গল্প সাহিত্য

স্ক্রল করে দেখা ৫ || মাসুদার রহমান

শেয়ার করুন:

৫. সন্ন্যাসী প্রেমের কিতাব


একটা শহর ছিল। শহরটাকে চিরে বয়ে গেছে একটা নদী। নদীর এপার আর ওপার।

আমি ছিলাম এপারে। ও ছিল ওপারে। আমাদের মধ্যে না ছিল ডাক, না ছিল দাবি। ছিল শুধু জল দেখা। ভোরে আমি ঘাটে বসে জল দেখতাম। ও সন্ধ্যায় ওপারের ঘাটে বসে জল দেখত। মাঝে মাঝে চাঁদ উঠলে দুইজনেই দেখতাম। তখন মনে হতো, একই চাঁদ নদীর দুই পাড়ে আলো ফেলছে। লোকে বলত—নদী পেরিয়ে ওপারে যাও না কেন? আমরা হাসতাম। বলতাম—এই জলটুকু আছে বলেই তো পবিত্র। পেরিয়ে গেলে কাদা হয়ে যাবে।

আমার কিতাবটা ছিল আসলে একটা খাতা। নাম ছিল না।

মলাট ছেঁড়া। পাতাগুলো হলুদ। ওটা ডায়েরিও না, কবিতার বইও না। ওটা ছিল আমার জমানো নিঃশ্বাস। ভেতরে কোনো মন্ত্র নাই, শ্লোক নাই। আছে শুধু ফাঁকা জায়গা। আর সেই ফাঁকা জায়গাতেই আমি রোজ একটা করে লাইন লিখতাম—‘আজকের আকাশ’। ‘আজকের চা’। ‘আজকে রিকশার হুডে বৃষ্টি’।

ওরও একটা কিতাব ছিল। ও বলত না। আমি জানতাম। কারণ ওর চোখের দিকে তাকালে বুঝতাম—ও-ও রোজ একটা শব্দ জমায়। আমাদের দুইটা কিতাব, দুই পাড়ে। কখনো খোলা হয় না। শুধু জানি, ওখানে আমাদের নাম লেখা আছে। আমরা কখনো বলিনি—আমার হও। বলেছি—তুমি ভালো থাকো। কখনো বলিনি—আমাকে সময় দাও। বলেছি—তোমার সংসারটা আগে।

এটাই ছিল আমাদের সন্ন্যাস। সন্ন্যাসী মানে গেরুয়া না। সন্ন্যাসী মানে যে নিজের সবচেয়ে বড় লোভটাকে রোজ গলা টিপে মারে। আমার সবচেয়ে বড় লোভ ছিল ওকে নিজের করে পাওয়া। আমি সেই লোভটাকে মারতাম। রোজ মারতাম। আর মারার পর যে শূন্যতাটা থাকত, ওই শূন্যতার মধ্যেই ওর মুখটা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠত।

একবার বসন্ত এসেছিল। বসন্ত মানে আগুন। শহরের সব গাছে নতুন পাতা। আমার কিতাবের পাতাও কাঁপছিল। ইচ্ছা করছিল নদী সাঁতরে ওপারে চলে যাই। হাতটা ধরি। বলি—চলো, ঘাটে বসে এককাপ চা খাই। যাইনি। কারণ জানতাম, এককাপ চা খেতে গেলে আরও দশকাপের তৃষ্ণা জাগবে। আর সেই তৃষ্ণা দুইটা ঘর পুড়িয়ে দেবে।

তাই ঘাটের শেষ ধাপে গিয়ে বসলাম। দূরে ওপারের ঘাটেও ও বসেছিল। আমরা কথা বলিনি। শুধু নদীর বাতাসে দুইটা নিঃশ্বাস মিশেছিল। তারপর যে যার ঘরে ফিরে গেছি। লোকে বলে—এটা কিসের প্রেম? এখানে তো পাওয়া নাই।
বলি—পাওয়া থাকলে তো শেষ হয়ে যেত। আমাদেরটা অনন্তের চুক্তি।
কেউ কারো ঘর ভাঙব না। কেউ কারো কাছে কিছু চাইব না। নদীর ওপার থেকে হলেও রোজ একবার আলো দেবো।

