প্রবন্ধ সাহিত্য

ব্রুকলিন ব্রিজ : ইস্পাতের শরীরে লেখা এক গল্প || রাজিয়া নাজমী

শেয়ার করুন:

পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু কাহিনি আছে, যা সময়ের ক্ষয়কেও অতিক্রম করে বেঁচে থাকে। ব্রুকলিন ব্রিজ তেমনই এক ইতিহাস—যে ইতিহাস বলে, এর ইস্পাত, পাথর ও তারের প্রতিটি স্তরে জড়িয়ে আছে এক পিতার স্বপ্ন, এক পুত্রের দায়িত্ববোধ, এক নারীর অবিচল নিষ্ঠা এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার এক অমর মানবিক গাথা।

চিত্রকরদের ক্যানভাসে, আলোকচিত্রীদের ফ্রেমে, কবিদের কাব্যে এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের দৃশ্যে বারবার ফিরে আসে ব্রুকলিন ব্রিজ। প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ পর্যটক নিউইয়র্কে এসে এই ঐতিহাসিক সেতুর সামনে দাঁড়ান। দিনের আলোয় এর গাম্ভীর্য যেমন তাঁদের মুগ্ধ করে, তেমনি সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ধরা দেয় অন্য এক রহস্যময় সৌন্দর্যে । নিউইয়র্ক শহরের স্কাইলাইনের সঙ্গে ব্রুকলিন ব্রিজ আজ এক অবিচ্ছেদ্য পরিচয়।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে প্রায় সাড়ে সতেরো হাজারেরও বেশি হাইওয়ে সেতু রয়েছে। ম্যানহাটন, কুইন্স, ব্রুকলিন, ব্রঙ্কস এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ড—এই পাঁচ বরোকে সংযুক্ত করে অসংখ্য সেতু। কিন্তু তাদের মধ্যে ব্রুকলিন ব্রিজের মর্যাদা আলাদা। এটি শুধু নিউইয়র্কের নয়, বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ও ঐতিহাসিক সাসপেনশন ব্রিজ। নিও-গথিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই সেতুই ছিল নিউইয়র্ক শহরের প্রথম স্টিল-ওয়্যার সাসপেনশন ব্রিজ, যা প্রকৌশল ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এ শুধু দুটি শহরকে যুক্ত করেনি; এটি দেখিয়েছিল মানুষের কল্পনা ও প্রযুক্তির সীমা কত দূর যেতে পারে।

কিন্তু ব্রুকলিন ব্রিজের আসল গল্প শুধু প্রকৌশল কিংবা স্থাপত্যের নয়। এর প্রতিটি ইস্পাতের তারে, প্রতিটি পাথরের স্তম্ভে জড়িয়ে আছে সংগ্রাম, বেদনা, মৃত্যু, আত্মত্যাগ এবং এক অনন্য মানবিক সম্পর্কের ইতিহাস।

যুগযুগ ধরে ব্রুকলিন ব্রিজের রেলিংয়ে অসংখ্য প্রেমিক-প্রেমিকা তালা ঝুলিয়ে তাঁদের ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী করার প্রতীকী অঙ্গীকার করেন। তালায় লিখে রাখেন নিজেদের নাম, তারপর চাবিটি ছুড়ে ফেলেন ব্রিজের নিচে ইস্ট রিভারের জলে। তাঁদের বিশ্বাস—যেমন তালাটি আর খুলবে না, তেমনি তাঁদের ভালোবাসাও কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না।

এই রীতি শুধু নিউইয়র্কেই নয়; রোম, প্যারিস, ইউক্রেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু সেতুতেই দেখা যায়। তবু ব্রুকলিন ব্রিজের এই ঐতিহ্যের পেছনে রয়েছে এক বিশেষ ইতিহাস। কারণ এই সেতুর প্রতিটি স্তম্ভ যেন নীরবে উচ্চারণ করে এক নারীর নাম—এমিলি ওয়ারেন রোবলিং।

শুধু তালা ঝুলিয়ে ভালোবাসার অঙ্গীকারই নয়, বহু যুগল এই সেতুর নিচে কিংবা আশপাশে বিয়ের শপথও নেন। তাঁদের কাছে ব্রুকলিন ব্রিজ শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি বিশ্বাস, প্রতিজ্ঞা এবং এক অবিনশ্বর ভালোবাসার প্রতীক।

