ভাষার কিংবা অনুভূতির কোনো ট্রান্সফার হয় না—অন্তত আমি তা-ই মনে করি। এক ভাষার অনুভূতি আরেক ভাষায় কী করে অনুবাদ হবে! শব্দের অনুবাদ হতে পারে, বাক্যেরও হয়তো কাছাকাছি কোনো প্রতিরূপ তৈরি করা যায়; কিন্তু শব্দের ভেতরে যে জীবন, যে স্মৃতি, যে দীর্ঘশ্বাস কিংবা আনন্দ লুকিয়ে থাকে—তার অনুবাদ কীভাবে সম্ভব?
এক ভাষা থেকে আরেক ভাষায় গেলে মূল লেখার একটি ছায়া তৈরি হতে পারে, কখনো সেই ছায়া নিজেই হয়ে উঠতে পারে আরেকটি মৌলিক লেখা। কিন্তু হুবহু অনুভূতির অনুবাদ—আমার কাছে তা অসম্ভব বলেই মনে হয়।
এই কথাটা আরও গভীরভাবে মনে হলো একটি ক্লাসিক্যাল যন্ত্রসংগীতের মনোগ্রাহী সম্মিলন থেকে ফিরে।
শুনতে শুনতে ভাবছিলাম—আমার এই ভালোলাগা, কোনো কোনো মুহূর্তে অকারণে চোখে জল চলে আসা, কখনো বুকের ভেতর জমে থাকা অদ্ভুত এক প্রশান্তি—এসব আবার লিখব কী করে! সরোদের একটি টান, সেতারের একটি মীড় কিংবা তবলার একটি বোল যে মুহূর্তে শরীরের ভেতর দিয়ে কোথায় গিয়ে লাগে, তার কি কোনো ভাষা আছে? থাকলেও সেই ভাষার বর্ণমালা কোথায়?

এখন আমি যা লিখতে বসেছি, তার সারকথা হয়তো এতটুকুই—আমি খুব ভালো কিছু সময় কাটিয়ে এসেছি।
কিন্তু এটুকু বললে কি আসলে কিছু বলা হয়?
চার ঘণ্টার একটি অনুভূতিকে চার লাইনে লিখে দিলে, সেই চার লাইন পড়ে দুই মিনিটে আপনি কী করে আমার চার ঘণ্টার ভেতরে প্রবেশ করবেন? যে সুর আমি শুনেছি, আপনি তো সেই মুহূর্তে তা শুনছেন না। যে ঘরে বসে শুনেছি, সেই ঘরের নৈঃশব্দ্য আপনার চারপাশে নেই। শিল্পীদের আঙুলের ওঠানামা, তারের কম্পন, তবলার চামড়ায় আঙুলের স্পর্শ, সুর থেমে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ডের সেই আশ্চর্য নীরবতা—এর কোনটা আমি আপনার কাছে পৌঁছে দিতে পারব?
সম্ভবত কোনোটাই না।
এই জন্যই বারবার মনে হয়—অনুভূতির অনুবাদ হয় না। ভাষারও পুরোপুরি অনুবাদ হয় না। আমরা কেবল তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করি। কিছু শব্দ রাখি, কিছু উপমা সাজাই, কিছু স্মৃতি তুলে আনি। তারপর পাঠকের হাতে দিয়ে বলি—এই নিন, এর ভেতরে হয়তো সেই সন্ধ্যার সামান্য ছায়া আছে।

আপনি বলতে পারেন, আমার এই লেখাটা ঠিকঠাক হলো কি না। পড়ে যদি অন্তত বুঝতে পারেন যে আমি কোনো এক যন্ত্রসংগীতের সম্মিলনের কথা বলতে চাইছি, কোনো এক সন্ধ্যায় সুরের ভেতর কয়েক ঘণ্টা বসে ছিলাম—তবেই হয়তো লেখাটা কিছুটা সার্থক। আর যদি সেটুকুও বোঝাতে না পারি, তাহলে পঙ্গু আমার লেখা; অনুষ্ঠানটি নয়।
কারণ অনুষ্ঠান আর লেখা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাধ্যম। তাদের প্রকাশ আলাদা, শরীর আলাদা, এমনকি অনুভূতির পথও আলাদা।
একটি সেতারের তারে আঙুল ছুঁয়ে যে কথা বলা যায়, সেই কথা লিখতে গেলে হয়তো দশ পৃষ্ঠা লাগে। আবার দশ পৃষ্ঠায় যা বলা যায় না, সরোদের একটি দীর্ঘ টান হয়তো অনায়াসে সেই জায়গাটুকু স্পর্শ করে যায়। তবলার বোল কখনো কথার চেয়েও স্পষ্ট হয়ে ওঠে; আবার হঠাৎ থেমে যাওয়া সুরের নীরবতা এমন কিছু বলে, যার সামনে শব্দকে খুব অসহায় মনে হয়।
সেই অসহায়তা নিয়েই এই লেখা।

