্থিতিতে সহকর্মীদের দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা;
* মৃত্যুবরণকারী চালকের পরিবারের জন্য জরুরি সহায়তার কাঠামো।

একজন চালকের মৃত্যু শুধু একজনের মৃত্যু নয়
একজন ট্যাক্সিচালক যখন কর্মরত অবস্থায় মারা যান, তখন তার সঙ্গে একটি পরিবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে চালকই প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, সেখানে হঠাৎ মৃত্যু বাড়িভাড়া, গাড়ির ঋণ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
জগজিৎ সিংয়ের পরিবারের ক্ষেত্রেও এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবারের ঘনিষ্ঠজনেরা। তারা বলেছেন, অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য সরকারি ও সামাজিক সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়া প্রয়োজন।
নিউইয়র্কের এই তিনটি মৃত্যু তাই শুধু তিনটি পৃথক দুর্ঘটনা বা স্বাস্থ্যগত ঘটনা হিসেবে দেখার বিষয় নয়। এগুলো ট্যাক্সি পেশার সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষের কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।
ফিলাডেলফিয়ার ট্যাক্সিচালকদের ক্ষেত্রেও এখন প্রশ্নটি হওয়া উচিত—আমরা কি অসুস্থ হওয়ার পর ব্যবস্থা নেব, নাকি অসুস্থ হওয়ার আগেই চালকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করব?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চালক, ইউনিয়ন, কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন।



