‘ক্যাচার ইন দ্য রাই’ উপন্যাসের হোল্ডেন কোলফিল্ড ভাবছিল—ন্যুইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের লেগুনের হাঁসগুলো শীতকালে কোথায় যায়! মনে পড়ছিল যখন প্রশ্নটি করছিলাম সেই মুহূর্তে—আপনার জন্মস্থান কোথায়? উত্তরটি আমাদের জন্য নস্টালজিক—‘আমি মরিয়ম বেগম সুরমা, আমি একজন কণ্ঠশিল্পী। সিলেট নগরীর তোপখানা এলাকায় আমার জন্ম।’ আমাদের কেন যেন মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই গানটির কথা—সুরমা নদীর গাংচিল আমি শূইন্যে দিলাম উড়া…লেগুনের হাঁস আর গাঙচিলের কথা কেন মনে পড়ছিলো? জানি না; মন, মন রে তুমি এমন কেন! এই সুরমা-নদীর দেশের শিল্পী মরিয়ম বেগম সুরমার সঙ্গে প্যারিসে বসে ফিলাডেলফিয়াপত্রিকার হয়ে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় কথা হয়ে গেল আমার, একদিন সবকথা জড়ো করে দেখি—এ এক চমৎকার সাক্ষাৎকার।

এমদাদ রহমান : বাংলা সংগীতের মরমী ভুবনের প্রখ্যাত বাঙালি সাধক কবি সৈয়দ শাহনূর (১৭৩০–১৮৫৪ বা ১৮৫৬) রচিত ‘বন্ধু তোর লাইগা রে’ আপনার কণ্ঠে প্রথম যেদিন শুনি, ভেতরে গানের কথাগুলো খোদাই হয়ে গিয়েছিল চিরদিনের জন্য—
সৈয়দ শাহনূরে কান্দইন গাঙের কূলে বইয়া
পার হইমু পার হইমু করি দিনত যায় মোর গইয়া
বন্ধু তোর লাইগা রে॥
আমরা তখনও জানতাম না, তখনও এই বোধের জন্ম হয়নি যে, জীবন বিষাদময় কিছু; আনন্দ-মৃত্যু-জন্ম আর নিরন্তর বেদনার এক মিশ্রণ এ-জীবন কেবলই বিস্তৃত হয়, কাল থেকে মহাকালে; নতুন মানুষ আসে পুরনো মানুষ চলে যায়! সৈয়দ শাহনূর রচিত এই গানটি কি আপনার একদম শুরুর দিকের রেকর্ড করা গান, প্রথম অ্যালবামের গানও? এই সম্পর্কে একটু বলুন আমাদের…
মরিয়ম বেগম সুরমা : অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে আমার কথাগুলো বলবার সুযোগ দেয়ার জন্যে। ‘বন্ধু তোর লাইগা রে’ গানটি আমি আসলে ছোটবেলা থেকেই গাইতাম। পরে, ১৯৯৫ সালে, সাউন্ডটেকের ব্যানারে ‘শ্যামের বাঁশি’ অ্যালবামে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে এটিই ছিল আমার প্রথম অ্যালবাম তবে এর আগে ১৯৯০ ও ১৯৯২ সালে ইংল্যান্ড থেকে আরও ২টি অ্যালবাম বের হয়েছিল, যেগুলো ‘ডিয়ার ভাবী’ এবং ‘পরজনমে’ নামে পরিচিত।

এমদাদ রহমান : গানটি আপনি ছোটবেলা থেকেই গাইতেন বলছেন যখন, তাহলে স্মৃতিকথা বলুন। কেমন ছিল আপনার সেই হারানো ছোটবেলা, আরও নির্দিষ্ট করে বললে গানের সঙ্গে জীবনকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়ার সূচনাটি কেমন ছিল? পরিবার থেকে কেমন উৎসাহ পেয়েছিলেন? মা না বাবা, কে বেশি আগ্রহী করে তুলেছিলেন? পারিবারিক পরিস্থিতি কি আপনার গানের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল? কোথাও বিপত্তির মুখে পড়েছিলেন?
