সাহিত্য

আমরা যে পাহাড় বেয়ে উঠি ।। এমেন্ডা গোরম্যান ।। ভাষান্তর : বদরুজ্জামান আলমগীর

শেয়ার করুন:

সব স্বাধীনতার মতোই ৪ঠা জুলাই জনমুক্তির এক ধারাবাহিক রোখ ও সংগ্রাম। এখানে এই আমেরিকায় হয়তো পিছিয়ে পড়ে, কিন্তু আবার ঘনীভূত হয়ে দাঁড়াবার সিদ্ধি দেখায় — আমরাও আছি এই সামগ্রিক অভিযাত্রায়।

আজ এই বিশেষ দিনের মর্ম স্পর্শ করে লেখা এমেন্ডা গোরম্যানের ‘আমরা যে পাহাড় বেয়ে উঠি’ বাংলায় হাজির করলেন কবি ও নাট্যকার বদরুজ্জামান আলমগীর। এক্সক্লুসিভলি ফিলাডেলফিয়াপত্রিকায়। 

আমরা যে পাহাড় বেয়ে উঠি ।। এমেন্ডা গোরম্যান ।। ভাষান্তর : বদরুজ্জামান আলমগীর


সেইদিন আসে আমরা যার জন্য উজাগর ছিলাম
কিন্তু হকচকিয়ে যাই, ভ্রূ কুঁচকে তাকাই —
এখনও সূর্য মেঘের আড়ালে পড়ে আছে;
জমায়েত হই সকলে — এইদিনেরে নিয়ে যাবো
সেইদিনের কাছে।

আমরা গুন টেনে এসেছি ঘোর প্রতিপক্ষ কাল
মিলেছি একে অন্যের সাথে দুর্নিবার
আমাদের যে পেরোতে হবে দুস্তর পারাবার,
কিছুতেই দমে যাবার পাত্র নই আমরা
মানুষখেকো জন্তুর পেটেও থাকি সজাগ ও অক্ষত।

আমরা উঁচুনিচু পথ মাড়িয়ে শিখে এসেছি —
কিছু না বলে চুপচাপ বসে থাকলে শান্তি নেমে আসবে —
তা ঠিক নয়। কিছু ব্যথা, কিছু অপূর্ণতা জমাট বেঁধে আছে —
কিন্তু তা-ই শেষকথা নয়, কিছুটা ঘুটঘুটে আছে এখনও —
তবে রাত চিরে ভোর নেমে এসেছে ওই।

আমরা হয়তো ভুলতে বসেছিলাম — পথে চোরাবালি থাকে,
খাদের ঝুঁকি আছে —
এমন শ্বাপদ হিসহিস করে যদিবা
এই জাতি মচকে যায়নি — আরো বহুদূর যাবার বাকি।

আমরা পূর্বপুরুষের আশানিরাশা রক্তে বয়ে আনি
আর সময়ের জঙ্গমগুলো মোকাবেলা করি।
এখানে, এখানেই তা সম্ভব —  একটি হালকা-পাতলা
কালো মেয়ে — কয়েক পুরুষ আগেই যারা ক্রীতদাস ছিল,
যে বাবার ছায়াহীন কেবল মায়ের কাছে উদ্বেগে উৎকন্ঠায়
বড় হয়ে ওঠে — সে-ও বুকের গভীরে একটি স্বপ্নকে
ওমেওমে বড় করে তোলে —  একদিন সে-ও,
এই এতোটুকুন মেয়েটিও গোটা দেশের প্রেসিডেন্ট হবে!

কথা সত্যি — এখনও অনেক খানাখন্দ আছে,
ভাঙচুর আছে — যা আমাদের ডিঙাতে হবে।

এই এক দেশ — স্বপ্নের বহু পুঁই একটি রঙধনুর বর্ণেবর্ণে
রঙিন, এখানে আছে দুনিয়ার একমাথা থেকে
আরেক মাথার মানুষ — তারা একরকম নয়,
প্রত্যেকে আলাদা, ভিন্নভিন্ন ধরন ও বরন।

আমাদের মাঝখানে কী আছে — তা ধর্তব্যের নয়,
চোখ আমাদের সামনে। অনৈক্য দূরে সরিয়ে রাখতে হবে—
আমাদের সকল অভিযাত্রা ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের দিকে।

আমাদের মধ্যে তফাৎ আছে, থাকবে
এইমুহূর্তে এগুলো পাশে সরিয়ে রাখা হোক।

অস্ত্র নামিয়ে রাখতে হবে মাটিতে
তাতে আমাদের হাত খালি হবে —
একজনের সঙ্গে আরেকজনের হাত মিলাতে
অস্ত্র নামিয়ে রাখা জরুরি ভীষণ
কারো ক্ষতি করা আমাদের পণ নয়,
আমাদের রোখ বন্ধুতার রাখীবন্ধন।

দুনিয়ার সামনে এই কথাটি উচ্চারণ করতে দাও —
বিষাদের ভিতর থেকে আমরা ফুটে উঠবো,
যা কিছু বিনাশের কারণ — তার গহ্বর থেকে
আশা তার মুখ বাড়িয়ে ধরছে।

অবসাদগ্রস্ততার মধ্যেই জন্ম নিক উদ্দীপনা
এক বন্ধনে সবাই বাঁধা থাকুক —  তাহলেই আমরা
হবো সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।
পরাজয় কথাটি আর ঘুনাক্ষরেও ফিরে না আসুক।

