- গৌরবের মুহূর্ত, নাকি কূটনৈতিক সক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা?
সম্পাদকীয়
চার দশক পর আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে বাংলাদেশ। ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬—বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে দিনটি নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে। এক বছরের জন্য তিনি এখন বিশ্বের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত জাতিসংঘের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল ফোরামের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
এটি নিছক একটি পদ পাওয়া নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তবে একই সঙ্গে এটি এমন এক দায়িত্ব, যেখানে গৌরবের চেয়ে পরীক্ষাই বড়।
কারণ আজকের জাতিসংঘ সেই জাতিসংঘ নয়, যে জাতিসংঘের সামনে শুধু যুদ্ধ থামানোর প্রশ্ন ছিল। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি জলবায়ু বিপর্যয়, শরণার্থী সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট—সবকিছু একসঙ্গে জাতিসংঘের সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের একজন কূটনীতিকের হাতে সাধারণ পরিষদের সভাপতির হাতুড়ি ওঠা যেমন সম্মানের, তেমনি দায়িত্বেরও।
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর আবার বাংলাদেশ
১৯৮৬-৮৭ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। চার দশক পর ড. খলিলুর রহমানের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার সেই আসনে ফিরল।
এই প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য শুধু সময়ের ব্যবধানেই নয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি দীর্ঘ ধারাবাহিকতাও দৃশ্যমান হয়—জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থের পক্ষে অবস্থান, জলবায়ু ঝুঁকির প্রশ্নে নেতৃত্ব এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি।
বাংলাদেশের প্রার্থীকে ২ জুনের নির্বাচনে ১৯০ ভোটের মধ্যে ৯৯ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস কাকোরিস পেয়েছেন ৯১ ভোট। অর্থাৎ জয় এসেছে মাত্র আট ভোটের ব্যবধানে।
এই আট ভোটের ব্যবধানকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি যেমন বাংলাদেশের প্রতি আস্থার প্রমাণ, তেমনি এটাও মনে করিয়ে দেয়—বিশ্বের বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো সিদ্ধান্তই এখন আর সহজ নয়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ কোথায়?
ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বের সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—বাংলাদেশ এখন শুধু কোনো একটি ইস্যুতে কথা বলার জায়গায় নেই; বরং বিশ্বের বিভিন্ন মত ও স্বার্থের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির জায়গায় রয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে কাজ করেন। ফলে এই দায়িত্বে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সরাসরি প্রচারণার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে নিরপেক্ষতা, ভারসাম্য, সংলাপ এবং ঐকমত্য তৈরির দক্ষতা।
এখানেই ড. খলিলুর রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
একদিকে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা; অন্যদিকে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবি। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও দখল ও মানবিক বিপর্যয়, কোথাও নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ। এসব ইস্যুতে সভাপতির একটি শব্দও অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা হয়ে উঠতে পারে।
তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অর্জন হবে—কোনো পক্ষের মুখপাত্র না হয়ে সবার আস্থার মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠা।
সামনে জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচন
ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর অধ্যায়গুলোর একটি হবে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হবে। ১০ম মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন সাধারণ পরিষদের সভাপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক এমন একটি সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া সামনে।
এখানে সামান্য পক্ষপাত, কূটনৈতিক অসতর্কতা কিংবা প্রক্রিয়াগত বিতর্কও সভাপতির নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
সুতরাং এই নির্বাচন হবে শুধু জাতিসংঘের জন্য নয়—বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিপক্বতারও পরীক্ষা।
‘আস্থা পুনরুদ্ধার’—কেন এই প্রতিপাদ্য এত গুরুত্বপূর্ণ
৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”—অর্থাৎ ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।
এই প্রতিপাদ্য আসলে বর্তমান বিশ্বের সংকটের একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি।
জাতিসংঘ আছে, কিন্তু সব যুদ্ধ থামাতে পারছে না। নিরাপত্তা পরিষদ আছে, কিন্তু ভেটো রাজনীতি প্রায়ই কার্যকর সিদ্ধান্তকে আটকে দিচ্ছে। মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক ঘোষণা আছে, কিন্তু বাস্তবে বহু অঞ্চলে বেসামরিক মানুষ নিরাপত্তাহীন। জলবায়ু নিয়ে অঙ্গীকার আছে, কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোর গতি প্রয়োজনের তুলনায় ধীর।
ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু ‘জাতিসংঘ কী করবে?’—তা নয়। প্রশ্ন হলো, জাতিসংঘকে আবার কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য করা যাবে?