প্রিয় ফেরদৌস জান ভাইয়ের আয়োজনে তাঁর হানিব্রুক, প্যানসিলভেনিয়ার বাড়ির অডিটোরিয়ামে বসেছিল এই সুন্দর আয়োজন। ঘরোয়া পরিসর, অথচ সংগীতের বিস্তার যেন তার চেয়ে অনেক বড়। একটি বাড়ির অডিটোরিয়াম ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক নিবিড় আসর। কাছ থেকে শিল্পীদের দেখা, তাঁদের যন্ত্রের সঙ্গে কথোপকথন শোনা এবং একই সঙ্গে শ্রোতাদের নীরব হয়ে সেই কথোপকথনের অংশ হয়ে ওঠা—সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটি কেবল একটি ‘অনুষ্ঠান’ হয়ে থাকেনি।
এই আয়োজনে সহযোগিতা করে NAFA—নজরুল একাডেমি অফ ফাইন আর্টস। সংগীত পরিবেশনায় অংশ নেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী পণ্ডিত পার্থ সারথী চৌধুরী (সরোদ), বিদুষী মিতা নাগ (সেতার) ও পণ্ডিত শুভেন চ্যাটার্জি (তবলা)।
সরোদ, সেতার আর তবলা—তিনটি আলাদা যন্ত্র, তিনটি আলাদা স্বরভাষা। কিন্তু একসময় মনে হচ্ছিল, তারা আলাদা কেউ নয়; একই কথার তিনটি ভিন্ন উচ্চারণ। কখনো একজন কথা বলছেন, অন্য দুজন শুনছেন; কখনো একজনের রেখে যাওয়া প্রশ্ন আরেকজন তুলে নিচ্ছেন; আবার কখনো তিনজন মিলেই এমন এক ভাষা তৈরি করছেন, যে ভাষার কোনো অভিধান নেই।
সেখানেই হয়তো সংগীতের আশ্চর্য শক্তি।

ভাষা বুঝতে আমাদের শব্দ জানতে হয়, ব্যাকরণ জানতে হয়। অথচ সুরের কাছে গিয়ে সেই শর্তগুলো কেমন অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করেও তার কাছে যাওয়া যায়। কখনো কোনো অর্থ না জেনেও বুক ভারী হয়ে আসে। কখনো আনন্দের মধ্যেও বিষণ্ণতা জেগে ওঠে, আবার বিষণ্ণ কোনো সুরের ভেতর অদ্ভুত শান্তি পাওয়া যায়।
তখন মনে হয়—শিল্পের সবচেয়ে গভীর জায়গাটি হয়তো ব্যাখ্যার নয়, অনুভবের।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রখ্যাত নাট্যকার, কবি ও অনুবাদক বদরুজ্জামান আলমগীর, কবি আলী সিদ্দিকী, অভিনেত্রী সুস্মিতা গুহ রায়, সংগীতশিল্পী শর্মিলা বন্দ্যোপাধ্যায়, মুরাদ হোসেন, জলি দাস, পার্থ দেবনাথ, নার্গিস পারভীন, অভিষেক চৌধুরী, রুমানা আলম, ফারুক সলিমুল্লাহ, হেনা হোসেন, কৌশিক রায় চৌধুরী, শুভম দাশগুপ্ত, বন্দনা দার, মমতাজ জান, পারভীন, ফিরোজ, অদিতি ভট্টাচার্য, ফারুক জান, মাহফুজা জান, স্বপন দাশ, আনবান রায়, অজন্তা রায়, সুস্মিতা গুপ্ত বৈদ্য সহ আরও অনেকেই। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন শতদ্রু মজুমদার এবং ইসরাত জাহান পিকু।
চার ঘণ্টা পরে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে—এ কথা ঘড়ি বলতে পারে। কিন্তু অনুভূতিরও কি একই সঙ্গে শেষ হয়?
আমার মনে হয়, হয় না।

মানুষ অনুষ্ঠানস্থল থেকে উঠে আসে, শিল্পীরা যন্ত্র গুছিয়ে রাখেন, আলো নিভে যায়, শ্রোতারা যে যার ঘরে ফেরেন; কিন্তু কোনো একটি সুর হয়তো সঙ্গে চলে আসে। সরোদের কোনো দীর্ঘ টান, সেতারের কোনো মীড়, তবলার কোনো বোল মনের কোথাও আটকে থাকে। পরে অন্য কোনো রাতে, সম্পূর্ণ অন্য কোনো নীরবতায় হঠাৎ তার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যায়।
তখন বোঝা যায়—চার ঘণ্টার অনুষ্ঠান আসলে চার ঘণ্টায় শেষ হয়নি।
আর এই লেখাটিও সেই চার ঘণ্টার অনুবাদ নয়। বড়জোর তার একটি ছায়া। আমার ভালো লাগার পাশে কয়েকটি শব্দ রেখে দেওয়ার চেষ্টা মাত্র।
কারণ সেদিন যা শুনেছি, তা লিখে দেওয়া সম্ভব নয়। যা অনুভব করেছি, তাও কাউকে হুবহু দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
শুধু এটুকু বলা যায়—
কিছু সময় জীবনে কাটিয়ে আসা যায়, কিন্তু তার অনুবাদ করা যায় না।
আহমদ সায়েম প্রণীত অন্যান্য রচনা
কবি ও গদ্যকার