এই ভালোবাসার গল্প শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি।

১৮৪৩ সালে নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন এমিলি ওয়ারেন। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের বারো সন্তানের একজন। সেই সময়ে নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু এমিলির বড় ভাই তাঁর মেধার মূল্য বুঝেছিলেন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে তিনি এমিলিকে ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউন ভিজিটেশন একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন। সেই সিদ্ধান্তই এমিলির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় তরুণ প্রকৌশলী ওয়াশিংটন রোবলিংয়ের সঙ্গে। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, আর সেই প্রেম পরিণতি পায় বিবাহে।

বিয়ের পর নবদম্পতি ইউরোপে মধুচন্দ্রিমায় যান। তবে তাঁদের সেই সফর ছিল অন্যরকম। অন্যান্য দম্পতির মতো শুধু অবকাশযাপন নয়, তাঁরা ইউরোপের বিভিন্ন সেতু ও প্রকৌশল প্রকল্প ঘুরে দেখেন। বিশেষ করে ব্রিজ নির্মাণে ব্যবহৃত আধুনিক কৌশল, কেসন প্রযুক্তি,স্টিলের তারের ব্যবহার সম্পর্কে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করেন।

কারণ তাঁদের সামনে অপেক্ষা করছিল একটি স্বপ্ন, একটি সাহসী প্রকল্প — বিশ্বের দীর্ঘতম ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ।

তখনও তাঁরা জানতেন না, এই স্বপ্ন একদিন তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির কারণ হবে। আবার সেই ট্র্যাজেডিই জন্ম দেবে এমন এক প্রেমের ইতিহাস, যা একশো চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে আছে। ছুঁয়ে থাকবে।

ব্রুকলিন ব্রিজের ইতিহাস শুরু হয় একজন স্বপ্নদ্রষ্টা প্রকৌশলীর হাত ধরে। তাঁর নাম জন অগাস্টাস রোবলিং। জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এই প্রকৌশলী পরবর্তীকালে আমেরিকায় এসে তারের দড়ি ও সাসপেনশন ব্রিজ নির্মাণে অসামান্য সুনাম অর্জন করেন।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে থেকে নিউইয়র্ক দ্রুত বর্ধনশীল এক মহানগরে পরিণত হচ্ছিল এবং ব্রুকলিন ও ম্যানহাটনের মধ্যে যোগাযোগের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছিল।

১৮৬৭ সালে জন রোবলিং নিউইয়র্কের ইস্ট রিভারের ওপর দিয়ে ম্যানহাটন ও ব্রুকলিন—এই দুই ব্যস্ত শহরকে সংযুক্ত করার জন্য এক অভূতপূর্ব সেতুর নকশা প্রণয়ন শুরু করেন। সে সময় এমন একটি সেতু নির্মাণকে অনেকে অসম্ভব বলে মনে করতেন। নদীর গভীরতা, প্রবল স্রোত, নৌযান চলাচল এবং তৎকালীন প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে যা ছিল এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা। কিন্তু রোবলিং এর প্রকৌশল-দক্ষতা এবং দূরদর্শিতাই ব্রুকলিন ব্রিজ নির্মাণের ভিত্তি রচনা হয়।

কিন্তু ভাগ্য যেন তাঁর স্বপ্নকে পূর্ণ হতে দিল না।  

১৮৬৯ সালের ২৮ জুন ফুলটন ফেরি ঘাটে নির্মাণস্থল পরিদর্শনের সময় একটি ফেরির ধাক্কায় জন রোবলিংয়ের পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আহত আঙুলটি কেটে ফেলতে হলেও তিনি আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে ‘ওয়াটার থেরাপি’ গ্রহণ করেন। সংক্রমণ ক্রমেই বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত টিটেনাসে আক্রান্ত হয়ে একই বছরের ২২ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্বপ্নের সেতুর নির্মাণ তখনও শুরুই হয়নি, অথচ তার প্রধান স্থপতি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।

জন রোবলিংয়ের মৃত্যুর পর প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পড়ে তাঁর ছেলে ওয়াশিংটন অগাস্টাস রোবলিংয়ের ওপর। বাবার মতো তিনিও ছিলেন মেধাবী, দূরদর্শী এবং সাহসী প্রকৌশলী।

ব্রুকলিন ব্রিজ নির্মাণের সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল নদীর তলদেশে বিশাল গ্রানাইট টাওয়ারের ভিত্তি স্থাপন করা। সে জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল বায়ুরোধী বিশাল কাঠামো—কেসন (Caisson)। শ্রমিকরা উচ্চচাপযুক্ত বায়ুর মধ্যে পানির নিচে দীর্ঘ সময় কাজ করতেন। তখনও চিকিৎসাবিজ্ঞান পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি, এত উচ্চচাপ থেকে দ্রুত স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে এলে মানুষের শরীরে কী ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