মরিয়ম বেগম সুরমা : আমিও আর দশটা রক্ষনশীল মুসলিম পরিবারের মতোই একটি মুসলিম পরিবার থেকে এসেছি। আমার সঙ্গীতজীবনে আসা প্রথমাবস্হায় পরিবারের উৎসাহ থেকে নয় বরং পরিস্থিতিই একমাত্র কারণ। ছোটবেলায় আমরা যে বাসায় থাকতাম, তার পাশে ছিল শিল্পকলা এবং সন্ধ্যাতারা নামে দু’টি সঙ্গীত বিদ্যালয়। প্রতিদিন বিকালবেলা যখন সেখানে ক্লাস করানো হতো, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখতাম আর ভাবতাম যে আমি যদি ওদের মতো করে গাইতে পারতাম! সে শখ একদিন এভাবে বাস্তবে পরিণত হবে সেটা ভাবতেও পারিনি। ক্লাসের বিরতিতে সবাই যখন বাইরে চলে যেত তখন আমি মনের অজান্তে হারমোনিয়ামের পাশে বসে যা যা দেখেছি সেগুলো অনুকরণের করার চেষ্টা করতাম। এভাবে কখন যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে শিখে গেছি নিজেও জানি না। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও হারমোনিয়াম বাজিয়ে বাংলা ছায়াছবির একটি গান গাইছিলাম, ঠিক সেই সময় আবদুল আহাদ আংকেল (যিনি সেই সময়ের একজন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। এই বিদ্যালয়ে সবসময় আসতেন এবং চর্চা করতেন, তিনি হঠাৎ দেখে ফেলেন) আমার কাছে এসে আমাকে আমার জন্য উপযোগি যে স্কেল তা দেখিয়ে দেন। কারণ আমি বড় মানুষের মতো অনেক চড়া স্কেলে গাইছিলাম। আমি ছোট মানুষ হিসেবে ঐ স্কেল আমার জন্য সঠিক ছিলো না। আর সেই সঙ্গে তিনি এবং তার সাথে অন্যান্যরা আমার অনেক প্রশংসা করলেন। তাই বলা যায় তাঁর হাতেই আমার প্রথম হাতেখড়ি। তারপর আহাদ আংকেল, শেখ আলাউদ্দিন আংকেল সহ আরও অনেকে আমার আব্বাকে বলেন আমাকে যেন গান শিখতে দেন। কিন্তু আব্বা তাদের মানা করেন। তাদের বলেন—আমার বংশের কেউ কোনোদিন গান করেনি আর আমার মেয়ে যদি গান শিখে তাহলে আমি আমার বাড়িতে মুখ দেখাতে পারবো না। কিন্তু তারপরেও সবাই আব্বাকে বুঝালেন, বললেন- আপনার মেয়ের মধ্যে গড গিফটেড ট্যালেন্ট আছে, আপনি তাকে নষ্ঠ কইরেন না। অনবরত শুনতে শুনতে আব্বা একসময় রাজি হয়ে গেলেন, ভাবলেন—ঠিক আছে, এখন ছোট আছে, একটু গেয়ে যাক, বড় হলে তো আর গাইবে না।
এমদাদ রহমান : সবকিছুর পেছনে আপনার বাবার উৎসাহই ছিল?