ড. খলিলুর রহমানের প্রতিপাদ্য ঠিক এই জায়গাটিকেই স্পর্শ করেছে।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা অভিজ্ঞতা হতে পারে শক্তি
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সম্পদ হলো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ড. খলিলুর রহমান তাঁর নির্বাচনী ভিশনে বাংলাদেশের দুই লাখের বেশি শান্তিরক্ষীর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন।
এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কেবল গর্বের বিষয় নয়; এটি কূটনৈতিক মূলধনও।
শান্তিরক্ষা থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট থেকে উন্নয়ন—বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতা বিশ্ব দক্ষিণের বহু দেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়।
সেই কারণে বাংলাদেশের সভাপতিত্ব যদি উন্নয়নশীল বিশ্বের কণ্ঠকে আরও সংগঠিত করতে পারে, তবে এর প্রভাব একটি ব্যক্তিগত মেয়াদের বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে সতর্ক থাকতে হবে
এই সাফল্যের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মতুষ্টি এড়িয়ে চলা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হওয়া মানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সব লক্ষ্য পূরণের নিশ্চয়তা নয়। বরং এর অর্থ—বাংলাদেশ এখন এমন একটি মঞ্চের পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, যেখানে পরস্পরবিরোধী স্বার্থের ১৯৩টি দেশকে একই আলোচনার টেবিলে রাখতে হবে।
সভাপতিকে হতে হবে দৃঢ় কিন্তু নিরপেক্ষ, সক্রিয় কিন্তু সংযত, নীতিতে অটল কিন্তু আলোচনায় নমনীয়।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। বাংলাদেশ যদি এই সংকটকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও কার্যকরভাবে ধরে রাখতে চায়, তবে সভাপতির প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ও বাংলাদেশের জাতীয় কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
ইতিহাস এখন দায়িত্বের অপেক্ষায়
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশের জন্য গর্বের দিন। কিন্তু ইতিহাস শুধু পদ পাওয়ার কথা মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে সেই পদ ব্যবহার করে কী করা হয়েছিল।
ড. খলিলুর রহমানের সামনে এখন সেই সুযোগ।
চার দশক পর বাংলাদেশের হাতে এসেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব। এই দায়িত্বকে যদি কেবল রাষ্ট্রীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, তবে সুযোগটি সীমিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি এটিকে আস্থা পুনর্গঠন, সংলাপের নতুন সংস্কৃতি এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে এর সুফল বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বিশ্ব আজ বিভক্ত। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ছে, সংঘাত দীর্ঘ হচ্ছে, মানুষের আস্থা কমছে। এমন সময়ে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি যদি বড় শক্তির রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে ছোট-বড় সব রাষ্ট্রের কথা বলার জায়গা তৈরি করতে পারেন—সেটিই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।
তাই আজ প্রশ্ন নয়—‘বাংলাদেশ কত বড় পদ পেল?’
প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘বাংলাদেশ এই পদ দিয়ে বিশ্বকে কতটা এগিয়ে নিতে পারল?’
কারণ ১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর চার দশক পেরিয়ে যে আসনটি আবার বাংলাদেশের হাতে এসেছে, সেটি শুধু সম্মানের আসন নয়—এটি ইতিহাসের সামনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মঞ্চ।
এখন সময় এসেছে প্রমাণ করার—বাংলাদেশ শুধু বিশ্বমঞ্চে কথা বলতে পারে না; প্রয়োজন হলে বিশ্বকে একসঙ্গে বসিয়ে কথাও বলাতে পারে।
লেখক ও সম্পাদক, ফিলাডেলফিয়াপত্রিকা