আজ আমরা যাকে ডিকম্প্রেশন সিকনেস বা কেসন রোগ নামে চিনি, সে সময় তা ছিল প্রায় অজানা এক আতঙ্ক। শরীরের রক্তপ্রবাহে নাইট্রোজেনের বুদবুদ তৈরি হয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা, পক্ষাঘাত, এমনকি মৃত্যুও ডেকে আনতে পারত।

দায়িত্বশীল প্রকৌশলী হিসেবে ওয়াশিংটন নিজেই নিয়মিত কেসনের ভেতরে নেমে কাজ তদারক করতেন। একদিন তিনি টানা প্রায় বারো ঘণ্টা সংকুচিত বায়ুর সেই চেম্বারে অবস্থান করেন। উপরে ওঠার পর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

কিছুদিনের মধ্যেই কেসন রোগ তাঁর শরীরকে প্রায় ভেঙে দেয়। তিনি আংশিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এমনকি স্পষ্টভাবে কথাও বলতে পারতেন না।

একটি নির্মাণ প্রকল্পের জন্য এটি ছিল ভয়াবহ সংকট। প্রধান প্রকৌশলী জীবিত, কিন্তু কার্যত কর্মক্ষম নন। চারদিকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করল—এত বিশাল প্রকল্প কি এবার থেমে যাবে?

তখনই সামনে এলেন এমিলি ওয়ারেন রোবলিং।

স্বামীর অসুস্থতার পর তিনি প্রকৌশলের বই পড়তে শুরু করলেন। স্টিলের তার, নির্মাণসামগ্রীর গুণাগুণ, স্ট্রেস অ্যানালাইসিস, কেসন প্রযুক্তি—একটির পর একটি বিষয় তিনি নিজের প্রচেষ্টায় আয়ত্ত করেন। ধীরে ধীরে তিনি স্বামীর চিন্তা, পরিকল্পনা এবং নির্দেশনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠেন।

প্রতিদিন তিনি শয্যাশায়ী স্বামী ওয়াশিংটন রোবলিং এর কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে নির্মাণস্থলে যেতেন। প্রকৌশলী, ঠিকাদার, শ্রমিক ও প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করতেন, সিদ্ধান্ত নিতেন, সমস্যার সমাধান করতেন, এবং দিনের শেষে ফিরে এসে নির্মাণকাজের প্রতিটি অগ্রগতি তাঁকে জানাতেন।

এভাবেই এমিলি হয়ে ওঠেন ওয়াশিংটন রোবলিংয়ের চোখ, কান এবং কণ্ঠস্বর।

কিন্তু তাঁর সংগ্রাম শুধু নির্মাণকাজ পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁকে আরও বড় এক লড়াই লড়তে হয়েছিল—সমাজের বিরুদ্ধে।

উনিশ শতকের আমেরিকায় নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হওয়া তো দূরের কথা, প্রকৌশলের মতো পেশায় একজন নারীর নেতৃত্ব গ্রহণ করার কথাও অধিকাংশ মানুষ কল্পনা করতে পারতেন না।

তবু এমিলি হার মানেননি। ধনী ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তিনি একের পর এক বোঝাতে থাকেন—শয্যাশায়ী হলেও ওয়াশিংটন রোবলিংই এই প্রকল্পের প্রকৃত প্রধান প্রকৌশলী এবং তাঁর নির্দেশনাতেই কাজ এগিয়ে চলেছে।

এমিলির অসাধারণ যুক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং নেতৃত্বের সামনে শেষ পর্যন্ত সবাই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ওয়াশিংটন রোবলিং তাঁর প্রধান প্রকৌশলীর পদে বহাল থাকেন, আর পর্দার আড়াল থেকে এমিলি হয়ে ওঠেন ব্রুকলিন ব্রিজ নির্মাণের প্রকৃত চালিকাশক্তি।

ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকৌশল প্রকল্প তখন এগিয়ে চলেছে এক নারীর মেধা, ধৈর্য এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ওপর ভর করে।

এরপর শুরু হয় এমিলি ওয়ারেন রোবলিংয়ের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। পরবর্তী তেরো বছর তিনি একাই বহন করেন দুটি বিশাল দায়িত্ব—একদিকে অসুস্থ স্বামী ও পরিবারের দেখাশোনা, অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রকৌশল প্রকল্পের প্রতিদিনের তদারকি।