মরিয়ম বেগম সুরমা : অ্যাকচুয়ালি, আমার আব্বা ছিলেন গান পাগল মানুষ। একটু আধটু পুঁথিও পড়তেন। কিন্তু পরিবারের সবার অগোচরে। তিনি যে গানবাজনা পছন্দ করতেন তা ফ্যামেলির কেউ জানতো না। বিভিন্ন গানের প্রোগ্রামে লুকিয়ে লুকিয়ে যেতেন। মন থেকেই তিনি গান পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন। কিন্তু পরিবারের কথা চিন্তা করে তিনি কোনও উৎসাহ দেখাননি। পরে…যা-ই হোক, আব্বা রাজি হলেন, আমিও শিখতে শুরু করলাম। প্রায় দিনই সেই স্কুলে একটু আধটু বসতাম, একটু প্র্যাকটিস করতাম, এমনি একদিন, সেখানে আমি গান করতেছিলাম, তো, স্কুলের বাইরে থেকে একজন লোক, আমরা তাঁকে মানিক ভাই বলে ডাকতাম, তিনি শুনতে পেলেন আমার আওয়াজ; আমার গলার আওয়াজ শুনে তিনি ভেতরে এসে বললেন যে আমি কি আসতে পারি? তখন আব্বা ছিলেন পাশে, বললেন ঠিক আছে আসেন। তিনি পাশে বসে আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বললেন, পরিচিত হলাম, তিনি বললেন তিনি কিছু লেখালেখি করেন, গান লেখেন, কিছু গান গেয়েওছেন; তিনি দু-তিনটি গান গেয়েও শুনালেন, বেশ ভালো লাগলো। তো সেদিন থেকেই এই ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয়, এবং আল্লাহ্র রহমতে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা সব সময় তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো দেখতাম। তিনি এখন আর এই পৃথিবীতে নাই, আল্লাহ্ তাঁকে বেহেস্ত নসিব করুন। তো, পরিচয় হওয়ার কয়েকদিন পর তিনি আমাকে একটা গান গাইতে দিলেন, সৈয়দ শাহ গাজী বুরহানুদ্দিন সাহেবের উপরে লিখা, তাঁর জীবন নিয়ে লিখা, বেশ দীর্ঘ একটি গান আমাকে দিয়ে তিনি গাওয়ালেন। বেশ ভালো লেগেছিল গানটি। তো এইভাবে তাঁর লেখা অনেক গান আমি পরবর্তীতে গেয়েছি। তো, সেই মানিক ভাইয়ের কাছ থেকে আমি সৈয়দ শানুরের ‘বন্ধু তোর লাইগা’ গানটি পেয়েছি, তিনিই আমাকে গানটি সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। তারপরে অনেক স্টেজ প্রোগ্রামে গানটি আমি গেয়েছি, দেশের বাইরেও গেয়েছি কিন্তু ক্যাসেট আকারে সেটি প্রথম প্রকাশ পায় আমার শ্যামের বাঁশি’ এ্যালবামে, সাউন্ডটেকের ব্যানারে। সৈয়দ শাহনূর শাহ ছিলেন বিশ্বনাথ অঞ্চলের লোক, তিনি তখনকার সময়কার আমার শ্রদ্ধেয় দুর্বিন শাহ, রাধারমনদের সমসাময়িক একজন গীতিকার ছিলেন এবং অনেক উন্নতমানের লেখা তাঁর ছিল, পরে তাঁর লিখা আরও কয়েকটি গান রেকর্ড করেছি অন্যান্য এ্যালবামে, হেলাল খানের সিএমভি থেকেও আমার একটি এ্যালবাম এসেছিল, সেখানে আমি সৈয়দ শাহনুরের ‘ও মন ফকিরি করিও’ গানটি রেকর্ড করেছিলাম। ফ্যামেলির বিপত্তি বলতে অ্যাকচুয়ালি আমি যখন একটুআধটু গান শিখলাম, পরে বাংলাদেশ বেতারের বাচ্চাদের আসরে আমি চান্স পেলাম, অডিশন দিয়ে, তখন আমার বড় চাচা খবর পেলেন যে আমি গান গাইতে শুরু করেছি। তিনি আব্বার উপর রাগারাগি করলেন—কেন আমাকে গান শেখালো? পরে যখন তিনি দেখলেন যে রেডিওতে…আর আসলে তখন আমি ওই ভক্তিমূলক গানগুলো করতাম, আমি ভক্তিমূলক গান করছি, নজরুলের গজল, হামদ, নাত এসব গাইছি, তখন তিনিও আর বাধা দেননি; আমার শুরুটা এভাবেই হয়েছিল, আসলে কারও জানা ছিল না যে পরে আমি ভেরাইটিজ গান করবো। লোকসঙ্গীত করবো বা অন্যান্য গানগুলো করবো। তো শুরুটা আমার এইভাবেই হয়েছিল। প্রথমে কিছুটা আপত্তি থাকলেও পরবর্তীতে সবকিছুই ঠিক ঠাক হয়ে যায় এবং আমার গানের এই যে উত্থান বা আমার যতটুক সফলতা তার মূলে সব থেকে বড় অবদানই আমার আব্বার। তিনি না চাইলে বা একদম শুরু থেকে যদি তিনি সহযোগিতা না করতেন, একদম আমার বিয়ের আগ পর্যন্ত, তাহলে আমি হয়তো এতোটা এই লাইনে সফল হতে পারতাম না। প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিদিনের প্রাক্টিসে, প্রোগ্রামে, প্রতিযোগিতায়, আব্বাই একমাত্র মানুষ যিনি আমার সঙ্গে থাকতেন। তিনিই আমাকে নিয়ে যেতেন। আমাকে গাইড করতেন। সবকিছুর পেছনে আব্বার উৎসাহটিই ছিল সবচে বড়।

এমদাদ রহমান : আপনার প্রথম অ্যালবাম ‘শ্যামের বাঁশি’ ’৯৫ সালে বের হয়, আপনি বলছেন এর আগেও দুটি অ্যালবাম ইংল্যান্ড থেকে বেরিয়েছে। তাহলে প্রথম অ্যালবাম কোনটি? ইংল্যান্ড থেকে কীভাবে হলো?