এই আলো দেওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন।

যখন ওর জ্বর হয়, আমি পাশে বসে কপালে হাত রাখতে পারি না। শুধু মেসেজে লিখি—জল খাও। যখন আমার লেখা আটকে যায়, ও খাতা টেনে নেয় না। শুধু বলে—লেখো। থেমো না। এই ‘লেখো’ শব্দটার মধ্যে হাজারটা আদর থাকে। হাজারটা ‘আমি আছি’ থাকে।

একবার খুব শীত পড়েছিল। ওর ওদিকে কুয়াশা। আমার এদিকে কাঁপুনি। ও ভিডিওকল দিলো। কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে আছে। পেছনে জানালায় কুয়াশা। ও হঠাৎ বললো—দেখো, আমার চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে।
আমি বললাম—আমার রুমেও উঠছে।  

আমরা দুজনেই হাসলাম। ওই ধোঁয়ার মধ্যে আমাদের পাঁচ মিনিটের সংসার হয়ে গেল। তারপর কল কেটে গেল। শূন্যতা ফিরে এলো। কিন্তু এবার ভারী লাগল না। কারণ কাপের ধোঁয়াটা থেকে গেল।

আমাদের প্রেমের কোনো অ্যালবাম নাই। আছে শুধু একটা ফ্রেম। ফ্রেমে দুইজন মানুষ পাশাপাশি বসা। পেছনে ইটের দেয়াল। কারো গায়ে বিস্কিট কালারের পোলো, কারো গায়ে বাটিক। কেউ কারো কাঁধ ছোঁয়নি। তবু মনে হয়, পুরো পৃথিবীর ভার দুইটা কাঁধে। লোকে জিজ্ঞেস করে—এত বছর ধরে কীভাবে টিকিয়ে রেখেছো?
আমি বলি—টিকিয়ে রাখিনি। আগলে রেখেছি। আগুনকে যেমন আগলে রাখে সন্ন্যাসী—না নেভায়, না ছোঁয়। শুধু পাহারা দেয়।

আর কিতাব? কিতাব মানে আমাদের অলিখিত নিয়ম। আমাদের প্রতিজ্ঞা। আমার খাতার শেষ পাতাটা এখনো ফাঁকা। ও বলে—ওটা আমার জন্য রেখো।
আমি বলি—ওটায় আমি কী লিখবো? ও হাসে। বলে, লিখো—আমরা।

আমরা—দুইটা অক্ষর। এর মধ্যে একটা নদী আছে। দুইটা ঘাট আছে। একটা চাঁদ আছে। এক কাপ চায়ের ধোঁয়া আছে। একটা ক্রেস্ট আছে। একটা ‘না করো না’ আছে। আর আছে দুইজন মানুষ, যারা সারাজীবন নদীর দুই পাড়ে বয়ে যাবে, কখনো পাড় ভাঙবে না—তাই বলেই পবিত্র থাকবে।

এই হলো সন্ন্যাসী প্রেমের কিতাব। এখানে দেহ নাই। আছে আত্মা। এখানে চাওয়া নাই। আছে দেওয়া। এখানে শেষ নাই। আছে শুধু প্রতিদিনের শুরু।


স্ক্রল করে দেখা ধারাবাহিক অন্যান্য পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন


মাসুদার রহমান। কবি। জন্ম ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭০, জয়পুরহাট, বাংলাদেশ। নব্বইয়ের দশকের কবি হিশেবে মান্য ও মূল্যায়িত হয়ে আসছেন। ‘হাটের কবিতা’, ‘ডাকবাংলো’, ‘হরপ্পা’, ‘ভ্যান গঘের চশমা’, ‘জোনাকিবাগান’ প্রভৃতি কবিতাবই তার সতেরোটি প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে কয়েকটি। বেরিয়েছে একাধিক নির্বাচিত কবিতা, একাধিক শ্রেষ্ঠ, কবিতাসংগ্রহ প্রথম খণ্ড।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *