- ২১ ঘণ্টার উৎকণ্ঠার পর মর্মান্তিক পরিণতি; সিসিটিভির সূত্রে তিনজন হেফাজতে, হত্যার কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন
একটি আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়েছিল ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। মায়ের কাছ থেকে ফোনটি নিয়ে বিকেলে বাসা থেকে বের হওয়ার সময় হয়তো তার কিংবা পরিবারের কারও কল্পনাতেও ছিল না—সেই বের হওয়াই তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে উঠবে।
শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। রাত পেরিয়ে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ। মাথায় আঘাতের চিহ্নের কথা জানিয়েছে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র। সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটি পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুরো কুমিল্লায় নেমে এসেছে শোক ও ক্ষোভের ছায়া।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে কোটবাড়ি বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই বছর বয়স থেকে কোটবাড়ি এলাকায় বেড়ে ওঠায় এলাকার পথঘাট তার অচেনা ছিল না।
তাই শুক্রবার বিকেলে বের হওয়ার পর দীর্ঘ সময়েও যখন সে বাড়ি ফিরল না, তখন উদ্বেগ দ্রুত আতঙ্কে রূপ নেয়।
ছবি তুলতে বের হয়ে আর ফিরল না
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। নির্ধারিত সময় পার হলেও সে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ শুরু করেন। পরে সদর দক্ষিণ থানায় নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত অপ্রতিমের ফোনের অবস্থান গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত করা যাচ্ছিল। এরপর ফোনটির আর কোনো অবস্থান পাওয়া যায়নি।
এদিকে পরিবারের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন স্থানে তার সন্ধানে তল্লাশি চালাতে থাকে।
কিন্তু রাত পেরিয়ে গেলেও কোনো সন্ধান মেলেনি।
শনিবার দুপুরে সেই অপেক্ষার অবসান হয়—তবে যে সংবাদটি আসে, তা ছিল একটি পরিবারের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সংবাদ।
লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে মিলল মরদেহ
শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়সংলগ্ন একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এলাকাটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের কাছাকাছি। স্থানীয়দের মাধ্যমে মরদেহের সন্ধান পাওয়ার পর পুলিশ সেখানে যায়।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটি পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থল, মরদেহের অবস্থা, ফোনের অবস্থান এবং সিসিটিভি ফুটেজ—সবকিছু সামনে রেখে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

সিসিটিভিতে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিন
তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিন নামে এক তরুণকে দেখা যায়। একটি ফুটেজে দুজনকে কথা বলতে এবং পরে একসঙ্গে হেঁটে যেতে দেখা যায়। পরবর্তী ফুটেজে তাদের শালবন এলাকার দিকে যেতে দেখা যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এ ঘটনায় শনিবার বিকেলে তুহিনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আনাস নামে আরও একজনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। রাতে পুলিশ জানায়, তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকেই স্পষ্ট করা হয়েছে—হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাদের মোবাইল ফোন, প্রযুক্তিগত তথ্য, অবস্থান এবং অপ্রতিমের গতিবিধির সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
অর্থাৎ তদন্ত এখনো শেষ হয়নি; প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য আরও তথ্য-প্রমাণের অপেক্ষা রয়েছে।
আইফোন কি হত্যার কারণ?
অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি এখনো উদ্ধার হয়নি। ফলে ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণার একটি দিক ছিল, মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে আঘাত করা হয়ে থাকতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—একটি মোবাইল ফোনের জন্য ১৩ বছরের একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো নৃশংসতার প্রয়োজন হলো কেন?
আর যদি উদ্দেশ্য শুধু ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
মায়ের সেই বিশ্বাস—‘আমার ছেলে হারানোর মতো ছেলে না’
অপ্রতিমের মা বারবার বলেছেন, তার ছেলে এমন নয় যে পথ হারিয়ে কোথাও চলে যাবে।
এলাকার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল। ছোটবেলা থেকেই কোটবাড়িতে বড় হওয়ায় আশপাশের রাস্তা, অলিগলি ও পরিচিত স্থানগুলো তার জানা ছিল। ফলে অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের উদ্বেগের মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
একজন মায়ের সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো—ছেলেকে পাওয়া গেল, কিন্তু জীবিত নয়।
একটি পরিবারের ঘর থেকে হারিয়ে গেল তাদের একমাত্র সন্তান।

অপ্রতিমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়
অপ্রতিমের ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের ভয়াবহ বাস্তবতা।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা গেলেও ২ হাজার ৩৮ জনের সন্ধান তখনো পাওয়া যায়নি।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের বিষয়ে জিডি হয়েছিল ১৭ হাজার ৮০৮টি, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪১৪টি এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০টি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জিডি চালু হওয়ায় নিখোঁজের অভিযোগ নথিভুক্ত করার প্রবণতা বেড়েছে; ফলে এসব সংখ্যাকে সরাসরি বাস্তবে নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
পুলিশের বিশ্লেষণে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে পারিবারিক কলহ, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
কিন্তু অপ্রতিমের ঘটনা প্রশ্ন তুলছে আরও কঠিন জায়গায়—একটি শিশু যখন পরিচিত পরিবেশ থেকে বের হয়, তখন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?
পরিচিত মানুষ মানেই কি নিরাপদ?
শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হতে পারে—‘পরিচিত মানুষ, তাই নিরাপদ।’
অপ্রতিমের ঘটনায় তদন্তে সিসিটিভিতে তার সঙ্গে পরিচিত বা যোগাযোগ থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধি সামনে এসেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে পরিচিত ব্যক্তিই অপরাধী—তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তবু ঘটনাটি অভিভাবকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কখন ফিরবে—এসব বিষয়ে বয়স অনুযায়ী তাকে সচেতন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সন্তান কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কোনো আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
শিশুকে ভয় দেখিয়ে নয়, বরং এমনভাবে শেখানো প্রয়োজন যাতে বিপদে পড়লে সে দ্রুত মা-বাবাকে জানাতে পারে।
‘পরিচিত’ বলে কারও সঙ্গে একা কোথাও না যাওয়া, নির্জন স্থানে না যাওয়া, নিজের অবস্থান পরিবারের কাউকে জানানো এবং প্রয়োজনে দ্রুত সাহায্য চাওয়া—এসব সাধারণ নিরাপত্তাবোধ ছোটবেলা থেকেই শেখানো যেতে পারে।
শুধু পরিবার নয়, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুদের দ্রুত খুঁজে বের করার জন্য আমাদের ব্যবস্থাটি কতটা কার্যকর?
নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ, মোবাইলের অবস্থান শনাক্তকরণ, সম্ভাব্য রুট বিশ্লেষণ, স্থানীয় পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্যামেরা যাচাই এবং দ্রুত আন্তঃথানা সমন্বয়—এসব ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি।
এক্ষেত্রে শুধু একটি থানার ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিনির্ভর সমন্বিত অনুসন্ধানব্যবস্থা প্রয়োজন।
এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডির সহযোগিতায় ‘মুন অ্যালার্ট’ নামে নিখোঁজ শিশুদের জন্য একটি জরুরি নোটিফিকেশন ব্যবস্থা ও ১৩২১৯ নম্বরের টোল-ফ্রি হেল্পলাইনের পাইলট কার্যক্রম চালু হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
অপ্রতিমের মতো আর কোনো শিশুকে যেন খুঁজতে খুঁজতে পরিবারের হাতে শেষ পর্যন্ত তার নিথর দেহ তুলে নিতে না হয়—সেই জায়গাতেই এখন গুরুত্ব দিতে হবে।

একটি ফোনের মূল্য কত, একটি শিশুর জীবনের মূল্য কত?
অপ্রতিম হয়তো জানত না তার হাতে থাকা মায়ের ফোনটি কত দামি। তার কাছে সেটি ছিল ছবি তোলার একটি মাধ্যম, কয়েকটি আনন্দের মুহূর্ত ধরে রাখার একটি উপকরণ।
কিন্তু একটি ফোন কখনোই একটি শিশুর জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।
অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়; এটি আমাদের সমাজ, পরিবার, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং শিশু সুরক্ষার প্রতি একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
কেন একটি শিশু নিরাপদে বিকেলে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে নিরাপদে ফিরতে পারবে না?
কেন একটি মা সন্তানের হাতে ফোন তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না?
কেন নিখোঁজ হওয়ার পরও পরিবারকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করতে হবে?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অপ্রতিমের মতো আর কত শিশুর জন্য আমাদের সতর্ক হতে হবে, আর কত পরিবারের কান্নার পর আমরা শিশু নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখব?
অপ্রতিম আর ফিরবে না।
ফিরবে না তার স্কুলের বেঞ্চে, বন্ধুদের আড্ডায়, মায়ের কাছে ছবি তুলতে চাওয়া সেই ছোট্ট আবদারে।
কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের সতর্ক করে, তদন্ত যদি প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে, অপরাধী যদি প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আসে এবং রাষ্ট্র যদি শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখে—তাহলেই হয়তো অপ্রতিমের অসমাপ্ত জীবনের প্রতি সমাজের কিছুটা দায়বদ্ধতা পূরণ হবে।
এখন সবচেয়ে জরুরি—আবেগ নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত; অনুমান নয়, প্রমাণ; আর শুধু বিচার নয়, ভবিষ্যতে আর কোনো অপ্রতিমকে হারাতে না দেওয়ার ব্যবস্থা।