মরিয়ম বেগম সুরমা : আমি আপনাকে বলেছিলাম যে আমার ‘শ্যামের বাঁশি’ অ্যালবামটি বাংলাদেশের জন্য প্রথম অ্যালবাম কিন্তু এটিই আমার প্রথম নয়, এর আগে ইংল্যান্ডে আরও দুটি অ্যালবাম বের হয়েছিল—তো—সেই হিসেবে প্রথম অ্যালবামটির নাম হলো ‘ডিয়ার ভাবি’ কিংবা ‘ও ডিয়ার ভাবী’; এই অ্যালবামটি বের হওয়ার কারণ—’৯০ সালে গানের প্রোগ্রামের জন্য ওখানে গিয়েছিলাম, আমি এবং আমার ছোটভাই—তো—সেই সুবাদে ওখানে আমি ৫ মাস থাকি। প্রোগ্রামের জন্য। তাঁর মধ্যে সেখানকার খুব পরিচিত একটি অডিও কোম্পানি ছিল ‘ঝঙ্কার’, তো ওই ঝঙ্কার অডিও থেকে আমাকে একটি অ্যালবাম প্রকাশের অফার দেয়, তারপর—যদিও তখন আমি অনেক ছোট, তো এই অ্যালবামটি করি, তারাই আমাকে গান সংগ্রহ করে দেয়, ওই গানগুলো আমি গাই, এবং পরবর্তীতে এই অ্যালবামটি সেখানে সফল হয়, শ্রোতারা খুব পছন্দ করেন; ওখানকার লোকাল যেসব পত্রিকা ছিল এবং বিভিন্ন ম্যাগাজিন, সেগুলোতে পরে দেখেছি—তাদের মিউজিক প্রকাশনার যে টপচার্ট ছিল, আমার অ্যালবামটি সেই চার্টের এক নম্বর পর্যন্ত গিয়েছিল। টানা ২/৩ সাপ্তাহ পর্যন্ত সেটি চার্টের নাম্বার ওয়ান ছিল, তো—সেই হিসাবে এখনও দেখা যায়—অনেকে মনে রেখেছেন সেই গানগুলো; ফেইসবুক ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার গান পোস্ট করলে অনেকেই সেই অ্যালবামটির কথা, ওই অ্যালবামের গানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তো এই হল আমার প্রথম অ্যালবাম, আর দ্বিতীয় অ্যালবামটিও, ইংল্যান্ডে পরবর্তীতে যখন আবার যাই ’৯২ সালে, ৯২, ৯৩ দু-বছর আমি ওখানে ছিলাম— জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত—তো, ওই সেকেন্ড টাইমে যখন ওখানে যাই, তখন দ্বিতীয় অ্যালবামটি রেকর্ড করি। ’৯৩ সালের দিকে। নাম ছিল সম্ভবত ‘পরজনমে’, আমার ভালো মনে নেই, এই অ্যালবামটি আমার কালেকশনে নেই। কিছুই মনে নাই। সম্ভবত আধুনিক-বেইজড অ্যালবাম ছিল। তেমন একটা সাড়া জাগাতে পারেনি, প্রথমটির মতো। এটুকু মনে আছে পরজনমের সবগুলো গানের সুর করা ছিল মুজিব পরদেশীর; ওখানকার এক ইংলিশ স্টুডিওতে গানগুলো রেকর্ড করা হয়। ‘ঝঙ্কার’ থেকেই বের হয়, যে ‘ঝঙ্কার’ পরবর্তীতে ‘সঙ্গীতা’ নামে বদলে যায় (ইস্ট লন্ডনের ব্রিকলেনের সঙ্গীতা), পরে এখান থেকেই শিল্পী কায়ার ‘মায়া’ সহ অসংখ্য গানের অ্যালবাম বের হয়। ‘শ্যামের বাঁশি’ আসে ’৯৪ সালে, তখন আমি দেশে।