বিভক্তির বীজ আর কোনোদিন রোপন করো না।
আমাদের পবিত্র গ্রন্থ বলে —
তোমরা নিজ নিজ গাছের ছায়ায় উপবেশন করো,
প্রশান্তি অবগাহন করো —  কেউ তোমাদের উপর
অন্যায় ছড়ি ঘোরানোর অধিকার রাখে না।

আমরা আমাদের অর্জনকে করাতের দাঁতের উপর
বসিয়ে দিতে পারি না। বনভূমি কেটে সাফ করে দিলে
খোলামেলা পরিসর বেরোয়, কিন্তু তা আমাদের লক্ষ্য নয় —
আমাদের লক্ষ্য কাঠ কেটে সাঁকো বানানো।
যে গর্ত আমরা পেরিয়ে এসেছি সেই গর্তে
আবার আমরা পা গলিয়ে দিতে পারি না।

যদি কোন ছেঁড়া থাকে তা রিফু করার জন্য একজোট
হয়েছি আমরা। আমরা এককাট্টা না থাকলে
ফাঁকফোকরে বিনাশ এসে ঢুকে পড়বে ছলে।
এখন গা এলানোর সময় নয়; গা ঝাড়া দিয়ে একসাথে
হাত না লাগালে তিলেতিলে গড়ে তোলা গণতন্ত্রের
মন্দিরে সুতানলি সাপ ঢুকে যেতে পারে!

অতিদূর এক গন্তব্যে যাবার পথে মাঝেমাঝে জিরিয়ে
নিতে হয় — মুক্তির অভিযাত্রা এমনই এক পথ —
পথে ক্লান্তি আসে, নিশিপাওয়া ঘটে —  কিন্তু আমরা
যেন মনে রাখি — এ সবই সাময়িক, আপদকালীন।

আমরা ইতিহাসে কালের মন্দিরা বাজিয়ে সামনে এগোই,
ইতিহাস আমাদের বেলা অবেলার সাক্ষী।

আমাদের পবিত্র অঙ্গীকারে খানিকটা কালিমা পড়েছে —
শিউরে উঠেছি এর আকস্মিকতায়, কিন্তু দমে যাইনি আমরা,
ঠিকঠিক ঘুরে দাঁড়িয়েছি, পথে থমকে ভাবি —
এই অশনী সংকেত কী আমাদের হারিয়ে দেবে?

না, আমরা পিছনে হাঁটবো না, যা পার হয়ে এসেছি
সেখানে বিপাকে ঘুরবো না আর, যাবো সামনে- ঠিকানা
একটাই — মুক্তির দিকে যাওয়া। আঘাত এসেছে —
এ কথা সত্যি, কিন্তু আমাদের দীক্ষা, অভিজ্ঞান ও ধৈর্য তা
শুষে নিয়েছে, আবার ঘন হয়ে বসেছি সকলে,
গোল হয়ে বসেছি সকলে — ন’ডরাই।

আমরা সাফসাফ জেনে গ্যাছি—সবকিছু পরিপ্রেক্ষিতের
উপর ছেড়ে দিলে কী পরিণতি হয়।
আমাদের বরং ভবিষ্যতের বীজ রোপন করার এখনই সময়।
আমরা যদি এই সন্ধিক্ষণে ভুল করি — ভবিষ্যৎ ন্যুব্জ
হয়ে যাবে, হাঁসফাঁস করবে, বিধ্বস্ত হবে।
আমাদের মন নরম থাকুক, কঠিন হোক মনন ও বিচার,
ভালোবাসায় আপোসমুখী হই, ন্যায়ের বেলায় নিরাপোস।

আমাদের এ ভূমির পাটাতন সুকঠিন —
অতীতের অভিজ্ঞতায় বলীয়ান,
সামনের দিকে যাত্রার অনর্গল ধ্বনি।

এখানে এই জনপদে আমার কালচে বুকের
ধুকপুকানির থেকে জখমী দুনিয়া প্রসন্ন হোক।
এই দেশটির পশ্চিম দিগন্তে উঁচুউঁচু খাড়া পাহাড়,
উত্তর-পুবাঞ্চলে বড়বড় হাওয়ার পিঠ —  যেখানে
আমাদের পূর্বপুরুষেরা লিখেছিল মুক্তির জবান,
আর মধ্যপশ্চিমের হ্রদঘেরা শহর ও শহরতলির মাথায়
রোদ ঝলমল করে নাচে —  তাদের সবগুলো অঙ্গন থেকে,
প্রতিটি মোড় ও কোণা প্রান্তর ভরে
বেজে উঠেছে যৌথতার নাকাড়া দূরে ও সংকেতে,
এই দিনেরে নিবো আমরা সেই দিনের কাছে।

আগুন আর সবুজ সবজির সওদায় মেতেছে নদী
একসাথ হয়েছে আগত দুঃখী ও কাঙাল,
আড়মোড়া ভাঙছে সাক্ষী আর আলিঙ্গনের সম্মতি —

ওই দূরে জেগে ওঠে চিকন আলোর রেখা
সাহসের কেশরে ছুটি, পাবোই তার দেখা।।


বদরুজ্জামান আলমগীর। কবি ও নাট্যকার

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *