বিদায় শব্দটিই বড় কষ্টের। আর সেই বিদায় যদি হয় খুব কাছের কোনো মানুষকে—সন্তানতুল্য, কিংবা নিজের সন্তানকে—তবে সেই মুহূর্তের বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আজ এমনই এক অশ্রুসিক্ত বিদায়ের সাক্ষী হলাম আমরা।
আমাদের প্রিয় ড. মোহাম্মাদ শহিদুল্লাহ ভাই ও সাহিদা আফরোজ নিপু ভাবীর বড় ছেলে শুভানন সাহিদের জানাজা ও দাফন আজ সম্পন্ন হয়েছে। মা-বাবা, ভাই, স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং কমিউনিটির অসংখ্য মানুষের উপস্থিতিতে শেষবারের মতো বিদায় জানানো হলো তাঁকে।
আজকের পরিবেশটা ছিল অন্য রকম ভারী। স্বজনদের কান্না, মা-বাবার অশ্রুসিক্ত চোখ, ভাইয়ের নির্বাক মুখ—সবকিছু মিলিয়ে যেন চারপাশের বাতাসও থমকে ছিল। কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন, কেউ নীরবে তাকিয়ে ছিলেন; আবার কেউ নিজের চোখের জল লুকিয়ে অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
বিদায় সবার জন্যই নির্ধারিত। জীবনের কোনো এক সময়ে সবাইকে এই পথ ধরতে হবে। কিন্তু ছোট একটি মুখকে, অকালেই, এত তাড়াতাড়ি বিদায় দিতে হয়—এ সত্য মেনে নেওয়া বড় কঠিন।
চারপাশে এত পরিচিত মুখ, এত আপন মানুষ; অথচ সেই মুখগুলোর মাঝখানে শুভানন আর নেই। তাঁর বন্ধুরা এসেছে বন্ধুকে শেষবারের মতো দেখতে, বিদায় জানাতে। যাদের সঙ্গে হয়তো কিছুদিন আগেও হাসি-আড্ডা, গল্প আর ভবিষ্যতের কত পরিকল্পনা ছিল, আজ তাদেরই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁর জানাজার কাতারে। এই দৃশ্যের দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে।

একজন মা-বাবার কাছে সন্তানের চলে যাওয়া কী গভীর শূন্যতা তৈরি করে, তা বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। সন্তান শুধু একটি মানুষ নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের বহু বছরের স্বপ্ন, আনন্দ, আশা আর অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি। ঘরের কোনো একটি জায়গায় হয়তো তাঁর ব্যবহার করা কোনো জিনিস থাকবে, কোনো কথার স্মৃতি হঠাৎ মনে পড়বে, কোনো পরিচিত মুহূর্তে মনে হবে—এই তো, শুভানন বুঝি এখনই এসে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা তখন আরও নির্মম হয়ে সামনে আসবে—সে আর আসবে না।
আজ তাঁর ছোট দুই ভাই ও স্ত্রীকে ঘিরে থাকা ছোট ছোট স্মৃতিগুলোর কথাও মনে পড়ছিল। সেসব স্মৃতিতে ছিল পারিবারিক ভালোবাসা, আপনজনের টান আর একসঙ্গে বেড়ে ওঠার কত গল্প। সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে কেউ হয়তো হাসতে হাসতেই হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। হাসি আর কান্না পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে—এমন দৃশ্যের চেয়ে গভীর শোকের প্রকাশ আর কী হতে পারে!
শহিদুল্লাহ ভাই ও নিপু ভাবীর দিকে তাকিয়ে তাই বারবার মনে হয়েছে, এই শোক তাঁরা কীভাবে বহন করবেন! একজন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের একটি অংশ যখন এভাবে হঠাৎ থেমে যায়, তখন সান্ত্বনার ভাষা সত্যিই খুব ছোট হয়ে যায়।
তবু মানুষ স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকে। শুভাননও থাকবেন—তাঁর বাবা-মায়ের স্মৃতিতে, ভাইদের মনে, স্ত্রীর জীবনে, বন্ধুদের গল্পে এবং তাঁকে ভালোবাসা অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে। সময় হয়তো চোখের জল কিছুটা শুকিয়ে দেবে, কিন্তু প্রিয় মানুষ হারানোর শূন্যতা কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না। মানুষ বরং সেই শূন্যতাকে সঙ্গে নিয়েই ধীরে ধীরে বাঁচতে শেখে।
আজকের এই বিদায়ের মুহূর্তে তাই কোনো বড় কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। শুধু মনে হচ্ছে, কিছু চলে যাওয়া মেনে নেওয়ার জন্য নয়—স্মরণ করে বয়ে নেওয়ার জন্য।

ঠিক এমন একটি অনুভূতি নিয়ে আজই বদরুজ্জামান আলমগীর ভাইয়ের ভাষান্তর করা মেরি এলিজাবেথ ফ্রাইয়ের কবিতা—‘আমার কবরের কাছে দাঁড়িও না, করো না অশ্রুপাত’। কবিতাটি যেন প্রিয় মানুষকে হারানোর পরও তাঁকে চারপাশের জীবন ও প্রকৃতির মধ্যে খুঁজে পাওয়ার এক অন্যরকম সান্ত্বনা দেয়। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে নিষেধ করে কবি যেন মনে করিয়ে দেন—মানুষের ভালোবাসা আর অস্তিত্ব শুধু একটি কবরের মাটির মধ্যে থেমে থাকে না।
বদরুজ্জামান ভাইয়ের ভাষান্তরে কবিতার শেষের কথাগুলো তাই আজকের এই বিদায়ের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়—
“আমি আছি পাখির সুরে, জগতের প্রতি আনন্দের ক্ষণে
দাঁড়িও না আমার কবরের পাশে, কেঁদো না ভাঙা মনে।”
হয়তো এভাবেই চলে যাওয়া মানুষগুলোকে আমরা আমাদের মধ্যে ধরে রাখতে পারি—তাদের স্মৃতিতে, ভালোবাসায়, কথায়, ছবিতে, পরিচিত কোনো হাসিতে কিংবা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া কোনো ছোট্ট ঘটনায়। শুভাননও তাঁর আপনজনদের জীবনে তেমন করেই থেকে থাকবেন।
মহান আল্লাহ শুভানন সাহিদকে ক্ষমা করুন, তাঁর কবরকে নুরে ভরে দিন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। শোকসন্তপ্ত মা-বাবা, ভাই, স্ত্রী ও পরিবারের সবাইকে এই অপূরণীয় বেদনা সহ্য করার শক্তি ও ধৈর্য দান করুন।

শুভাননের সুন্দর স্মৃতিগুলোই যেন একদিন তাঁদের চোখের জলের পাশে একটু একটু করে শান্তির আলো হয়ে থাকে।
নিচে পূর্ণ কবিতাটি রেখে দিলাম।
আমার কবরের কাছে দাঁড়িও না, করো না অশ্রুপাত
মূল / মেরি এলিজাবেথ ফ্রাই :: ভাষান্তর / বদরুজ্জামান আলমগীর
আমার কবরের পাশে দাঁড়িও না, ফুঁপিয়ে কেঁদো না
গোরের ভিতরে তো নাই, না, আমি ঘুমিয়ে থাকি না।
সহস্র বাতাসের সাথে অফুরান বয়ে বয়ে চলি আমি
অন্তরালে বরফের দানায় ঝরে রোয়ায় রোয়ায় আমি।
আমি বৃষ্টির ফোঁটা আকাশ থেকে ছলকে পড়ি জলকণা
দেখো মাঠজুড়ে বিছিয়ে আছি আমি পাকা শস্যের দানা।
আমি ভোরের মোলায়েম আলোর নীরবতায় মিশে রই
আকাশের নীলে পাখিদের ওড়াইড়ির হটে ব্যাকুল হই।
রাত্রির আকাশে তারার মেলায় আমি তো ফুটে আছি
ফুলের উম্মলে যে পাপড়ি পরাগেরে লিপ্ততায় মজেছি।
আমি আছি পাখির সুরে, জগতের প্রতি আনন্দের ক্ষণে
দাঁড়িও না আমার কবরের পাশে, কেঁদো না ভাঙা মনে।
আহমদ সায়েম প্রণীত অন্যান্য রচনা
কবি ও গদ্যকার