এমদাদ রহমান : গান নিয়ে আপনার স্বপ্নের কথা বলুন।
মরিয়ম বেগম সুরমা : গান নিয়ে আমার স্বপ্ন বাংলার লোক গান বিশ্বের বুকে আরো প্রসারিত হবে এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদায় উন্নীত হবে। আর সেই লোকগানের একজন ক্ষুদ্র শিল্পী হিসেবে আমি মানুষের মনে বেঁচে থাকতে চাই।
এমদাদ রহমান : গান শুনে কখনও কেঁদেছিলেন?
মরিয়ম বেগম সুরমা : হ্যাঁ এমনও হয়েছে যে কোনও একটি গান শুনে আমি, গানের কথার কারণে বা সেই সুর শুনে কান্না চলে এসেছে, এরকম বহুবার হয়েছে; এরকম দুটি গানের কথা বলতে পারবো—তাদের আমি যখনই শুনি চোখ ভরে কান্না আসে, জীবনভর কান্নার মতো; তাদের একটি হলো—‘মায়ের কান্দন যাবৎ জীবন, দুই চাইর দিন বইনের কান্দন রে’—গানটি আমাকে খুবই টাচ করে, আর আরেকটি গান, যদিও গানটি অনেক দিন হয় শুনি না, গানটি আমাকে খুবই ইমোশনাল করে ফেলতো, কথা ও সুরের কারণে; হৈমন্তী শুক্লার গাওয়া (পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লিরিকে মান্না দের সুর) ‘আমি সুখী হলে দুঃখই যদি পাও তুমি’; তো, এই দুটি গান যখনই শুনি চোখ ভিজে যায়, ইমোশনাল হয়ে পড়ি!

এমদাদ রহমান : কার কণ্ঠের গান শুনে আনন্দ পান? বারবার কার কণ্ঠের গান শুনতে চান?
মরিয়ম বেগম সুরমা : ফোক গানের বেলায় আমি আবদুল আলীমের গান শুনেছি তবে সব গান নয়, বেশি একটা না, তবে কিছু কিছু গান শুনেছি বারবার, তারপর ইন্দ্রমোহন রাজবংশী—তাঁর গান ভালো লাগতো, সিলেট অঞ্চলের জামাল উদ্দিন হোসেন বান্না ভাইয়ের গান ভালো লাগতো, আর এমনিতে ফোক গান যারা করেন, তাদের গান তো শুনিই, কনকচাঁপা কিছু ফোক গান করেছেন, আর কুমার বিশ্বজিৎদা—তাঁর ফোকের যে প্যাটার্ন, মডার্ন ফোক, এই প্যাটার্ন আমাকে খুব টেনেছে, ভালো লেগেছে; এই তো, মোটামুটি আমি সবকিছুই শুনি। আমি অনেকের গানই শুনি, তবে পার্সোনালি সফট গানগুলো শুনতে পছন্দ করি, গানের কথা, শিল্পীর গলার কারুকাজ, সেই হিসেবে আমি শ্রেয়ার গান খুব শুনি, শ্রেয়া ঘোষালের আওয়াজের যে মাধুর্য, গানকে গাওয়ার যে ভঙ্গি—এসব আমার ভালো লাগে—তাঁর গান আমি খুবই শুনি, এছাড়া লতা মুঙ্গেশকর, জগজিৎ সিঙের গান শুনি, রুনা লায়লা আপার গান, কনকচাঁপার গান, ডলি সায়ন্তনী আর মনির খান, আসিফ সহ নতুনদের গান শোনা হয়, তবে আগের, সেই পুরনো দিনের গানগুলোই বেশি ভালো লাগে।