একজন প্রকৌশলীর আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি তাঁর ছিল না। কিন্তু প্রয়োজনই তাঁকে প্রকৌশলী করে তুলেছিল। ধীরে ধীরে তিনি এমন দক্ষতা অর্জন করেন যে অনেক অভিজ্ঞ প্রকৌশলীও তাঁর বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেন।

এমিলি জানতেন, ইতিহাস হয়তো তাঁর নাম উচ্চারণ করবে না; কারণ তখনকার সমাজে একজন নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার মানসিকতা ছিল না। তবুও তিনি কাজ থামাননি।

১৮৮৩ সালে অবশেষে ব্রুকলিন ব্রিজের নির্মাণকাজ শেষ হয় । তেরো বছরের নিরলস শ্রম, অগণিত বাধা, দুর্ঘটনা, মৃত্যু ও অসুস্থতাকে অতিক্রম করে বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর প্রকৌশল কীর্তি দাঁড়িয়ে যায় ইস্ট রিভারের বুকে।

ব্রিজের উদ্বোধনের দিনটি ছিল উৎসবের দিন। হাজার হাজার মানুষ ব্রিজ দেখতে ভিড় করেছিল। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে, বিজয় ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে একটি মোরগ সঙ্গে নিয়ে এমিলি রোবলিং ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে প্রথম এই সেতু অতিক্রম করেন। উদ্বোধনের পরে বিখ্যাত শোম্যান পি. টি. বার্নাম সেতুর শক্তি সম্পর্কে মানুষের ভয় দূর করতে একুশটি হাতি নিয়ে ব্রুকলিন ব্রিজ অতিক্রম করেন। সেই দৃশ্যও ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।

‘ব্রুকলিন ব্রিজ’ হয়ে ওঠে বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য নামে।

ব্রুকলিন ব্রিজের স্মারক ফলকে এমিলি ওয়ারেন রোবলিংয়ের নাম তখন লেখা না হলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কংগ্রেসম্যান আব্রাম এস. হিউইট এমিলি ওয়ারেন রোবলিং সম্পর্কে বলেছিলেন—‘এটি নারীর আত্মত্যাগী ভক্তির এক চিরন্তন স্মৃতিস্তম্ভ।‘ এই একটি বাক্য যেন এমিলির পুরো জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে।

পরবর্তীকালে এমিলি নারী অধিকার নিয়েও সোচ্চার হন। তিনি “A Wife’s Disabilities” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন, যেখানে বিবাহিত নারীদের আইনি ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন নারীর পরিচয় কেবল কারও স্ত্রী বা কন্যা হিসেবে নয়; তাঁর নিজস্ব মেধা, যোগ্যতা ও স্বপ্নেরও মূল্য রয়েছে।

ইতিহাস সেই মূল্য স্বীকার করেছে কয়েক দশক পরে।

১৮৮৩ সালে ব্রুকলিন ব্রিজ উদ্বোধনের সময় আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে জন এ. রোবলিং ও ওয়াশিংটন এ. রোবলিংয়ের নামই প্রধানভাবে স্থান পায়। এমিলি ওয়ারেন রোবলিংয়ের অসামান্য অবদান আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারক ফলকে স্বীকৃতি পায় কয়েক দশক পরে। Brooklyn Engineers Club একটি ব্রোঞ্জের ফলক স্থাপন করে, যেখানে লেখা আছে—

“Back of every great work we can find the self-sacrificing devotion of a woman।”

ফলক স্থাপনের সাল নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে যদিও বিভ্রান্তি রয়েছে—কেউ ১৯৩১, কেউ ১৯৫১ সালের কথা উল্লেখ করেন। তবে নিশ্চিত বিষয় হলো, এই স্বীকৃতি আসে এমিলি ও ওয়াশিংটন রোবলিং—উভয়ের মৃত্যুর পর।

পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত এমিলি ওয়ারেন রোবলিং ১৯০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ওয়াশিংটন এ. রোবলিং এমিলির মৃত্যুর পর আরও তেইশ বছর বেঁচে ছিলেন এবং ১৯২৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। দ্বিতীয়বার বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় এমিলির পাশেই—নিউইয়র্কের হাডসন নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এমিলির জন্মস্থান কোল্ড স্প্রিং শহরের সমাধিক্ষেত্রে।