এমদাদ রহমান : সিলেট ছেড়ে প্রথমবার যেদিন প্যারিস এলেন, সেদিন কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
মরিয়ম বেগম সুরমা : প্যারিস আসার পর মিশ্র অনুভূতি ছিল কারণ একদিকে অত্যন্ত খুশি লাগছিল ছেলেমেয়েরা এতদিন পরে তাদের বাবাকে পেয়েছে, আমার পরিবার দুইভাগ ছিল, এক হলো দীর্ঘ ৫ বছর পর।
আর অন্যদিকে দেশে যে ক্যারিয়ার, যে সঙ্গীতের প্লাটফর্ম ছেড়ে এসেছি তার জন্য মন খারাপ লাগতো খুব। সেই সাথে মা বাবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা বন্ধুবান্ধবদের ও সঙ্গীতের সহকর্মীদের কথা মনে করে অনেক খারাপ লাগতো।
এমদাদ রহমান : আপনার গান শুনছি সে তো বেশ আগের কথা, কিন্তু কখনও কোনওদিনও দেখা হবে কথা হবে তা দূর কল্পনাতেও ছিল না। এই ব্যাপারটি অলৌকিক। আশ্চর্যজনক। এখন, এই প্রশ্নটি করতেই চাই, লোভ সামলাতে পারছি না। আপনার গাওয়া যতগুলি গান শুনেছি, তার মধ্যে সবচে ব্যতিক্রম গান হলো দ্বিজ দাসের এই গানটি—
কেহ শুন কি না শুন, মানো কি না মানো,
তাতে আমার নাই কোন লাভ লোকসান
শুন পাগল দ্বিজদাসের গান।।
কেহ বলে আছ তুমি, কেহ বলে নাই
আমি বলি থাকলে থাক, না থাকিলে নাই।
নয়নে দেখি না শ্রবণে শুনি না, পরশনে পাই না, মিলে না প্রমাণ…
এই গানটি গাওয়ার জন্য আপনিই বেছে নিয়েছিলেন না কি অন্য কেউ গাইতে বলেছিলেন?

মরিয়ম বেগম সুরমা : ‘কেউ মানো বা না মানো’ গানটি আমিই বেছে নিয়েছিলাম। এর ব্যতিক্রমধর্মী কথা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল।
এমদাদ রহমান : এই গানটি নিয়ে বিশেষ কোনও প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন? গানটি কিন্তু খুবই সাহসী।
মরিয়ম বেগম সুরমা : হ্যাঁ পেয়েছি, স্টেজে হয়তো এই গানটি করেছি, স্টেজ থেকে নামার পর অনেকে প্রশ্ন করেছেন, আপনি যে গানটি করলেন, এতে কী বুঝাতে চেয়েছেন? তখন তাদের সামনে অনেক কিছু বর্ণনা দিতে হয়েছে।
এমদাদ রহমান : কোনও প্রতিবাদ কিংবা বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাননি?
মরিয়ম বেগম সুরমা : না, তেমন কঠিন কিছু কখনও হয়নি।
এমদাদ রহমান : অ্যালবামের জন্য গান বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি কী? কীভাবে করেন?
মরিয়ম বেগম সুরমা : আমরা প্রথমেই চিন্তা করি কোন গানগুলোয় কথামাধুর্য আছে, কথার সৌন্দর্য, সুরের সৌন্দর্য আছে; অনুমান করি কোন কারণে গানটি শ্রোতার ভালো লাগবে। ভালো লাগতে পারে। এসব নিয়ে চিন্তা করি। কথা, সুর ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করে এক একটি গান একেকটি অ্যালবামের জন্য বাছাই করি এবং সেই হিসেবে কোন গানটি আগে কোনটি পরে থাকবে—তাও গানের ধরন বিবেচনা করেই চূড়ান্ত বাছাই করি। যে-গানগুলোকে মনে হয় শ্রোতার কাছে বেশি ভালো লাগবে, মানে আমরা আগে থেকেই সচেতন থাকি, সময় ও পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে বিবেচনায় রেখেও কিছু গান প্রথম দিকে থাকে, একটু ধীরলয়ের গান একটু পেছনের দিকেই থাকে বা মাঝামাঝি অবস্থানে রাখি।

এমদাদ রহমান : আপনার গানের দলের যন্ত্রীদের কথা বলুন। বিশেষ প্রিয় এমন বাজিয়ে কেউ ছিলেন বা এখনও কি আছেন যিনি দোতারা বা বাঁশি, বা গিটার, বেহালা ঢোল এসব যন্ত্র বাজাতেন, দীর্ঘদিন যার সঙ্গে কাজ করেছেন।
মরিয়ম বেগম সুরমা : আপনি যন্ত্রীদের কথা বলেছেন, তাদের সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন; হ্যাঁ, অনেকের সঙ্গেই তো আমি কাজ করেছি—ঢাকায়, সিলেটে। সেই প্রথম দিকে, ঢাকার আলমাস ভাইয়ের কথা বলবো বেহালায় যিনি বাংলাদেশের পাঁচজন অন্যতম বেহালাবাদকের একজন, আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। আমার প্রথম দুটি অ্যালবামেই তিনি বাজিয়েছেন, আর বাঁশি বাজিয়েছেন শ্রদ্ধেয় বারী সিদ্দিকী ভাই, পরে যিনি একজন প্রখ্যাত গায়ক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, ফোকগানের ফেমাস একজন সিঙ্গার হয়েছিলেন; তিনি মূলত বংশীবাদক, দেশের হাতেগোনা দু-একজনের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ। বারী সিদ্দিকী ভাইও আমার প্রথম দিকের অ্যালবামগুলোয় বাঁশি বাজিয়েছেন। আর ছিলেন ইফতেখার হোসেন সোহেল ভাই, তিনি সঙ্গীত পরিচালনাও করতেন, গিটার বাজাতেন, তো—সোহেল ভাই গিটারে, লিটন ডি’কস্টা প্যাড বাজাতেন, মানিক ভাইও প্যাড বাজাতেন, তারপর—পল্লব স্যানাল, মিলন ভট্টাচার্য—অনেকের সঙ্গে কাজ করেছি ঢাকায়।
আর সিলেটে, এখানে এমন অনেকেই আছেন, যারা…ছোটবেলায় বিভিন্ন প্রোগ্রামে যারা আমার সঙ্গে সঙ্গত করতেন, পরে আমি ঢাকা থেকে সিলেট চলে যাওয়ার পর তাদের সঙ্গে এবং আরও অনেকের সঙ্গে কাজ করেছি। আমি যাদের সঙ্গে জুটি হিসেবে কাজ করেছি বা বেশি প্রোগ্রাম একসঙ্গে করেছি, তাদের মধ্যে প্রথম দিকে ছিল বিক্রম, মৃত্যুঞ্জয়, ছিলেন মিলু ভাই, পরে টিটু ভাই, পাপ্পু, গাজী কামরুল, আরও অনেকে। সেই সময়ে সিলেটে কীবোর্ডের জন্য খুবই পরিচিত ছিলেন দেবাশীসদা, যিনি বাংলাদেশ বেতারে চাকরি করতেন, আশরাফ ভাই ছিলেন শ্রেষ্ঠ একজন তবলাবাদক, ঢোলেও অদ্বিতীয় ছিলেন তিনি, আর একজন প্রসেনদা— এরকম অনেক গুণীজনের সঙ্গে কাজ করেছি। তারা প্রত্যেকেই আমার খুব কাছের মানুষ। অনেক গানের কাজ করেছি তাদের সঙ্গে জুটি হয়ে কারণ সিলেটেই আমি বেশি সময় থেকেছি। তাদের সবার কথাই মনে আছে, যোগাযোগটা এখনও আগের মতোই আছে।
এমদাদ রহমান অন্যান্য রচনা

এমদাদ রহমান। কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও গল্পপাঠসম্পাদক