ইস্ট রিভারের গভীরতা, প্রবল স্রোত, ব্যস্ত নৌপথ এবং সেই সময়ের সীমিত প্রযুক্তির কারণে ব্রুকলিন ব্রিজ নির্মাণ ছিল এক অসাধারণ প্রকৌশল চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে সেই ব্রুকলিন ব্রিজ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার যানবাহন, কয়েক হাজার পথচারী এবং হাজার হাজার সাইকেল আরোহীর চলাচল বহন করে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়েও এটি নিউইয়র্কের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও ব্যস্ত সেতু হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আছে একই ফলকে এমিলি রোবলিং এর নামের নিচে বাকি দুই রোবলিং নাম।

ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো—কখনও কখনও মানুষ না জেনেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

ব্রুকলিন ব্রিজ তৈরি হওয়ার বহু বছর পর তাই হয়তো আরেকটি সেতুর জন্ম হয় —শব্দের সেতু।

আমেরিকান কবি হার্ট ক্রেন ১৯২০-এর দশকে তাঁর ১১০ কলাম্বিয়া হাইটসের বাসা থেকে প্রতিদিন ব্রুকলিন ব্রিজ দেখতেন। ভোরের আলো, কুয়াশায় ঢাকা তারের জাল কিংবা সন্ধ্যার শহুরে আলো—একই দৃশ্য প্রতিদিন তাঁর কাছে নতুন অর্থ নিয়ে ধরা দিত।

অসুস্থ হবার পর ওয়াশিংটন রোবলিং আর নির্মাণস্থলে যেতে না পারলেও, শারীরিক অবস্থার সুযোগ হলে তিনি তাঁর এই ১১০ কলাম্বিয়া হাইটসের বাড়ির জানালা থেকে দূরবীন দিয়ে প্রকল্পের কাজ দেখতেন। তখন তিনি যেমন জানতেন না, এই জানালায় দাঁড়িয়ে তাঁর ইস্পাতের তারের নির্মাণ কোনো কবির কাছে হয়ে উঠবে একটি কবিতার শরীর।

আমেরিকান কবি হার্ট ক্রেনও জানতেন না, তাঁর এই জানালার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রুকলিন ব্রিজ নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। ১৯৩০ সালে প্রকাশিত তাঁর দীর্ঘ কাব্য The Bridge-এর সূচনায়  ‘To Brooklyn Bridge’ কবিতায় তিনি এই সেতুকে শুধু একটি স্থাপত্য হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন, বিচ্ছিন্নতার মধ্যে এক চিরন্তন সংযোগের প্রতীক হিসেবে।

কবির কবিতায় ব্রুকলিন ব্রিজ ধরা দিয়েছে এক অনুভবশীল, রোমান্টিক মানুষের মতো—যে তাঁকে বারবার কাছে টানে। তাই দিনের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগে, ভোরের নীরবতায় তাকে ঢেউয়ের বুকে বিশ্রামরত এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে কল্পনা করে কবি প্রশান্তি অনুভব করতেন। আবার রাতের আলো-আঁধারিতে সেই সেতুই রূপ নেয় এক চিরজাগ্রত, নিদ্রাহীন প্রতীকে— যে মানুষের আশা,প্রার্থনা ও প্রেমের আশ্রয় হয়ে ওঠে ।  হয়ে ওঠে মানুষ ও ঈশ্বরের মধ্যকার এক সেতুবন্ধন,আধুনিক সভ্যতার মধ্যেও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের উৎস হিসাবে।

প্রযুক্তি ও সৌন্দর্য, বাস্তবতা ও কল্পনা—সব যেন এই এক সেতুতেই মিলিত হয়েছে।

একই জানালা থেকে দুই ভিন্ন সময়ের দুই মানুষ একই সেতুর দিকে তাকিয়েছিলেন। একজন দেখেছিলেন নির্মাণের দায়িত্ব ও স্বপ্নপূরণের আশা নিয়ে। অন্যজন দেখেছিলেন সৃষ্টির সৌন্দর্য নিয়ে। একজনের কাছে এটি ছিল প্রকৌশলের বিজয়, অন্যজনের কাছে এটি ছিল এক অনন্ত কবিতা।

ব্রিজের তারে তারে আজও যেন সময়ের দুই প্রান্তের এক নীরব, অথচ অপূর্ব মিলন অনুরণিত হয়।

১৪৩ বছর পর সেই অনুরণনেই যেন এমিলি আবার ব্রিজের ওপর হেঁটে যায়—২০২৬ সালের নতুন Off-Off-Broadway মিউজিক্যাল ‘Brooklyn’s Bridge’-এ, গানের সুরে সুরে, আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—“She Built the Bridge.”

 

রাজিয়া নাজমী। কথাসাহিত্যিক 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *